পশ্চিমে ইসলামবিদ্বেষ উসকে দিচ্ছে ইসরাইল
জশ পল
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমভীতি উসকে দেওয়ার বিষয়টি এখন এতটাই স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন প্রায় আক্ষেপের সঙ্গেই জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের কথা ভাবেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর বুশ নিজে একটি মসজিদে গিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম’। রিপাবলিকান পার্টি থেকে এমন মনোভাব এখন প্রায় সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেছে। এর জায়গা নিয়েছে চরম বর্ণবাদ, যা মুসলিমবিরোধী হামলাকে উসকে দিয়েছে-যেমন, সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে গোলাগুলির ঘটনা, যেখানে দুজন উপাসক এবং একজন নিরাপত্তা রক্ষী নিহত হন। ডালাস ফোর্ট ওয়ার্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সম্প্রতি মুসলিমদের ওজু করার সুবিধার জন্য সামান্য পা ধোয়ার ব্যবস্থা তৈরির একটি প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। কিন্তু টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এটিকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানালে সেই উদ্যোগ দ্রুত বাতিল করা হয়।
এ সবকিছুর উৎস কোথায়? এর কিছুটা নিশ্চিতভাবেই ২০১৫ সালে নির্বাচনি প্রচারণার প্রথম দিন থেকেই ট্রাম্পের ছড়ানো রাজনীতির প্রতিফলন। তিনি এটি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সামাজিক কাঠামোর শীর্ষে তাদের ঐতিহ্যবাহী অবস্থান এখন ঝুঁকিতে। এ প্রেক্ষাপটে কেবল মুসলিমরাই আক্রমণের শিকার নয়, সব সংখ্যালঘু গোষ্ঠীই লক্ষ্যবস্তু-যেমনটা দেখা গেছে কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস বা হিস্পানিক সংস্কৃতির ওপর তার প্রশাসনের হামলায়। তবে যখন ইসলামোফোবিয়ার কথা আসে, তখন এ প্রবণতার পেছনে আরও একটি সুনির্দিষ্ট চালিকাশক্তি কাজ করে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইসরাইল সরকার জেরুজালেমে একটি ইহুদিবিদ্বেষ-বিরোধী (অ্যান্টি-সেমিটিজম) সম্মেলনের আয়োজন করে। এটি কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় ছিল সেখানে যারা উপস্থিত ছিলেন : ইউরোপের চরম ডানপন্থী নেতারা, যাদের মধ্যে পোল্যান্ডের ‘পিআইএস’, স্পেনের ‘ভক্স’, হাঙ্গেরির ‘ফিদেজ’ এবং ফ্রান্সের ‘রাসেলমেন্ট ন্যাশনালে’র প্রতিনিধিরা। সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুনর্বাসন (রি-এডুকেশন) প্রক্রিয়ার পর ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে আলোচনার জন্য ইউরোপীয় ডানপন্থিদের এটিই ছিল সবচেয়ে বড় জমায়েত।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘চরমপন্থি ইসলামের আক্রমণের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই চরম ডানপন্থিরাই এখন তাদের মিত্র। জানুয়ারির পর থেকে নেতানিয়াহু এই সুর বজায় রেখেছেন। সম্প্রতি তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রথম ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হবে ইসলামিক রিপাবলিক অফ ব্রিটেন।’ এমনকি তিনি পুনর্বার নির্বাচিত হওয়ার জন্য একটি প্রচারণামূলক বিলবোর্ড ব্যবহার করেছেন, যার শিরোনাম ছিল ‘ওদের জিততে দেবেন না’। সেখানে হিজবুল্লাহ ও ইরানি নেতাদের ছবির পাশাপাশি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান এবং নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির ছবি তুলে ধরা হয়।
ইসরাইলের ইসলামোফোবিয়ার প্রচার কেবল নেতানিয়াহুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কিংবা এটি তাদের নিজেদের সীমানাতেও থেমে নেই। ইসরাইলের নিজস্ব ভাবমূর্তি যখন একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে (বিশেষ করে গাজায় তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে), তখন নিজেদের আচরণ পর্যালোচনার বদলে তারা তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে আরও কার্যকর জনসংযোগ ও অপপ্রচারের আশ্রয় নিয়েছে। এর কিছু অংশ দেখা গেছে নিজেদের ভাবমূর্তি উদ্ধারের চেষ্টায় : ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্ক স্থিতিশীলতা বাড়ায়’ এমন একটি স্বয়ংক্রিয় টেক্সট বার্তা সম্প্রতি ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তিভুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘ক্লক টাওয়ার এক্সের’ মাধ্যমে আমার এবং কোটি কোটি আমেরিকানের মোবাইলে এসেছে। এর পাশাপাশি ইসরাইল প্রতি আক্রমণাত্মক কৌশলও নিয়েছে-তারা সমালোচকদের আক্রমণ ও অবৈধ করার চেষ্টা করছে এবং পরিকল্পিতভাবে ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে ডানপন্থিদের একজোট করার চেষ্টা করছে।
এ কৌশলটি সম্ভবত মার্কিন জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান ‘স্ট্যাগওয়েল গ্লোবালের’ একটি ফাঁস হওয়া গবেষণা থেকে উদ্ভূত, যা ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তুত করার অনুরোধ করেছিল। সেখানে দেখা গেছে, জনমত নিজেদের পক্ষে টানার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ‘র্যাডিক্যাল ইসলাম’ এবং ‘জিহাদবাদের’ ভয় দেখানো। তবে যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসরাইলকে সমর্থন জোগাবে, তার কোনো যৌক্তিক কারণ না থাকায় নেতানিয়াহু ক্রমাগত এ যুক্তির দিকে ঝুঁকছেন যে, বিদেশি নেতারা তাকে যেমনটা বলেছেন, ইসরাইল হলো ‘র্যাডিক্যাল ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মডেল, যা সমগ্র সভ্য বিশ্বের জন্য হুমকি।’
ইসরাইল তাদের হাসবারা (তথ্যভিত্তিক প্রচার কৌশল) কৌশলের অংশ হিসাবে ক্রমাগত তীব্র ইসলামোফোবিয়াকে কাজে লাগাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে কানাডায় ইসরাইল সরকারের অর্থায়নপুষ্ট ‘ইউনাইটেড সিটিজেন্স ফর কানাডা’ নামে একটি প্রচারণা চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ প্রচারণায় দাবি করা হয়েছিল, দেশটিতে আসা মুসলিম অভিবাসীরা সমাজের জন্য হুমকি এবং তারা ইসলামি আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অনেক ক্ষেত্রেই আমেরিকান ও ইউরোপীয়রা এ অপচেষ্টা ধরে ফেলেছে। সাম্প্রতিক প্রাথমিক নির্বাচনে আব্দুল আল-সায়েদের মতো প্রভাবশালী মুসলিম কংগ্রেস প্রার্থীর জয় এটাই প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ সম্প্রদায়গত বৈষম্যের উর্ধ্বে উঠে ইসলাম-বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে অন্য অনেক ক্ষেত্রেই মুসলিম সম্প্রদায়গুলো নিজেদের অবরুদ্ধ বা কোণঠাসা বোধ করছে।
ইসরাইলি সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ব এবং জনসংখ্যার একক সমজাতীয়তা রক্ষার ভিত্তির ওপর। তবে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের জনসংখ্যা ও নেতৃত্ব-উভয় দিক থেকেই উত্তরোত্তর বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠছে। ইসরাইলের শান্তির পথ হতে পারে এমন একটি ব্যবস্থা, যা দেশটিকে আরও বেশি পশ্চিমা বিশ্বের মতো করে তুলবে; এমন একটি দেশ, যেখানে সব মানুষের জন্য সমান অধিকার থাকবে। কিন্তু তাদের বর্তমান প্রোপাগান্ডা অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিমা বিশ্বকে আরও বেশি ইসরাইলের মতো বানিয়ে ফেলা। এটি পশ্চিমা বহুত্ববাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব যদি এ পরীক্ষায় ব্যর্থও হয় ইসরাইলের ধরে নেওয়া উচিত হবে না যে, সেই ব্যর্থতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাধারণ মানুষকে ইহুদিবাদের দিকে টানবে।
ভয় ও ঘৃণা অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার, এবং বর্তমান ইসলামোফোবিক প্রচারণা ভবিষ্যতে আরও গভীর ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। এমনকি এর মূল উদ্দেশ্য-পশ্চিমের চরম ডানপন্থি মতাদর্শের শেষ দুর্গে ইসরাইলের সমর্থনে ধস নামা ঠেকানো-তাতেও এটি সফল হবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের উচিত হবে বিষয়টিকে সঠিকভাবে চিনে নেওয়া : এটি এমন একটি রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত মরিয়া বৈদেশিক প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা, যার হাতে বিকল্প পথগুলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
আল জাজিরা থেকে ভাষান্তরিত
জশ পল : ২০২৩ সালে গাজা ইস্যুতে পদত্যাগ করার আগে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিভিন্ন জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগে কর্মরত ছিলেন
