Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সামরিক জোট : ছোট দেশের বড় শক্তি

Advertisement

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সামরিক জোট : ছোট দেশের বড় শক্তি

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

‘মক্কা চুক্তি’ এখন ব্যাপকভাবে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ সামরিক চুক্তিটিতে বাংলাদেশের যোগদান নিয়েও কথা হচ্ছে। পক্ষে ও বিপক্ষে নানা যুক্তি দেখা যাচ্ছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এই ত্রিদেশীয় চুক্তিটিকে অনেকে মুসলিম ন্যাটো হিসাবেও অভিহিত করেছেন। সৌদি আরবের আছে অঢেল অর্থ এবং মক্কা ও মদিনার মতো পবিত্র স্থান। তুরস্কের আছে সামরিক প্রযুক্তি, দক্ষতা ও সক্ষমতা। পাকিস্তানের আছে শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও পরমাণু অস্ত্র। ফলে তিনটি দেশ তাদের পুরো শক্তি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে চালিত করতে পারলে বিরাট সাফল্য অর্জিত হতে পারে। এমন এক জোটে জনসংখ্যাসমৃদ্ধ বাংলাদেশ যাবে কি যাবে না, সেই আলোচনা এখন চলছে।

ছোট বা দুর্বল দেশের সামরিক জোটে যোগদান নতুন কিছু নয়। বৃহৎ প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ার মতো সক্ষমতা ছোট দেশগুলোর থাকে না। সামরিক সক্ষমতা অর্জন খুব একটা সহজ নয়। স্বল্পমেয়াদে তো নয়ই। এমনকি বিপুল অর্থ থাকলেও অনেক সময় তা হয় না। তখন কোনো একটি জোটে থাকাটাই তাদের জন্য নিরাপদ হয়। এতে সামরিক জোট তাদের জন্য বড় শক্তি বিবেচিত হয়। অবশ্য, এর রেশ ধরে স্বৈরশাসকের উত্থান ঘটনার নজিরের কথাও অনেকে বলে থাকেন। এ কারণেই স্নায়ুযুদ্ধের সময় কোনো না কোনো বলয়ে থাকাটা প্রায় অবধারিত হয়ে পড়েছিল। আবার সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অনেক দেশ অন্য কারও পোস্টার বয় হিসাবেও আত্মপ্রকাশ করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দীর্ঘ সময় মার্কিনিদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বহুমেরুর দুনিয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দুই মেরুর দুটি বলয় না হয়ে আগামীতে অনেক জোটের আবির্ভাবও অপ্রত্যাশিত হবে না। ইরান যুদ্ধ, চীন-রাশিয়া ঐক্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অটুট আস্থায় ফাটল ধরা, সিরিয়ার নাটকীয়তা, মক্কা চুক্তি, ভারত-ইসরাইল মিত্রতা ইত্যাদির মাধ্যমে বিষয়টি প্রকট হচ্ছে।

অনেকে বলে থাকেন, বড় শক্তিগুলো অনেক সময়ই ছোটদের প্রয়োজনের সময় সাড়া দেয় না। এ ধরনের অনেক নজির আছে। বিষয়টি সত্য। কিন্তু কোনো জোটের সঙ্গে থাকলে তাকে ঘাঁটতে অনেকেই সাহস করবে না বলেও পালটা যুক্তি আছে। পরমাণু অস্ত্র যতটা না ব্যবহার করার জন্য তৈরি করা হয়, তার চেয়ে বেশি দরকার হয়, আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। তাছাড়া পাকিস্তান যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন-কাউকে অসন্তুষ্ট না করেই এই জোট গড়েছে, ওই নীতি অনুসরণ বাংলাদেশও করতে পারে। কোনো দেশ সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট হবে-এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, বরং আমাদের প্রয়োজন, সুবিধা-অসুবিধাগুলো বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জোটবদ্ধতা নতুন কিছু নয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বিশাল ভারতের বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্যই কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হিসাবে থাকতে চেয়েছিলেন। এমনকি এ লক্ষ্যে তিনি ডোমিনিয়ন মর্যাদা পর্যন্ত মেনে নিয়েছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার বিখ্যাত ঐতিহাসিক আয়েশা জালাল দেখিয়েছেন, জিন্নাহর ডোমিনিয়ন মর্যাদার দাবি কেবল একটি সাংবিধানিক চাল ছিল না; এটি এমন একটি কৌশল ছিল যা নিশ্চিত করে যে উপমহাদেশ রক্ষায় ব্রিটেনের স্বার্থ থাকবে, যার ফলে ভারতের শত্রুভাবাপন্নতার বিরুদ্ধে পাকিস্তান একটি প্রতিরক্ষা ঢাল পাবে।

নৃতাত্ত্বিক ও গবেষক আকবর এস. আহমেদ তার জিন্নাহ, পাকিস্তান অ্যান্ড ইসলামিক আইডেন্টিটিটি : দি সার্চ ফর সালাদিন বইতে জিন্নাহর নিরাপত্তা ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বইটিতে লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন এবং জিন্নাহর মধ্যকার আলোচনার রেফারেন্স দিয়ে দেখানো হয়েছে, জিন্নাহ যুক্তরাজ্যকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে কমনওয়েলথে একটি অনুগত পাকিস্তান ব্রিটেনের মধ্যপ্রাচ্য ও এশীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যার বিনিময়ে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সুরক্ষা আশা করেছিল।

ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি উলপার্ট দেখিয়েছেন, জিন্নাহর ওই কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়েই লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ডোমিনিয়ন মর্যাদা এবং কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হতে ভারতকে রাজি করিয়েছিলেন। জওহেরলাল নেহরুর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন কৃষ্ণ মেনন। মাউন্ট ব্যাটেন ওই পর্যায়ে কৃষ্ণ মেননকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, ভারত যদি ব্রিটিশ কমনওয়েলথে না থাকে, তবে পাকিস্তান, যারা সেখানে যোগ দিতে অত্যন্ত আগ্রহী, শিগগিরই তাদের ‘সশস্ত্র বাহিনীকে হিন্দুস্তানের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলবে... করাচির মতো জায়গাগুলো ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত বড় নৌ ও বিমান ঘাঁটিতে পরিণত হবে।’ কৃষ্ণ মেনন সেই সম্ভাবনার কথা ভেবে ‘পুরোপুরি শিউরে ওঠেন’ এবং নেহরু ও প্যাটেলকে ভারতের জন্য ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস বা ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন মর্যাদা চেয়ে আবেদন করতে রাজি করানোর জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন। প্রকৃতপক্ষে তারা শিগগিরই তাই করেছিলেন, যদিও কংগ্রেসের আগের ‘দৃঢ়’ প্রতিশ্রুতি ছিল যে, ভারত পুরোপুরি ‘স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র’ হবে।

উল্লেখ্য, ভারত ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি নতুন সংবিধান গঠনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ গণপ্রজাতন্ত্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। আর পাকিস্তান ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ প্রথম সংবিধান গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।

অন্যদিকে ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ১৯৫৬-১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের জোটনিরপেক্ষ নীতি ত্যাগ করে পূর্ণাঙ্গভাবে মার্কিন বলয়ে (সিয়েটো ও সেন্টো/বাগদাদ চুক্তি) প্রবেশ করা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। সোহরাওয়ার্দী স্পষ্ট অনুভব করেছিলেন, কোনো শক্তিশালী পরাশক্তির সরাসরি সামরিক সহায়তা ও ছাতা ছাড়া পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষা করা বা ভারতের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব নয়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সিয়াটো এবং সেন্টো (বাগদাদ চুক্তি)-তে যোগ দেওয়ার প্রাথমিক শর্তই ছিল বড় অঙ্কের সামরিক সাহায্য, আধুনিক ট্যাংক, যুদ্ধবিমান এবং রাডারসহ অবকাঠামো লাভ করা। সোহরাওয়ার্দী ভেবেছিলেন, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে ভঙ্গুর পাকিস্তানকে দ্রুত শক্তিশালী করার সহজতম পথ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা চুক্তি করা। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের পক্ষে একটি শক্তিশালী পরাশক্তির স্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন ছিল। এটাও ঠিক যে, সোহরাওয়ার্দী যখন ১৯৫৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হন, ততদিনে পাকিস্তানের সিভিল-সামরিক আমলাতন্ত্র (বিশেষ করে ইস্কান্দার মির্জা এবং জেনারেল আইয়ুব খান) মার্কিনমুখী নীতি নির্ধারণ করে ফেলেছিল। পাকিস্তান ১৯৫৪ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহায়তা চুক্তিতে সই করেছিল। সোহরাওয়ার্দীর মতো একজন রাজনৈতিক প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের ইতঃপূর্বে তৈরি করা এই ভূ-রাজনৈতিক অক্ষ থেকে বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব ছিল।

সোহরাওয়ার্দী ব্যক্তিগতভাবে সমাজতন্ত্র বা সোভিয়েত ঘরানার আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভক্ত ছিলেন। স্নাযুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ারের সেই উত্তাল সময়ে বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। সোহরাওয়ার্দীর মতে, একটি নবীন ও দুর্বল রাষ্ট্রের পক্ষে ‘জোটনিরপেক্ষ’ থাকার চেয়ে যে কোনো একটি বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সুস্পষ্ট চুক্তি রক্ষা করা বেশি সুবিধাজনক।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখানে ভারতের প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে ’৭৫-এর পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জিয়াউর রহমান কোনো সামরিক জোটে না গিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে সার্ক নামের একটি জোট গঠন করার উদ্যোগ নেন। এটিও ছিল একটি দুর্দান্ত আইডিয়া। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, আফ্রিকান ইউনিয়ন, আসিয়ান ইত্যাদির মতো একটি জোটে থাকলে বিশেষ মর্যাদা পাওয়া যায়, নিজস্ব প্রতিরক্ষাবলয়ও গড়ে ওঠে। একইসঙ্গে তিনি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা ওআইসিকেও শক্তিশালী হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন। ওই সময়ের জন্য এটি দারুণ কার্যকর পন্থা। খালেদা জিয়ার আমলেও সার্ককেন্দ্রিক প্রয়াস ছিল। ভারত নিজের একক প্রাধান্য বিস্তার করতে গিয়ে সার্ককে অকার্যকর করে দেয়। ফলে বাংলাদেশকে এখন নতুন কিছু ভাবতেই হবে।

বাংলাদেশের নতুন সরকার স্বাধীনতা, সার্বভৌম দেশ হিসাবে মর্যাদা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি সামনে এসেছে। এই জোটে যোগ দিলে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে বাংলাদেশ। তবে প্রাপ্তিও কম হবে না। সার্বিক বিবেচনায় কিছু ঝুঁকি নিতে হতেই পারে।

মোহাম্মদ হাসান শরীফ : সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম