Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

হালফিল বয়ান

বাংলাদেশের মিয়ানমার নীতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা

Advertisement

Icon

ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের মিয়ানমার নীতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা

Advertisement

মিয়ানমারের চলমান পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সীমান্তবর্তী দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সীমান্তনীতি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতির সম্মিলিত প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা সম্পদকে কেন্দ্র করে চীন, ভারত এবং অন্যান্য শক্তির আগ্রহ বাড়তে থাকায় নিকট-প্রতিবেশী বাংলাদেশের সামনে নতুন এক ভূকৌশলগত বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা বাণিজ্যের বড় অংশ চীনের দিকে প্রবাহিত হয় এবং কাচিন ও শান অঞ্চলের খনিজ উত্তোলন ক্রমেই বৃহত্তর প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সরবরাহ-শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, যার অংশ হতে ভারতও মরিয়া।

এমতাবস্থায় প্রতিবেশী বাংলাদেশের প্রথম নীতিগত উপলব্ধি হওয়া উচিত-মিয়ানমারকে আর শুধু ‘রোহিঙ্গা সমস্যা’র কেন্দ্রস্থল হিসাবে দেখা যাবে না। মিয়ানমার এখন একইসঙ্গে নিরাপত্তা-সীমান্ত, সম্পদ-সীমান্ত এবং ভূরাজনৈতিক সীমান্ত সমস্যার কারণ, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতির কাঠামোয় নিয়ে আসা জরুরি।

সীমান্তের ওপারে রাষ্ট্র নয়, বহুস্তরীয় ক্ষমতা : বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরিবর্তিত বাস্তবতা হলো, সীমান্তের ওপারে আগের মতো শুধু কেন্দ্রীয় মিয়ানমার সরকারকে বিবেচনায় নিয়ে নীতি তৈরি করা ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অপর পাশে একটি অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির বাস্তব কর্তৃত্ব তৈরি হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের প্রয়োজন ‘দ্বৈত বাস্তবতা কূটনীতি’-একদিকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অন্যদিকে সীমান্তের বাস্তব নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখা। এর অর্থ হলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবিক স্বার্থ রক্ষা করা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন সমীকরণ : মিয়ানমারের ক্ষমতা কাঠামো ও শক্তির ভারসাম্যের বহুমাত্রিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ও সরাসরি প্রভাব পড়বে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ওপর। বাংলাদেশ ও বিশ্ববাসী যদি রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চায়, তাহলে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন-ফিরিয়ে দেওয়ার পর তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? ২০১৭ সালের বাস্তবতায় এ প্রশ্নের উত্তর অপেক্ষাকৃত সরল এবং এককভাবে মিয়ানমার রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এখন রাখাইনের রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা বদলে গেছে। আরাকান আর্মি বড় একটি ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সেখানে বিকল্প প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। তাই বাংলাদেশের প্রত্যাবাসন কূটনীতিকে শুধু ঢাকা-নেপিদো আলোচনা হিসাবে না দেখে ঢাকা-নেপিদো-রাখাইন বাস্তবতার ত্রিমাত্রিক কাঠামোতে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশকে আরাকান আর্মির সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় যেতে হবে। বরং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ও পর্যবেক্ষণের অধীনে একটি নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের চলাচল, বসতভিটা, জীবিকা, সম্পত্তি, পরিচয়, নাগরিক অধিকার এবং শারীরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর বক্তব্যও স্পষ্ট যে, রাখাইনের পরিবেশ এখনো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য পর্যাপ্ত নয়।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় ঝুঁকি : সংঘাতে ‘ছড়িয়ে পড়া’ : মিয়ানমারের সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রতিবেশী বাংলাদেশের ওপর তত বাড়বে। সীমান্তে গোলাগুলি, আকাশসীমা লঙ্ঘন, অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারের ঝুঁকি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৬ সালে ঢাকা পূর্ব সীমান্তে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা প্রস্তুতির কথা বলেছে। এখানে বাংলাদেশের নীতিকে শুধু প্রতিরোধমূলক সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নিতে হবে। অর্থাৎ সীমান্তে শুধু জনবল বাড়ানো নয়, প্রয়োজন উন্নত নজরদারি, সীমান্ত সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা, আকাশ ও সমুদ্র পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিরাপত্তা কাঠামোর সমন্বয়।

বিরল মৃত্তিকা : বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি না সুযোগ? : এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি তুলনামূলক নতুন সম্ভাবনার জায়গাও রয়েছে। মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা নিয়ে চীন-ভারত প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য ভূঅর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ সরাসরি এ খনিজ প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করার মতো অবস্থানে নেই। কিন্তু বাংলাদেশ পরিবহণ, বন্দর, সরবরাহব্যবস্থা, শিল্প-লজিস্টিকস এবং আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্র হিসাবে ভূমিকা নিতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর এবং বঙ্গোপসাগরের অবস্থান এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশের অবকাঠামো, কাস্টমস, বন্দর দক্ষতা, স্থল-সমুদ্র যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে।

চীন-ভারত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান : এখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল হবে কোনো এক পক্ষকে বেছে নেওয়া। মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা নিয়ে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, ততই বাংলাদেশকে উভয় পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন হবে। চীন মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ভূগোল, অবকাঠামো এবং শিল্প সরবরাহ-শৃঙ্খলের কারণে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। ভারতের জন্য মিয়ানমার গুরুত্বপূর্ণ তার উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগের কারণে। এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর নীতি হতে পারে ‘কৌশলগত বহুমুখীকরণ’। চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বাণিজ্য, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ও আঞ্চলিক সংযোগ, জাপানের সঙ্গে অবকাঠামো ও প্রযুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাজার ও সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ-সবগুলোকে একই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের কাঠামোয় পরিচালনা করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য একটি ‘মিয়ানমার কৌশল’ প্রয়োজন : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সুপারিশ হলো-বাংলাদেশের একটি পৃথক, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মিয়ানমার কৌশল থাকা উচিত। এ কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে চারটি বিষয় : সীমান্ত নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে পঞ্চম উপাদান-সম্পদ ও সরবরাহ-শৃঙ্খল ভূরাজনীতি। বাংলাদেশকে এখন থেকেই পর্যবেক্ষণ করতে হবে মিয়ানমারের কোন অঞ্চলে কোন শক্তি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে, কোন সীমান্তপথ দিয়ে কী ধরনের সম্পদ যাচ্ছে, চীন কীভাবে তার শিল্প সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ করছে, ভারত কীভাবে বিকল্প সরবরাহ উৎস তৈরি করছে এবং এসব পরিবর্তনের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের বন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থার কী সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। এটি কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, বন্দর, বাণিজ্য, জ্বালানি, পরিবেশ, যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনা-সবগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য ‘দূরবর্তী মিয়ানমার’ বলে কিছু নেই : মিয়ানমারের কাচিনে বিরল মৃত্তিকা খনন হচ্ছে-এটি ঢাকার কাছে প্রথমে একটি দূরবর্তী অর্থনৈতিক ঘটনা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেই খনিজ চীনের শিল্পে যাচ্ছে, চীন-ভারত প্রতিযোগিতা বাড়ছে, মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সম্পদ ও ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, রাখাইনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এসব ঘটনা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সীমান্তে বাংলাদেশকে প্রভাবিত করছে। অতএব, কাচিনের খনি থেকে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির-দুটি বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এর মাঝখানে রয়েছে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ভাঙন, সম্পদ-রাজনীতি, চীন-ভারত প্রতিযোগিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বঙ্গোপসাগরের পরিবর্তিত ভূরাজনীতি। বাংলাদেশের সামনে তাই তিনটি মৌলিক নীতিগত লক্ষ্য থাকা উচিত : রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য চাপ সৃষ্টি, সীমান্তে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একইসঙ্গে বঙ্গোপসাগর ও আঞ্চলিক সরবরাহ-শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশকে অন্যের ভূরাজনীতির ক্ষেত্র হওয়া যাবে না। বরং বাংলাদেশকে হতে হবে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সক্রিয় ব্যবস্থাপক। বাংলাদেশের জন্য দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রতিবেশী মিয়ানমার একইসঙ্গে ঝুঁকির উৎস, কৌশলগত প্রতিবেশী এবং সম্ভাব্য ভূঅর্থনৈতিক করিডর। এ তিনটি বাস্তবতাকে একসঙ্গে ধারণ করতে পারলেই বাংলাদেশ পরিবর্তিত মিয়ানমার ও পরিবর্তিত বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতিতে নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করতে পারবে এবং বিদ্যমান শরণার্থী ও অপরাপর সমস্যাকে সম্ভাবনার স্তরে নিয়ে যেতে পারবে।

প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম