Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

মেগা বিলাস যখন লুটপাটের হাতিয়ার

Advertisement

Icon

মহিউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মেগা বিলাস যখন লুটপাটের হাতিয়ার

Advertisement

সকালে ঘুম থেকে জেগে প্রথমেই খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাস শৈশব থেকে। ইন্টারনেটের কল্যাণে অনেক কাগজ পড়া হয়। তো গত শুক্রবারের যুগান্তর ঘাঁটতে গিয়ে প্রথম পাতায় চোখ আটকে গেল। আমরা জানি, এ দেশটা চোর-বাটপাড়ে ভরা। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এসব বুলি সিন্দুকে পুরে সবাই ছুটছে চোরতন্ত্রের দিকে। যাদের চুরি আর চোর ধরার কথা, তারাই চুরি করে বেশি, তারাই বড় চোর। কথায় বলে-বেড়ায় খেত খায়। এখন তো এ কথা অবলীলায় বলা যায়, নির্বাচন এলে আমরা আমাদের এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী পাঁচটা চোরের মধ্যে একটাকে বেছে নিই। আমরা ভোট দিয়ে কতগুলো চোরকে ক্ষমতার চেয়ারে বসাই। ক্ষমতা হাতে পেয়ে তারা চুরি করে আরও বেশি। চোরতন্ত্র যত প্রসার পায়, চোরের সংখ্যা ততই বাড়তে থাকে, অনেকটা জ্যামিতিক হারে। বড়োসড়ো দুটি চুরির ঘটনা তুলে এনেছে শুক্রবারের পত্রিকাটি।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম নিয়ে একটা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। জানা গেছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ৫০০ টাকার চারা গাছ কেনা হয়েছে লাখ টাকায়। আংশিক উদ্বোধনের ফিতা কাটতে খরচ দেখানো হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা। সেখানে আগে থেকেই একটি জলাশয় ছিল। সেটিকে নতুন পুকুর খনন দেখিয়ে লোপাট করা হয়েছে ১০ কোটি টাকা। নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার অজুহাত তুলে বাড়তি খরচ দেখানো হয়েছে ২১৭ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ অনেক সময় পরিমার্জন করা হয়। একটি পানির কল বা বৈদ্যুতিক সুইচ বদলে হয়তো লাগানো হয় আরেকটি। এসব পরিবর্তন করার নামে পরিশোধ করা হয়েছে শত শত কোটি টাকা। খরচের নামে এসব লুটপাটকে অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হয়তো তা বৈধ হয়েও যাবে। কারণ, লুট তো আর একজনে করে না! এর একটা চেইন আছে। চেইন ধরে টান দিলে চোরতন্ত্র খান খান হয়ে ভেঙে পড়বে। তো বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? বিড়াল নিজেই তো মাছ চোর! আর বানরের পিঠা ভাগের গল্প তো আমাদের জানা-ই আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, থার্ড টার্মিনালকে তিলোত্তমা করার জন্য ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপসহ নানা প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। গাছ কেনার ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে পরিচর্যার জন্য আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা যোগ করা হয়েছে। বিমানবন্দরসংলগ্ন নার্সারি মালিক রবিউল ইসলাম যুগান্তরকে জানিয়েছেন, এ গাছগুলোর দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি নয়। এ তো পুকুরচুরি নয়, রীতিমতো একটি ডাকাতি।

আগেকার দিনের রাজা-বাদশাহরা কৃষকের কাছ থেকে জবরদস্তি খাজনা আদায় করে নানা স্থাপনা তৈরি করতেন। সেখানে বসানো হতো দামি দামি পাথর-সোনা-রুপা, চুনি-পান্না। এসবের ভাঁজে ভাঁজে আছে কোটি কোটি কৃষক ও কারিগরের ঘাম আর রক্ত। এগুলোকে আমরা এখন আদর করে বলি ঐতিহ্য। আর এগুলো সংরক্ষণের জন্য ব্যয় করি গুচ্ছের টাকা। ছেলেপুলেকে ইতিহাস শেখাতে হবে না? তো আমরা শেখাই শিল্পকলা, স্থাপত্য। পেছনের ইতিহাসটা বলি না।

তো একালের রাজা-রানিরা ঝুঁকলেন এসব স্থাপনার দিকে। নাম দিলেন মেগা প্রকল্প। বড় বড় প্রকল্প। একেকটার বাজেট লাখ কোটি ছাড়িয়ে যায়। এসব বানিয়ে তারা অমর হতে চান। তাদের বিদূষক, দাস ও বরকন্দাজরা সমস্বরে আওয়াজ তোলেন-এ রাজা-রানি না থাকলে তো এটা-ওটা তৈরি হতো না। ভাবটা এ রকম, তিনি যেন বাপের টাকায় এসব বানিয়েছেন। আমার কবি বন্ধু হাসান ফখরি একটা কবিতার বই বের করেছিলেন বছরচারেক আগে। শিরোনাম ছিল-দেশটা কারও বাপের না। এটি পরে স্লোগান হয়েছিল।

মেগা প্রকল্পগুলো একেকটা হলো ‘মোটাতাজাকরণ প্রকল্প’। ঠিকাদারির কমিশন খেয়ে এরা ফুলেফেঁপে ওঠে। ছেঁড়া স্যান্ডেল আর তাঁতের শাড়ি পরা মানুষগুলো টিকটিকি থেকে ড্রাগন হয়ে যায়। আগেকার রাজা-রানিদের সভাকবি ছিল। রাজপ্রাসাদে তাদের পোষা হতো টিয়া, তোতা, বাইজি, হনুমান আর হাতি-ঘোড়ার মতো। তাদের কাজ ছিল রাজা-রানির বন্দনাগীত লেখা, সুর করে সেটা আওড়ানো-আমাদের রাজা-রানি কত মহান! তারা আমাদের মা-বাপ! কথায় বলে, ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না। একালের রাজা-রানিরা পাবলিকের টাকায় জোগাড় করে স্তাবক, চাটুকার, মোসাহেব। একই কাজ-প্রভুর বন্দনা করা। তারা আমাদের উন্নয়নের রূপকথা শোনায়।

মন খারাপ করা আরেকটি খবর। শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের অডিটোরিয়ামে ৭৩ লাখ টাকার এসি বসাতে প্রায় ৭ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন নির্মাণের প্রস্তাব পাঠিয়েছে জেলা গণপূর্ত অধিদপ্তর। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের ২৫০ কেভিএ জেনারেটর দেওয়ার চুক্তি থাকলেও দেওয়া হয়েছে চীনের ১২০ কেভিএ জেনারেটর। এমন অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ। চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের, জেনারেটর এলো চীনের। ঠিকাদার কাজ শেষ করলেও আজও তা কলেজ কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়নি।

কয়টা উদাহরণ দেব। এ তো গেল একটি দৈনিকের একদিনের প্রথম পাতার খবর। সারা দিনের সব গণমাধ্যমের বিস্তারিত প্রতিবেদন পেলে বোঝা যেত, পরিস্থিতি কত ভয়াবহ। এমন করেই চলছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।

রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি অংশগ্রহণ বা প্রশ্রয় ছাড়া কি এ রকম লুটপাট সম্ভব? আমি একটা কথা প্রায়ই বলি-কর্মচারী দুর্নীতি করতে পারে না, যদি না তার প্রতিষ্ঠানের প্রধান দুর্নীতিবাজ হয়। ওই প্রধান দুর্নীতি করতে পারে না, যদি মন্ত্রী দুর্নীতিবাজ না হয়। মন্ত্রী দুর্নীতি করতে পারে না, যদি তার প্রধানমন্ত্রী সৎ হয়। এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমরা ঘটা করে মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা দিচ্ছিলাম বিদেশি বন্ধুদের। তাদের দেওয়া হলো স্বর্ণ খচিত ক্রেস্ট আর প্রশংসাপত্র। শুরুটা ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দিয়ে। তো এক সাংবাদিক এ নিয়ে একটা স্কুপ নিউজ করলেন। দেখা গেল, অতিথিদের দেওয়া ক্রেস্টে যে স্বর্ণ দেওয়া হয়েছে, তাতে আছে বাটপারি। স্বর্ণের পরিমাণ কম এবং তাতে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে খাদ বেশি। ‘ক্রেস্টের সোনাচুরি’ নিয়ে বেশ হইচই হলো।

আমাদের সেই প্রধানমন্ত্রী তো ছিলেন খুব সাংবাদিকবান্ধব! তিনি প্রায়ই পছন্দের সাংবাদিকদের ডেকে মনের কথা বলতেন। বিশেষ করে বিদেশে পর্যটন শেষে ফিরে এসে তিনি সাংবাদিকদের ডাকতেন। তাদের জন্য চা-নাশতার এন্তেজাম থাকত। চেহারা দেখেই বোঝা যায়, প্রশ্নের স্ক্রিপ্ট কে তৈরি করেছেন এবং কে সেটি উত্থাপন করবেন। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নকর্তার সাজানো প্রশ্নের জবাবে প্রসঙ্গ ছেড়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তেন, তার প্রতি পেটভরা বিষ উগড়ে দিতেন। এটা করে তিনি স্যাডিস্ট আনন্দ পেতেন। তো এক সাংবাদিক ক্রেস্টের স্বর্ণ চুরি নিয়ে বেমক্কা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন-আপা, এ ক্রেস্টের স্বর্ণ চুরির ব্যাপারটা? জবাবে আপা কী বললেন? আপনারা শুধু চুরিটাই দেখলেন! আমরা যে সম্মান জানালাম, সেটি দেখলেন না?

ক্রেস্ট তৈরির দায়িত্ব ছিল মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের। তো স্কুপ নিউজে জানা গেল, ক্রেস্টের ঠিকাদারি পাইয়ে দিতে মন্ত্রী-সচিবের হাত আছে। এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হলো। তাতে কী?

চোরতন্ত্র ভালো রকমেই জেঁকে বসেছে। সরকার বদল হলেই যে চোরেরা গা ঢাকা দেবে, এটা মনে করার কারণ নেই। রাষ্ট্রের প্রায় সবই ইনস্ট্রুমেন্ট, সব হাত পচে গেছে। তারা প্রকল্প বানায়। সরকার বদল হলেও ওই হাতগুলো থেকে যায়। চুরির অভ্যাসটা একসময় নিয়মে পরিণত হয়। সেটিকে ন্যায্যতা দিতে বলা হয়-আগে তো এর চেয়ে বেশি চুরি হতো! তার মানে, আমাদের চেয়ে ওরা বড় চোর, বড় লুটেরা। সঙ্গে সঙ্গে বিদূষকরা গবেষণা করতে লেগে যায়, কোন আমলে কত চুরি হয়েছে। একই গীত-এতদিনের জঞ্জাল তো অল্প কয়েক বছরে সাফ করা যাবে না! ওরা তো দেশের সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে! এখন আমরা নেমেছি দেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়ে! এই ‘ওরা’ আর ‘আমরা’ নিয়েই এদেশের রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, সরকার আর রাষ্ট্র।

আমাদের আশপাশে যেসব নেতা-পাতিনেতা-কর্মকর্তা-কর্মচারী-মন্ত্রী পারিষদ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাদের অনেকের চেহারা দেখলেই মনে হয়-ব্যাটা চোর অতিশয়। আচ্ছা, মুখ দেখে কি বোঝা যায় কে চোর আর কে সাধু?

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম