Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

দেশীয় পুঁজি বিদেশমুখী: দেশীয় বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ কী

Advertisement

ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দেশীয় পুঁজি বিদেশমুখী: দেশীয় বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ কী

Advertisement

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের বেশির ভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতে ৪০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয় বলে খাতটি হয়ে উঠেছে কর্মসংস্থানের একটি বড় উৎস। এ খাতের বেশির ভাগ শ্রমিক নারী। এদিক থেকে খাতটি নারীর ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখছে। এ খাতের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে একটি পরিচিতি অর্জন করেছে।

এ খাতটির জন্ম হয়েছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও আমলা মুক্তিযোদ্ধা নুরুল কাদের খানের হাত ধরে। সেই হিসাবে খাতটির বয়স দাঁড়িয়েছে ৫০ বছরের মতো। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের পুরোধা পুরুষ জার্মান অর্থনীতিবিদ ফিড্রিক লিস্টের শিল্প সম্পর্কে একটি বহুল আলোচিত মত হলো, Nurse the baby, Rear the child, Free the adult. এটাই হলো বিখ্যাত শিশু শিল্পের যুক্তি। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প খাত গত ৫০ বছরেও কেন নাবালকত্ব পেরিয়ে সাবালক হতে পারল না? কেন এ শিল্পকে বছরের পর বছর ধরে নানারকমের প্রণোদনা দিতে হচ্ছে। সরকারও পোশাকশিল্প মালিকদের দাবির কাছে বারবার মাথা নোয়াচ্ছে। পোশাকশিল্প মালিকরা যখন প্রণোদনার দাবি তুলে নানারকম যুক্তি প্রদান করেন, তখন মনে হয় তাদের যুক্তি অকাট্য। যে শিল্প ৫০ বছর পরও প্রণোদনা না পেলে বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে দাবি করা হয়, সেই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেন প্রণোদনা দিতে হবে?

পৃথিবীর যেসব দেশে শিল্পায়ন হয়েছে, সেসব দেশে একটি খাতকে কেন্দ্র করেই শিল্পায়নের সূচনা হয়েছে। কিন্তু যতই দিন গড়িয়েছে একটি শিল্পকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শিল্পায়ন অচিরেই বহুমুখী হয়েছে। শিল্পায়নের ইতিহাসে Textile first বলে একটি কথা আছে। বস্ত্রশিল্পকে কেন্দ্র করে শিল্প খাতের বিকাশ শুরু হয়েছিল ওইসব দেশে। কালক্রমে বস্ত্রশিল্প থেকে আরও নতুন নতুন শিল্প খাতের উদ্ভব ঘটেছে। সমুদ্রগামী বাষ্পীয় পোত থেকে শুরু করে রেলের লোকোমোটিভ তৈরি এ শিল্প খাতকে বহুমুখী করেছে। শিল্প খাতের যাত্রা লাইট ইন্ডাস্ট্রি দিয়ে সূচিত হয়ে হেভি ইন্ডাস্ট্রি ও হেভি কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি হয়েছে। ইস্পাত খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে শিল্পায়নের অনুষঙ্গ। কিন্তু এটা কী করে সম্ভব হয়েছে তা একটি বিরাট প্রশ্ন। শুরুর দিকে শিল্পকারখানার মুনাফা উত্তরোত্তর বিনিয়োগ হয়ে শিল্প খাতের প্রসার ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে পোশাকশিল্পের বয়স ৫০ হলেও এ খাতের প্রসার সম্ভব হলো না কেন, সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের শিল্প খাতকে সঠিকভাবে বহুমুখী ধারায় বিকশিত একটি শিল্প খাত বলা যায় না। হ্যাঁ, দেশে কিছু কিছু ওষুধশিল্প, চামড়াশিল্প, প্লাস্টিকশিল্প, সিরামিকশিল্পসহ বেশকিছু ছোট আকারের শিল্প গড়ে উঠেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, পরে উল্লিখিত শিল্পগুলোর আকার অত্যন্ত ছোট। সে কারণে বাংলাদেশের শিল্প খাতকে সত্যিকার অর্থে বহুমুখী বলা যায় না। চামড়াশিল্পের কথাই ভাবুন। এ শিল্পের কাঁচামাল হিসাবে পশুর চামড়ার জোগান বিশাল। অবস্থা এতটাই সংকটজনক হয়ে উঠেছে যে, ঈদুল আজহার সময় কুরবানি করা পশুর চামড়া পানির দরে বিক্রি হয়। তারপরও চামড়াশিল্পের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ হতে পারছে না এবং দেশীয় চামড়া দিয়ে তৈরি জিনিসপত্র বিদেশের বাজারে ঠাঁই পাচ্ছে না। এর একটা বড় কারণ, চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করা হয় পরিবেশের প্রতি অবান্ধবভাবে। উন্নত বিশ্বের বাজারে চামড়াজাত পণ্য পরিবেশসম্মতভাবে উৎপাদিত না হলে বিদেশি ক্রেতারা এসব পণ্য কিনতে চায় না। ক্ষেত্রবিশেষে কিনলেও ভালো দাম পাওয়া যায় না। সরকার পরিবেশসম্মতভাবে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ শিল্প রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করলেও সেন্ট্রাল পলিউশান ট্রিটমেন্ট দীর্ঘদিন পরও ভালোভাবে গড়ে না ওঠার ফলে পরিবেশদূষণ রোধ করা যাচ্ছে না। যতদূর জানি, রাষ্ট্রীয়ভাবে এই এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টটি তৈরি করার কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না হওয়ার ফলে প্ল্যান্টের কাজ থমকে আছে। এ ব্যাপারে সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করছি।

দৈনিক বণিক বার্তা ২১ জুলাই বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সম্পর্কে একটি বড় প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ প্রতিবেদনের শিরোনাম হলো ‘নতুন খাত ও দেশের বাইরের গন্তব্যে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে গড়া পুঁজি ও সম্পদ’। যুক্তরাজ্যভিত্তিক দ্য প্লাটিনাম ক্যাপিটালের প্রতিবেদনটির বাংলা অনুবাদই এই প্রতিবেদনের ভিত্তি। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে চার হাজার সাত শত কোটি ডলারের রপ্তানি খাতে পরিণত করা উদ্যোক্তারা কারখানার উৎপাদন ও সম্প্রসারণেই মনোযোগী ছিলেন। তারা লভ্যাংশ আবার বিনিয়োগ করেছেন উৎপাদন বাড়াতে, কারখানার সক্ষমতা বাড়িয়েছেন। প্রতি ইউনিটে সেন্টের ভগ্নাংশ মেপে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু এখন সেই যুগের অবসান ঘটেছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি পোশাকশিল্পে গড়ে ওঠা পুঁজি ও সম্পদ এখন ক্রমেই দুবাই, সিঙ্গাপুর ও লন্ডনের আবাসন, আর্থিক সেবা, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের শিল্পোদ্যোক্তারা নীরবে এমন বহুমুখী বিনিয়োগ পোর্ট ফোলিও গড়ে তুলেছেন, যার ধরন গাজীপুরের কারখানাকেন্দ্রিক ব্যবসার চেয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের পারিবারিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ শিল্পে কর্মরত ৪০ লাখের বেশি শ্রমিকের অধিকাংশই নারী। আনাম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ ও বেক্সিমকোর মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীর উদ্যোক্তা পরিবারগুলো কঠোর ব্যবসায়িক শৃঙ্খলা, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার এবং কয়েক দশকের ধারাবাহিক পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছে।

বেক্সিমকোর সালমান এফ রহমান বস্ত্র, ওষুধ, গণমাধ্যম ও আবাসন খাত মিলিয়ে একটি কনগ্লোমারেট গড়ে তুলেছেন। তার ব্যবসায়িক যাত্রা দেখায়, শিল্পটির উচ্চাভিলাষী উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিষয় বুঝেছেন-উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপকে একই ছাতার নিচে আনা এবং ব্যবসাকে একাধিক খাতে ছড়িয়ে দেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার কৌশল। তবে ২০২৫-২৬ সালে এসে বদলে গেছে এ বহুমুখীকরণের গতি ও ভৌগোলিক পরিধি।

সবচেয়ে দৃশ্যমান পুঁজির স্থানান্তর ঘটছে আবাসন খাতে, বিশেষ করে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোয়। নিজেদের সম্পদের কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে চাওয়া দক্ষিণ এশিয়ার ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর কাছে দুবাই এখনো দেশের বাইরের সবচেয়ে পছন্দের কেন্দ্র। বাংলাদেশের পুঁজিও এর ব্যতিক্রম নয়। বড় কয়েকটি বস্ত্র শিল্পগোষ্ঠীর দ্বিতীয় প্রজন্মের উত্তরসূরিরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে হোল্ডিং কোম্পানি গড়ে তুলেছেন। মূলধনী মুনাফায় কর না থাকা, সুসংগঠিত মুক্তাঞ্চল ব্যবস্থা এবং মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকায় বিনিয়োগ সুযোগের কাছাকাছি অবস্থান তাদের সেখানে আকৃষ্ট করেছে।

এক্ষেত্রে সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফোর্বস মিডলইস্টের ২০২৬ সালের সবচেয়ে ধনী আরবদের তালিকায় ৩৭ জন বিলিয়নিয়ার রয়েছেন, যাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ১৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা ৮ শতাংশ বেড়েছে। এ উত্থান বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

এএইচএস প্রোপার্টিজের মাধ্যমে মাত্র ২৬ বছর বয়সে আববাস সাজোয়ানির বিলিয়নিয়ার হয়ে ওঠা উপসাগরীয় অঞ্চলের আবাসন বাজার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দেয়-এ বাজারে আগেভাগে বিনিয়োগ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি, বহু প্রজন্মের পরিকল্পনা নিয়ে এগুলো উদ্যোক্তাদের পুরস্কৃত করে। বাজারটির ওপর নজর রাখা বাংলাদেশের পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোও সেই শিক্ষাই নিচ্ছে।

বেশ কয়েক বছর ধরে অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প মালিকরা বিদেশে রপ্তানি করে আন্তর্জাতিক বৈদেশিক মুদ্রার পুরোটা বাংলাদেশে রি-পাট্রিয়েট করে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও একই অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। এতে অর্থনীতির রত্তক্ষরণ হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার খুবই সীমিত আকারে পুঁজির মালিকদের বিদেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ দেয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হয়। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি পুঁজি যে পরিমাণে বিদেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে, তা নিশ্চয়ই বাংলাদেশ সরকার অনুমোদন করে না। তাহলে কী করে এত বিশাল আকারে পুঁজির স্থানান্তর ঘটছে?

পুঁজির ধর্ম হলো, যেখান থেকে রিটার্ন বেশি আসে সেখানেই ধাবিত হওয়া। এই সূত্র অনুুযায়ী বাংলাদেশের পুঁজির মালিকদের দোষ দেওয়া যায় না। তারা বিদেশে স্বস্তিকর পরিবেশে এবং সুবিধাজনক অবস্থায় তাদের পুঁজি খাটাতে চায়। দেশে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোকে উৎপাদনের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে। রয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণের নিগঢ়। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশী পুঁজির বিদেশমুখী হওয়া ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশি পুঁজি ঘরের বাইরে যেতেই স্বচ্ছন্দবোধ করে। প্রশ্ন হলো, দেশে যদি পরিবেশ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে, তাহলে কি পলায়নপর পুঁজি আবার বাংলাদেশে ফিরে আসবে? বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশি পুঁজির বিদেশমুখিতার সূচনা ২০২৬ সালে। এ কথাটি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? কারণ, আগের বছরগুলোয়ও রপ্তানি আয়ের অংশবিশেষ বাংলাদেশে ফিরে আসেনি।

বর্তমান সরকার বিনিয়োগভিত্তিক প্রবৃদ্ধির কৌশল গ্রহণ করেছে। অবশ্য সব প্রবৃদ্ধিই বিনিয়োগচালিত। এখন যখন বণিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, নতুন খাত ও দেশের বাইরের গন্তব্যে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে গড়া পুঁজি ও সম্পদ, তখন দেশের ভেতরে বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

ড. মাহবুব উল্লাহ : জাতীয় অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম