পুনশ্চ : এদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সর্বজনীন হয় না কেন
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৮৩৫ সালের ৭ মার্চ গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক যে নীতি ঘোষণা করিয়াছিলেন তাহাতে লেখা হয় : ‘সপারিষদ বড়লাট মনে করিতেছেন ভারতের দেশীয় সাধারণের মধ্যে এয়ুরোপীয় সাহিত্য ও বিজ্ঞানের প্রসার ঘটানোই ব্রিটিশ সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়; আর শিক্ষাখাতে বরাদ্দকৃত সমস্ত তহবিল শুদ্ধমাত্র ইংরেজি শিক্ষার পেছনে ব্যয় করাটাই হইবে সর্বোত্তম পদক্ষেপ।’
ফলে শিক্ষাদীক্ষার অধিকার যে দেশীয় সমাজের উচ্চশ্রেণীর মধ্যেই (আসলে তাহাদের একাংশে) সীমিত থাকিবে তাহাতে সন্দেহের অবকাশ ছিল না। এই নীতির অন্তর্গত একটা অনুসিদ্ধান্ত ছিল দেশে উচ্চশ্রেণীর মধ্যে শিক্ষাদীক্ষার বিস্তার ঘটিলে নিম্নশ্রেণী আপনা-আপনি শিক্ষার আলোয় আলোকিত হইবে। এই নীতিরই নাম দাঁড়াইয়াছিল বিখ্যাত ‘ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিওরি’ বা নিম্নগামী চুয়ানি প্রতিপাদ্য।
টম মেকলে আর বিল বেন্টিঙ্কের এই প্রতিপাদ্য শেষ পর্যন্ত হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষার কবচ প্রমাণিত হয় আর ইহার পরিণতি হয় প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ভদ্রলোকদের মধ্যেই সীমিত রাখায়। এই কারণেই এদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সর্বজনীন হয় নাই।
ঘটনার বিশ বছরের মধ্যেই ব্রিটিশ সরকারের উপলব্ধি ঘটে যতটা অনুমান করা হইয়াছিল শিক্ষাদীক্ষা আসলেই ততটা নিম্নগামী চুয়ানি দিয়া প্রবেশ করে না, অর্থাৎ শিক্ষা নীচের দিকে চুঁইয়া পড়ে না।
১৮৫৪ সালে ঘোষিত নতুন নীতিতে একটা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হইল। এই নীতিতে উচ্চশিক্ষায় ইংরেজির প্রসার অবারিত রাখিলেও সর্বসাধারণের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাবিস্তার করিতে হইলে ‘মাতৃভাষাই সর্বোত্তম উপায়’ এই সত্য মানিয়া লওয়া হয়।
দুঃখের মধ্যে, এই নীতি প্রণীত হইলেও কাজের বেলা অবস্থা ছিল যথা পূর্বম্ তথা পরম্। মাতৃভাষা পূর্ববৎ অবহেলিতই থাকিল আর ইংরেজি ব্যবস্থার প্রসার ঘটিল। তখন ইংরেজি শিক্ষার একটি বিষয় মাত্র ছিল না। ইংরেজি ছিল প্রবেশিকা পরীক্ষার আর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার একমাত্র ভাষা। এই ব্যবস্থাপনার ফলে বুনিয়াদি স্তরের (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক) শিক্ষায় ইংরেজির চাপ বাড়িতেই থাকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পর্যন্ত তাঁহার সংস্কৃত কলেজে ইংরেজি বিষয়টি অবশ্যপাঠ্যের তালিকাভুক্ত করেন।
আপনারা একটা কথা শুনিলে হয়তো খানিক তাজ্জবই বনিবেন যে, বাংলাদেশে সর্বসাধারণের প্রাথমিক শিক্ষা-বিরোধীদের দলে অগ্রগণ্যদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের নাম নিত্যস্মরণীয় হইয়া আছে। ১৮৫৪ সালের ডেসপাচে মাতৃভাষার মধ্যস্থতায় শিক্ষার যে নির্দেশনা ও মঞ্জুরি প্রদানের অনুমোদন দেওয়া হইয়াছিল তাহাদের মতো মহাত্মগণের ছায়ায় সেই নির্দেশনা সুকৌশলে পাশ কাটাইয়া বাংলাদেশের ভদ্রলোক শ্রেণী নিজের কোলে ঝোল টানিবার স্বার্থে বিদ্যাসাগর প্রবর্তিত ‘অ্যাংলো-বর্ণকুলার’ বা ইংরেজি-বাংলা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ অবলম্বন করে।
অনেকেই ধরিয়া লইয়াছিলেন বর্ণকুলার বিদ্যালয়-ব্যবস্থার কল্যাণে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার হইবে। ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাস লিখিতে বসিয়া আমাদের কালের ছোটবড় বহু লেখকই এই বিভ্রাট ঘটাইয়াছেন। ডেভিড হেয়ারের বিদ্যালয় বা আজিকার প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়ের আদি রূপ হিন্দু বিদ্যালয় যেমন, পরের ‘হার্ডিঞ্জ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানাদিও তেমন। শ্রেণীচরিত্রে এগুলিও আলাদা হয় নাই।
আমাদের কালের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ পরমেশ আচার্য্য উল্লেখ করিতে কসুর করেন নাই, বিদ্যাসাগর আপনার জন্মভূমি বীরসিংহ গ্রামে যে বিদ্যালয় খাড়া করিয়াছিলেন, তাহার কারিকুলামে ইংরেজি ও সংস্কৃত ছিল মুখ্য আর বাংলা ছিল পড়াইবার গৌণ বিষয়। ১৮৬৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক (ফার্স্ট আর্টস) এবং স্নাতক স্তরে যে সব বিষয় পড়ানো হইতে তাহার তালিকা হইতে মাতৃভাষা একেবারেই তুলিয়া দেওয়া হইল। এই প্রসঙ্গে পরমেশ আচার্য্যরে মন্তব্য অবিস্মরণীয় : ‘ঔপনিবেশিক শাসকেরা ইংরেজি শিক্ষা চালু করিয়াছিলেন এই সত্যে সন্দেহ নাই; তবে ইংরেজি শিক্ষাবিস্তারের উদ্যোগটা গ্রহণ করিয়াছিলেন ভারতীয় এলিটগণ, বিশেষত বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণী।’
শুদ্ধ তাহাই নয়, যখন গভর্নর জেনারেল রিচার্ড মেয়ো এবং বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর জর্জ ক্যাম্বেল মাতৃভাষার মধ্যস্থতায় শিক্ষাদানে নিরত নিম্নতম প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি আর্থিক মঞ্জুর আওতায় আনিতে মনস্থ করিলেন, ভদ্রলোক শ্রেণীর লোকজন তখন প্রতিবাদে মুখর হইয়া উঠিলেন। এই প্রতিবাদী ভদ্রলোকদের মধ্যে ছিলেন অগ্রগণ্য পণ্ডিত রাজেন্দ্রলাল মিত্র। ১৮৭০ সালের ২রা জুলাই তারিখে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় তিনি বলেন : ‘বাংলাদেশের কোন হিন্দু এক মুহূর্তও কামনা করে না আমাদের বর্তমান সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না থাকুক। মোটের উপর বলিতে ভারতের ইতিহাসের শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত এতটা ভালো সরকার আর কোনদিন দেখা যায় নাই; আর এই সরকারকে যদি টিকিয়া থাকিতে হয় তো ইংরেজি শিখিবার প্রয়োজনটা সদাসর্বদাই অব্যাহত থাকিবে, এমনকি বাংলা ভাষা যখন ইংরেজি ভাষার মতো পরিপক্ক হইবে তখনও থাকিবে।’ আমাদের দেশের হালফিল শিক্ষা-ব্যবস্থায় ইংরেজি ভাষা কেন এবং কিভাবে কায়েম আছে তাহার একটা ইশারা আশা করি মিত্র মহাশয়ের এই কর্ণামৃত সদুক্তিতেও মিলিবে।
এই বিষয়ে দুইচারি জন ব্যতিক্রমের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম লইতেই হইবে। বাংলা ১২৮১ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাযোগে ইনি ছোটলাট ক্যাম্বেল সাহেবের নিম্নশিক্ষা উদ্যোগের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান ভদ্রলোক শ্রেণীর কড়া নিন্দা করিয়াছিলেন : ‘উচ্চশিক্ষার বিরুদ্ধাচরণ তাঁহার আর একটি নিন্দার কারণ। যিনি কোন প্রকার শিক্ষার বিরুদ্ধাচরণ করেন, তিনি মনুষ্যজাতির শত্রুর মধ্যে গণ্য। তবে ইহা স্মরণ করিতে হইবে যে, সকল মনুষ্যেরই শিক্ষায় সমান অধিকার। শিক্ষায় ধনী পুত্রের যে অধিকার, কৃষকপুত্রের সেই অধিকার। রাজকোষ হইতে ধনীদিগের শিক্ষার জন্য অধিক অর্থব্যয় হউক, নির্ধনদিগের শিক্ষায় অল্প ব্যয় হউক, ইহা ন্যায়বিগর্হিত কথা। বরং নির্ধনদিগের শিক্ষার্থ অধিক ব্যয়, এবং ধনীদের শিক্ষার্থ অল্প ব্যয়ই ন্যায়সঙ্গত; কেন না ধনীগণ আপন ব্যয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত হইতে পারে, কিন্তু নির্ধনগণ, সংখ্যায় অধিক, এবং রাজকোষ ভিন্ন অনন্যগতি।’
এই প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র অধিক গিয়াছিলেন। ভারতে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ সরকারের বিচারের ছলে তিনি স্বদেশীয় ভদ্রলোক শ্রেণীর স্বার্থপর নীতির নিকুচি করিলেন : “কিন্তু ভারতবর্ষীয় ব্রিটিশ গবর্ণমেন্ট পূর্ব্বাপর শিক্ষার্থে যে প্রণালীতে ব্যয় করিয়া আসিয়াছেন, তাহা ন্যায়ানুমোদিত নহে। ধনীর শিক্ষার্থই সে ব্যয় হইয়া আসিতেছে; দরিদ্রের শিক্ষার্থ প্রায় নহে। যখন ইন্ডিয়ান গবর্ণমেন্ট হইতে এ প্রথা পরিবর্ত্তন করিয়া, ধনী শিক্ষার ব্যয়ের লাঘব করিয়া দরিদ্র শিক্ষার ব্যয় বাড়াইবার প্রস্তাব হইয়াছিল, তখন র্স উইলিয়ম গ্রে ‘উচ্চশিক্ষা! উচ্চশিক্ষা!’ করিয়া সে প্রস্তাবের প্রতিবাদ করিয়া, দেশের লোকের প্রিয় হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু দেশের মঙ্গল করেন নাই। যদি উচ্চশিক্ষার ব্যয় হইতে কিছু টাকা লইয়া তাহা দরিদ্রশিক্ষায় ব্যয় করিবার জন্য র্স জর্জ কাম্বেল উচ্চশিক্ষার ব্যয় কমাইয়া থাকেন, তবে আমরা তাঁহার নিন্দা করিতে পারি না।”
বঙ্কিমচন্দ্রের এই বিচারের পর আর কিছু বলিবার থাকে না। তবে শুদ্ধ এইটুকু যোগ করা যাইতে পারে যে, ধনী ও নির্ধনের শিক্ষার্থ রাজকোষ হইতে ব্যয় বা মঞ্জুরির এই ব্যবধান শুদ্ধমাত্র শ্রেণীর সহিত শ্রেণীর বিরোধে শেষ হয় নাই, এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত হিন্দু ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর বিচ্ছেদে পর্যবসিত হইয়াছিল।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাতারে রেভারেন্ড লালবিহারী দে নামে খ্যাত অন্য এক মনীষীর নামও পেশ করিতে হয়। ইনিও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষাস্বার্থের পক্ষে দাঁড়াইয়াছিলেন। রেভারেন্ড দে নিম্নতর শ্রেণীর জন্য শিক্ষাখাতে রাজকোষ হইতে মঞ্জুরি দানের দাবি সমর্থন করিয়াছিলেন। পরমেশ আচার্য্যরে মতে কলিকাতার নামজাদা ভদ্রলোকদের মধ্যে লালবিহারী দেই সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রাথমিক শিক্ষা সর্বজনীন ও অবশ্য করণীয় করার দাবি তুলিয়াছিলেন।
১৮৬৯ সালে বিডন সোসাইটিতে দেওয়া একটা বক্তৃতাযোগে প্রাথমিক শিক্ষা সর্বসাধারণের মধ্যে বিস্তারের উদ্দেশ্যে ঘোষিত সরকারী নীতির পক্ষে আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অন্যান্য ভদ্রলোকদের রক্ষণশীল ও উচ্চশ্রেণীর মধ্যেই শিক্ষা সংকুচিত রাখিবার যে ন্যায়বিগর্হিত নীতি সেই নীতির সমূহ নিন্দা করেন। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের এক সভায় কিশোরীচাঁদ মিত্র এই বলিয়া টম মেকলের নীতির পক্ষে সাফাই গাহিতেছিলেন : ‘সমাজসংগঠনের নীচতলাগুলিকে অবশ্যই উপরতলা দিয়া প্রবেশ করিতে হইবে। ইত্যবসরে কোর্ট অব ডিরেক্টর কর্তৃক প্রেরিত ডেসপাচ কার্যকর হইবার পরে স্থাপিত স্কুল ও পাঠশালাদির বিশাল সংখ্যাই সুনিশ্চিত প্রমাণ যে নিম্নগামী চুয়ানি কাজ করা শুরু করিয়াছে। উপরের শ্রেণী আর মধ্যশ্রেণীর শিক্ষার ব্যবস্থা করুন, তাহাতেই কাজ হইবে, নীচের শ্রেণীগুলি প্রশিক্ষণ লাভ করিবে আর উপরের শ্রেণীতে উঠিবে।’
জবাবে লালবিহারী দে বলেন : ‘শিক্ষার এই নিম্নগামী চুয়ানি প্রস্তাবনাটি উচ্চশ্রেণীর, তথা উচ্চতম শ্রেণী বা ব্রাহ্মণদের অহমিকায় যতই তৈলমর্দন করে করুক, সত্য এই যে ব্রাহ্মণেরা খ্রিস্টীয় সালগণনা শুরুর হাজার বছর আগেও ছিলেন শিক্ষিত শ্রেণী, কিন্তু জ্ঞানের একটা ফোঁটাও তিন কোটির গায়ে পড়ে নাই...।’
এই শ্রেণীবৈষম্য কিভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যত বিভক্তির ভিত্তি রচনা করিয়াছিল তাহার আভাস মেলে ১৮৮২ সালে গঠিত প্রথম ভারতীয় শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে। কমিশনের সম্মুখে সাক্ষ্যদান উপলক্ষে নওয়াব আবদুল লতিফ যাহা বলিয়াছিলেন তাহা হইতে সেই আভাস স্পষ্টতর হয়। সরকারী পরিসংখ্যান বিছড়াইয়া নওয়াব আবদুল লতিফ দেখাইয়াছিলেন, ১৮৮১-৮২ নাগাদ বাংলা, বিহার আর উড়িষ্যা মিলাইয়া যে প্রদেশ তাহার মুসলমান জনসংখ্যা পৌঁছিয়াছিল সর্বমোট ২১ মিলিয়ন বা দুই কোটি দশ লক্ষে। আর প্রদেশের যাবতীয় বিদ্যালয়ে সকল মুসলমান বালক এক জায়গায় আনিলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১৫৬,০৮১ জন (বা শতকরা .৭৪)। এখানেই প্রমাণ শিক্ষার অগ্রগতি কতখানি হইয়াছিল। নিম্নগামী চুয়ানি প্রস্তাবের কথা এখানে অধিক বলিবার আবশ্যক নাই।
দুঃখের মধ্যে, গোটা পঞ্চাশ বছর, অর্থাৎ ১৯৩০ সালের পরেও এই নীতির ফলাফল হিন্দু আর মুসলমানের যুদ্ধ বলিয়া গৌরবযুক্ত হইতেছিল। ১৯৩৬ সালে বিলেতের ভারত বিষয়ক পররাষ্ট্র মন্ত্রী বা ‘সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া’ বরাবর প্রেরিত এক স্মারকলিপিতে দেখা গেল বাংলাদেশের হিন্দু ভদ্রলোক সগৌরবে লিখিতেছেন, এদেশে হিন্দুরা সংখ্যায় লঘু হইলে কি হইবে, শিক্ষাদীক্ষা আর চাকুরি-ব্যবসায়ে ইত্যাদির বিচারে তাহারা তো অন্যান্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তথ্যস্বরূপ তাহারাই লিখিয়াছিলেন বাংলাদেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর শতকরা ৬৪ জন তাহারা, স্কুল-কলেজযাত্রী ছাত্রছাত্রীর মধ্যে তাহাদের সংখ্যা শতকরা ৮০ আর স্বাধীন বৃত্তি-পেশা আর ব্যবসায়-বাণিজ্যেও তাহাদের আর্থিক আধিপত্য সহজেই চোখে পড়িবার মতো।
অন্য অনেকের সঙ্গে এই ভদ্রলোক-স্মারকলিপি- স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে বিশ্ববিখ্যাত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামও চোখে পড়ে।
যাহারা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ লইয়া মায়াকান্না না করিয়া ঘুমাইতে পারেন না, তাহারা যদি এই ঘটনাকে ফিল্টার ডাউন থিওরির অন্যতর পরিণতিজ্ঞানে বিচার করেন তো আখেরে অনেক অশ্রু বাঁচে।
পুনশ্চের পুনশ্চ : ব্রিটিশ অধিকারের যুগে আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা কেন সর্বজনীন হইল না তাহার একটা কারণ খোদ ব্রিটিশ শাসন। দ্বিতীয় কারণটাও ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই কারণের নাম ভদ্রলোক শ্রেণী। এই শ্রেণী ছিল ডাউনওয়ার্ড ফিলট্রেশন থিওরির বড় সমজদার। এই শ্রেণীর আপনজন হইয়াও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যেমন ইহাদের সঙ্গে একমত হইতে পারেন নাই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তেমন পারেন নাই।
১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত এক বক্তৃতার অবকাশে ঠাকুর ভদ্রলোক শ্রেণীর অবিমৃষ্যকারিতার কথাই বলিতেছিলেন : ‘শিক্ষার ঐক্য-সাধন, ন্যাশনল ঐক্য-সাধনের মূলে, এই সহজ কথা সুস্পষ্ট ক’রে বুঝতে আমাদের দেরি হয়েছে তারও কারণ আমাদের অভ্যাসের বিকার। একদা মহাত্মা গোখ্লে যখন সার্বজনিক অবশ্যশিক্ষা প্রবর্তনে উদ্যোগী হয়েছিলেন তখন সব চেয়ে বাধা পেয়েছিলেন বাংলাপ্রদেশের কোনো কোনো গণ্যমান্য লোকের কাছ থেকেই। অথচ, রাষ্ট্রীয় ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা এই বাংলাদেশেই সবচেয়ে মুখর ছিল।’
শুদ্ধমাত্র এখানেই নয়, রবীন্দ্রনাথ একাধিক স্থলে গণ্যমান্য ভদ্রলোক নেতারা যে সবার জন্য অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা উদ্যোগের বিরোধিতা করিতেন তাহা স্মরণ করিয়াছিলেন। ভাবিলে অবাক লাগে যখন জানি মহারাষ্ট্রের মহাত্মা গোখ্লে বড়লাটের নেতৃত্বাধীন আইন পরিষদে প্রস্তাব তুলিয়াছিলেন সরকার যেন অন্তত তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বিনাবেতনে দেওয়ার বিধান করেন। বলাবাহুল্য সেই প্রস্তাব গৃহীত হয় নাই।
২৭ আগস্ট ২০২৬
সলিমুল্লাহ খান : অধ্যাপক, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
(লেখকের বানান ও ভাষারীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)

