ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জাতির অঙ্গীকার
Advertisement
মেজর জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অনেক সমস্যার আবর্তে জুলাই বিপ্লবের দুবছর হয়ে গেল। জুলাই বিপ্লবের সাফল্য একটি জাতির অদম্য চেতনা ও সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির মহাকাব্যিক দলিল। এটি কোনো একক রাজনৈতিক দল, অভিজাত শ্রেণি বা মতাদর্শিক গোষ্ঠীর কৃতিত্ব ছিল না। বরং এটি ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাকৃতিক জাতীয় জাগরণ-আঘাত, ক্ষোভ, আশা ও সংকল্পের একত্রিত বিস্ফোরণ, যা সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে একত্র করেছিল। এ বিপ্লব জন্ম নিয়েছিল বছরের পর বছর ধরে চলা নিপীড়ন, অবিচার ও রাজনৈতিক দমনের গভীর ক্ষত থেকে। এটি ছিল এমন একটি জাতির সম্মিলিত চিৎকার, যারা দীর্ঘদিন ধরে নীরব করে রাখা হয়েছিল, কিন্তু এখন এক কণ্ঠে বলে উঠেছিল : আর না! এই গণজাগরণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ছাত্রসমাজ-জাতির বিবেক ও অগ্রভাগের যোদ্ধারা। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, পেশাজীবী এবং শিশু কোলে মায়েরা। সবাই একটি লক্ষ্যেই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল-স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি ও গণতান্ত্রিক মর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তারা সম্মিলিতভাবে ভেঙে দিয়েছিল সেই ভয়ের দুর্গ, যার ওপর দীর্ঘদিন ধরে দাঁড়িয়ে ছিল আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা।
এটি কোনো বিদেশি সহায়তায় নয়, বরং দেশের মানুষের অভ্যন্তরীণ ন্যায়ের প্রতি তীব্র আকাক্সক্ষা ও স্বাধীনতার তৃষ্ণা থেকেই জন্ম নিয়েছিল। আর তাই, যখন বিপ্লবের পতাকা উড়ল এবং ভয়ভীতির প্রাচীর ভাঙতে শুরু করল, তখন জনগণ একটি জাতীয় শপথ নিল-আর কখনো বিভাজন ও দাসত্বের শৃঙ্খলে ফিরে যাবে না।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, একটি শাসন পতনের পরেই মূল সংগ্রাম শুরু হয়। সামনে যে পথ, তা কণ্টকাকীর্ণ-চোখে দেখা যায় এমন শত্রুর চেয়ে গোপন ষড়যন্ত্র আরও বিপজ্জনক। সেই পুরোনো শক্তিরাই এখন ছদ্মবেশে-কখনো আমলাতন্ত্রে, কখনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবক, আবার কখনো অভ্যন্তরীণ সুবিধাভোগী রূপে-বিপ্লবের চেতনা হাইজ্যাক করার চক্রান্তে লিপ্ত। এটি আত্মতৃপ্ত হওয়ার সময় নয়-এটি স্পষ্টতা, অঙ্গীকার এবং টানা লড়াইয়ের সময়। যে স্বপ্নে লাখো মানুষ জেগে উঠেছিল, সেই স্বপ্নকেই এখন বাস্তব নির্মাণে রূপ দিতে হবে-চিন্তায়, কাঠামোয় ও জাতীয় চরিত্রে। জুলাই বিপ্লব তার পূর্ণতা পাবে তখনই, যখন সেই নতুন বাংলাদেশ বাস্তবিক অর্থে গড়ে উঠবে। এখন, যখন বিপ্লবের ধুলো একটু একটু করে বসে যাচ্ছে, ঠিক তখনই একটি ভয়ংকর নতুন যুদ্ধের মঞ্চ প্রস্তুত হচ্ছে-এটি আর উন্মুক্ত দমন নয়, এটি আর রক্তাক্ত বিদ্রোহ নয়। এটি হচ্ছে : তথ্যযুদ্ধ, মানসিক ধোঁয়াশা এবং কৌশলগত ষড়যন্ত্র।
বর্তমানে এটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, পতিত স্বৈরাচারের প্রতি অনুগত গোষ্ঠীগুলো এবং সীমান্তপারের প্রভাবশালী শক্তিগুলো একত্রে কাজ করছে-নতুন করে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যকে ধ্বংস করতে এবং জনগণের বিপ্লবকে ব্যর্থ করতে। এই অভ্যন্তরীণ সুযোগসন্ধানী ও বিদেশি ষড়যন্ত্রীদের জোট এখন একটি ভয়ংকর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে-ট্যাংক বা পুলিশি দমন-পীড়নের মাধ্যমে নয়, বরং প্রচারণা, গুজব, ছলনামূলক কূটনীতি এবং মানসিক যুদ্ধের মাধ্যমে। তাদের লক্ষ্য অত্যন্ত সরল কিন্তু মারাত্মক : বিপ্লবের চেতনাকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া, জনগণের মধ্যে আবার বিভাজন সৃষ্টি করা, এবং নতুন বাংলাদেশের অঙ্কুরোদ্গম হওয়ার আগেই তাকে ধ্বংস করে দেওয়া। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও অস্বীকারযোগ্য নয় এমন সত্য হলো-ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরাসরি হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। বহুদিন ধরেই তারা ঢাকা শহরের রাজনৈতিক কাঠামোয় ছায়াময় প্রভাব বিস্তার করে আসছে, কিন্তু এখন তারা প্রকাশ্যেই তৎপর-নতুন সরকারের পথযাত্রা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাকে ব্যাহত করার লক্ষ্যে। তাদের উদ্দেশ্য কৌশলগত ও লেনদেনভিত্তিক-বাংলাদেশে এমন একটি সরকার নিশ্চিত করা যা ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে, জনগণের ইচ্ছা প্রকাশ করে কিনা তা তাদের কাছে গৌণ। এ উদ্দেশ্যে তারা ব্যবহার করছে-সাইবার অনুপ্রবেশ, কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল, এমনকি রাস্তায় বিশৃঙ্খলাকারী গোষ্ঠীকে অর্থায়ন।
তারা সমন্বিতভাবে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে-ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবকে হেয় ও অস্বীকার করা, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ব্যাহত করা, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য সাজানো ঘটনা ও প্রভাবিত মিডিয়া রিপোর্ট প্রকাশ করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যেগুলো জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকার কথা, সেগুলোর অনেক আজও আগের সরকারের নিযুক্ত অনুগতদের দ্বারা দখলীকৃত-যাদের নিয়োগ হয়েছিল দক্ষতার জন্য নয়, বরং অন্ধ আনুগত্যের বিনিময়ে। এই অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী আজও নীরব, নিষ্ক্রিয় কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাদানকারী হয়ে আছে, যখন দেশটির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঐক্য, দক্ষতা ও সংস্কারের। তাদের এই নিষ্ক্রিয়তা নিরপেক্ষ নয়-এটি ধীর বিষক্রিয়ার মতো বিশ্বাসঘাতকতা।
কিন্তু এর চেয়েও বেশি মারাত্মক হলো ভুয়া ও ষড়যন্ত্রমূলক বয়ান তৈরির আন্তর্জাতিক প্রচারণা। একটি সুস্পষ্ট প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে-পুনরাবৃত্তি ও কৃত্রিমভাবে তৈরি কিছু বিষয়ের জোরালো প্রচার চালানো হচ্ছে : ‘ইসলামিক মৌলবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে’-এই ভীতিজনক বয়ানটি পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তা মনস্তত্ত্বকে ঘুচাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ-যেগুলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে অতিরঞ্জিত বা সম্পূর্ণ মনগড়া, যাতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিদেশি কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপ আহ্বান করা যায়। এই গল্পগুলো সত্য বা সহানুভূতির জায়গা থেকে তৈরি নয়, বরং এগুলো কৌশলগতভাবে তৈরি করা মিথ্যা, যার উদ্দেশ্য হলো সন্দেহ সৃষ্টি, জনগণকে বিভক্ত করা, বিপ্লবকে অবৈধ প্রমাণ করা এবং ‘সহানুভূতির ছায়ায়’ বিদেশি হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করা। যারা এ বয়ানগুলোর কারিগর, তারা জানে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর কীভাবে আন্তর্জাতিক প্রচারণাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে হয়।
আজকের জনগণ অনেক বেশি সচেতন। তারা দেখতে পেয়েছে কীভাবে আগের সরকার ছিল বিদেশি স্বার্থের প্রতিনিধি। এখনকার দেশপ্রেমিকরা জানে-মুক্তি কোনো একদিনের ঘটনা নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া-যা প্রতিদিন রক্ষা করতে হয় মিথ্যা, ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকদের হাত থেকে। এ সময় আমাদের দরকার শুধু আবেগতাড়িত ঐক্য নয়, কৌশলগত স্পষ্টতা, তথ্য-সচেতনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কতা ও সত্যের প্রতি আপসহীন দায়বদ্ধতা। কোনো গুজব যেন প্রশ্নহীন না থাকে, কোনো চক্রান্ত যেন অবহেলায় পার পেয়ে না যায়, কোনো বিশ্বাসঘাতক যেন চিহ্নিত না হয় এমনভাবে। এ দেশের শত্রু-তারা হোক বিদেশি দূতাবাসে, কিংবা স্থানীয় বোর্ডরুমে-তাদেরকে সাহসিকতা, প্রমাণ এবং জাতীয় সংকল্পের মাধ্যমে মোকাবিলা করতেই হবে। বাংলাদেশ রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে তার বিপ্লব অর্জন করেছে। এখন সময় এসেছে সেই বিপ্লবকে শৃঙ্খলা, প্রজ্ঞা ও অবিচল ঐক্যের মাধ্যমে রক্ষা করার। যাত্রা কেবল স্বৈরাচার অপসারণে শেষ নয়-এর পরিণতি হতে হবে একটি সার্বভৌম, সত্যনিষ্ঠ ও জনগণনির্ভর প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা।
এ সংকটময় সময়ে সত্যিকারের দেশপ্রেমিকদের থাকতে হবে সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ। সংগ্রাম এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে ভিতরের বিশ্বাসঘাতকদের ও বাইরের হুমকির প্রতি। যারা দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কাজ করে-তাদের পরিচয়, পদ বা পতাকা যাই হোক না কেন-তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে। এটি কোনো দলের দায়িত্ব নয়, এটি জাতীয় দায়িত্ব-রাজনীতির ঊর্ধ্বে, পক্ষপাতিত্বের বাইরের একটি কর্তব্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে ঐক্য, সততা ও সংস্কারের মধ্যে। রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন দায়িত্ব নিতে হবে-ক্ষমতা দখলের জন্য নয়, বরং নিজেদের শুদ্ধ করতে, দুর্নীতি দূর করে নিঃস্বার্থভাবে দেশের সেবা করতে। বিভেদের রাজনীতি, তোষণের সংস্কৃতি এবং বিদেশি স্বার্থে আপসের ঐতিহ্য-এসব এখনই বন্ধ করতে হবে। তাহলেই আমরা এগিয়ে যেতে পারব এক নতুন যুগে-ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও প্রকৃত জনগণের শাসনের যুগে। আমরা এ পর্যন্ত এসেছি শুধু টিকে থাকার জন্য নয়, পরিবর্তনের জন্য। এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার সময় নয়।
আসুন, একসঙ্গে গড়ি এমন এক বাংলাদেশ-যে দেশ গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকবে, থাকবে না কোনো স্বৈরাচার, থাকবে না কোনো বিদেশি প্রভাব, থাকবে শুধু এ দেশের মানুষের স্বপ্ন ও আদর্শের প্রতিফলন।
মেজর জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
