দৃষ্টিপাত
বিষাক্ত খাবারই কি এ দেশের মানুষের নিয়তি
Advertisement
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত ৭ আগস্ট যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পুরো জাতি : বিষের সাগরে হাবুডুবু’ শীর্ষক সংবাদটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। খবরের মর্মার্থ আমাকে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। খাদ্যপণ্যে বিষ ও ভেজালের যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা পুরো জাতিকে হতাশ ও চিন্তাগ্রস্ত করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। খাদ্য হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র তার প্রত্যেক নাগরিকের জন্য যে পাঁচটি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য, তার মধ্যে খাদ্য অন্যতম। রাষ্ট্র সাধ্যমতো চেষ্টা করছে তার প্রত্যেক নাগরিকের জন্য খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে। কিন্তু সেই খাদ্য কতটা নিরাপদ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক, সে বিষয়ে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের জন্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই খাদ্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে আমাদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই বললেই চলে। অধিকাংশ সময়ই আমরা ‘খাদ্য নিরাপত্তা এবং নিরাপদ খাদ্য’ প্রসঙ্গ দুটিকে গুলিয়ে ফেলি। শব্দ দুটি কোনোভাবেই একই অর্থ বহন করে না। খাদ্য নিরাপত্তা হচ্ছে, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা। আর নিরাপদ খাদ্য হচ্ছে, যে খাদ্য নিরাপদ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টি করে না। দেশের প্রত্যেক মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনই সরবরাহকৃত খাদ্য যাতে মানবদেহের জন্য নিরাপদ হয় এবং কোনোরকম স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি না করে, তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আমি আগেও অনেকবার লিখেছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে কতটা সচেতন আছে, তা নিয়ে আমার সংশয় রয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে খাদ্যের জোগান বেড়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে চাল ও গম উৎপাদিত হতো ১ কোটি ১০ লাখ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে খাদ্যপণ্য (চাল ও গম) উৎপাদিত হয় ৪ কোটি ৫৪ লাখ টন। বিগত ৫৫ বছরে দেশে চাল ও গমের উৎপাদন বেড়েছে ৩ কোটি ৪৪ লাখ টন। একই সময়ে দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। সেই সময় খাদ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ২৫ লাখ টন। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২০ লাখ। শুধু শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল হিসাবে প্রতিবছর কিছু পরিমাণ চাল আমদানি করতে হয়। স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। আর চাল ও গমের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চারগুণ। এছাড়া ভুট্টা, গম ইত্যাদি উৎপাদিত হয় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টন। খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেছে।
স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে বাংলাদেশে খাদ্য ঘাটতি ছিল প্রকট। বর্তমানে আমরা খাদ্য উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা প্রতিদিন যে খাবার গ্রহণ করছি, তা কতটা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত? বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি দেশের ১৯ জেলা থেকে খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার পর তাতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নানা ধরনের জীবাণু ও কেমিক্যালের উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এসব জীবাণু ও কেমিক্যালযুক্ত খাবার মানবদেহে প্রবেশ করে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে। যে খাবার খেয়ে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে কর্মক্ষম জীবনযাপনের কথা, সেই খাবার খেয়ে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে, হারাচ্ছে কর্মক্ষমতা। খাদ্যে ভেজাল বা দূষণকে বলা হয়, ‘নীরব ঘাতক।’ অধিকাংশ সময়ই খাদ্যে ভেজালের প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে অনুধাবন করা যায় না। আস্তে আস্তে এর প্রভাব প্রত্যক্ষ করা যায়। খাদ্যে ভেজাল মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস করে। অভিজাত বিপণিকেন্দ্র থেকে শুরু করে ফুটপাতের দোকান সর্বত্রই ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্যের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ভোজ্যতেলে অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট মেশানো হচ্ছে। মুড়িতে দেওয়া হচ্ছে ইউরিয়া সার, গুড়ে মেশানো হচ্ছে নিষিদ্ধ রাসায়নিক। শিশুদের নাশতা, কেক ও বিস্কুটে পাওয়া যাচ্ছে অতিরিক্ত মাত্রায় প্রিজারভেটিভ। বাজারে যে শাকসবজি পাওয়া যায়, তাতে ভারী ধাতু মিলছে। ফলে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর কারবাইড ও ফরমালিন। ফরমালিন সাধারণত মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করে ফল দ্রুত পাকানোর ব্যবস্থা করা হয়। ফল সতেজ এবং রং সুন্দর রাখতে ইথোফেন ব্যবহার করা হয়। আপেল ও অন্যান্য ফলের সতেজভাব ধরে রাখতে কৃত্রিম মোম ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ভেজালযুক্ত খাবার খেয়ে মানুষ নিজের অজান্তেই নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী ‘নিরাপদ খাদ্য’ আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোয় ভোক্তাদের হাতে কোনো খাবার তুলে দেওয়ার আগে তার গুণগতমান এবং মানবদেহের জন্য তা ক্ষতিকর কি না, সেটা নিশ্চিত করা হয়। উন্নত দেশগুলোর ভোক্তারাও অধিকতর সচেতন। তারা কোনোভাবেই ভেজাল ও নিম্নমানের খাবার গ্রহণ করে না। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় খাদ্যনিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতার প্রচণ্ড অভাব পরিলক্ষিত হয়। কিছু মানুষ মনে করেন, খাবার হলেই হয়, ভালো আর মন্দ কী!
দেশের সর্বত্রই চলছে ভেজাল পণ্যের কারবার। শহর থেকে গ্রাম-সর্বত্রই ভেজাল পণ্যের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা যায়। একশ্রেণির অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ী জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা না করেই খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশাচ্ছে। বাড়তি মুনাফা অর্জনের জন্য তারা এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত রয়েছে। যে কোনো পণ্যেই ভেজাল মেশানে মারাত্মক অপরাধ। আর তা যদি হয় খাদ্যপণ্য, তা হলে তো কথায় নেই। ভেজাল খাদ্যকে স্লো পয়জনিং বলা যেতে পারে। এমন অনেক রোগ আছে, যা ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণেই সংক্রমিত হয়ে থাকে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি মৎস্য উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কিন্তু আমরা বাজারে গিয়ে যেসব মাছ ক্রয় করছি, তা কতটা স্বাস্থ্যসম্মত ও ভেজালমুক্ত, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? ঢাকা শহরের এক অভিজাত মাছের দোকান থেকে জনৈক ভদ্রলোক বড় আকারের একটি কাতলা ক্রয় করে গাড়ির পেছনে একটি বালতির মধ্যে রাখেন। বাসায় ফিরে একজন আত্মীয়ের দুর্ঘটনার সংবাদ শুনে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে ছুটে যান। মাছের কথা তিনি ভুলে যান। কয়েকদিন পর মাছের কথা মনে পড়লে তিনি গাড়ির পেছনের ডালা খুলে দেখেন মাছটি তখনো তরতাজাই রয়েছে। ভদ্রলোক বুঝতে পারেন, মাছে ভেজাল দেওয়া আছে। তাই তিনি মাছটি না খেয়ে ফেলে দেন। আমরা প্রায়ই এমন ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি। সবজির রং অক্ষুণ্ন রাখার জন্য সবুজ রং মেশানো হয়। এ রং মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কয়েক বছর আগে গাড়ি থামিয়ে রাস্তার পাশ থেকে কিছু বরই কিনে আনি। বরইগুলো খুবই সুন্দর এবং মনোলোভা ছিল; কিন্তু বাসায় আনার পর বুঝতে পারি, এগুলো আসল বরই নয়। রং মেশানো বরই মাত্র।
পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) আছে। কোনো পণ্য বাজারে ছাড়ার আগে এ প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হয়। আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রয়েছে। তারা মাঝেমধ্যে বাজারে অভিযান চালিয়ে ভেজাল পণ্য বিপণনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু লোকবল স্বল্পতা এবং অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে তারা ভেজাল প্রতিরোধে খুব একটা সফল হচ্ছে না। আজ দুর্নীতি যেমন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাকে গ্রাস করেছে, ঠিক তেমনই ভেজাল পুরো দেশবাসীকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। মেধাবী ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে ভেজাল নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীর আর কোনো দেশে বাংলাদেশের মতো খাদ্যপণ্যে এত ভেজাল মেশানো হয় বলে আমাদের জানা নেই।
ভেজাল খাদ্য শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ রোধ করে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণ করলে একটি শিশু কখনোই মেধাবী হয়ে গড়ে উঠতে পারবে না। অবিরাম ভেজাল বা বিষাক্ত খাবার খেলে মানুষের কর্মদক্ষতা হ্রাস পায়; একপর্যায়ে ক্যানসারসহ নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। খাদ্যে বিদ্যমান হেভি মেটাল কিডনি ও লিভারের কর্মক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে। হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ভেজাল খাদ্যের প্রভাবে মানুষ বারবার অসুস্থতা ও ক্লান্তি বোধ করে। কাজের প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
ভেজাল নিয়ন্ত্রণের জন্য সবার আগে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে; যারা বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন, তাদের বোঝাতে হবে, সামান্য মুনাফার আশায় তারা জাতির কতটা ক্ষতি করছেন। ভোক্তাদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কোনো পণ্যে ভেজাল মেশানো হয়েছে, এটি সন্দেহ হলেই সেই পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। দামে কম হলেও ভেজাল পণ্য ক্রয় করা যাবে না। ভেজাল প্রতিরোধে যে আইন প্রচলিত আছে, তা পর্যাপ্ত নয়। সময়োপযোগী ভেজাল প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করতে হবে। ভেজালকারীরা দেশ ও জাতির শত্রু। তাই তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। বড় অপরাধীর ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা যেতে পারে। পণ্য ভেজালকারীর কাছে ফরমালিন বা এ ধরনের কেমিক্যাল বিক্রি বন্ধ করতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে সব ধরনের ভেজালের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে যে, তারা যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হন, তাহলে ভেজালের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। বর্তমানে বাংলাদেশ একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে পরিচালিত হচ্ছে। সব কলুষতা মুছে ফেলে সুন্দরের পথে যাত্রা শুরুর এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। ভেজালকারীদের কোনো ছাড় নেই। জেনেশুনে ভেজালকারীদের সঙ্গে আত্মীয়তা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান মুক্ত পরিবেশে দেশ হোক ভেজালমুক্ত। জাতি হোক কলঙ্কমুক্ত-এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : প্রফেসর ইমেরিটাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত
