Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

নিউইয়র্কের চিঠি

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শরিয়াহ আইন ভীতি

Icon

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শরিয়াহ আইন ভীতি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময় আলোচনা ও বিতর্কের মধ্যে থাকতে পছন্দ করেন। ইসরাইলের সঙ্গে মিলে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর হামলার সাত মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও যুদ্ধে সুবিধা করতে পারার পরিবর্তে উলটো ইরানের কাছে ‘ইটের বদলে পাটকেল’ খাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়ে তীব্র অভ্যন্তরীণ সমালোচনা ও ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মুখোমুখি হয়েছেন। আমেরিকান জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য গত সপ্তাহে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে এবং ফেডারেল পর্যায়ে ইসলামি শরিয়াহ আইনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে তিনি। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করবেন। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে তিনি ক্রমবর্ধমানসংখ্যক কট্টর রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যানের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন, যারা প্রেসিডেন্টকে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করার পক্ষে চাপ দিচ্ছেন, যার লক্ষ্য আমেরিকান আইনের ওপর ইসলামি আইনের প্রাধান্য প্রতিরোধ করা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি হচ্ছে, শরিয়াহ আইন আমেরিকান আইনগত ও সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, ‘দেশকে একটি আইনি ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হতে হবে।’ তার এ ঘোষণা ইসলামি আইন, অভিবাসন এবং বিদেশি আইনসংক্রান্ত বিধি নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্যের দীর্ঘ ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। মধ্যমেয়াদি নির্বাচনের যখন আর মাত্র দু’মাস বাকি, ভোটারদের যে কোনো গোষ্ঠীকে যখন তোয়াজ করার সময়, ঠিক সে মুহূর্তে শরিয়াহ আইন নিষেধাজ্ঞার পক্ষে তার এ বক্তব্য হেলাফেলা করার চেয়ে বরং অনেক বেশি উদ্দেশ্যমূলক ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

ট্রাম্প গত সপ্তাহের মঙ্গলবার রক্ষণশীল গণমাধ্যম ‘ব্লেজ মিডিয়া’র প্রতিষ্ঠাতা গ্লেন বেকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শরিয়াহ আইন প্রসঙ্গে তার আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘আপনি লন্ডনে যান, প্যারিসে যান-এটা (শরিয়াহ আইন) প্রায় তাদের জীবনযাপনের দ্বিতীয় পদ্ধতির মতো। আমি অবশ্যই শরিয়াহ আইনের বিষয়টি নিষিদ্ধ করব। আমাদের আদালত ব্যবস্থা থেকে এটা অপসারণ করতে হবে।’ হাউজ মেজরিটি হুইপ মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান টম এমার চলতি বছরের শুরুতে ‘প্রিজারভিং শরিয়াহ ফ্রি আমেরিকা অ্যাক্ট’ ককাসে যোগ দিয়েছেন এবং তার মতে ‘শরিয়াহ আইন আমেরিকান জীবনযাপনের পদ্ধতির সঙ্গে পুরোপুরি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, যা আমাদের সমাজের মূল কাঠামোকেই হুমকির মুখে ফেলবে।’ এর আগে গত বছরের অক্টোবরে আলাবামা অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর টমি টিউবারভিল যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করার জন্য একটি আইন প্র্রস্তাব করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘শরিয়াহ আইন মৌলিকভাবে আমেরিকাবিরোধী এবং আমাদের দেশে এর কোনো স্থান নেই। আপনি যদি শান্তিপূর্ণভাবে আপনার ধর্ম পালন করতে চান, সংবিধানের অধীনে আপনার তা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে; কিন্তু আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্রে এসে আমেরিকান আইনের পরিবর্তে শরিয়াহ আইন প্রয়োগের পক্ষে প্রচার করতে চান, তাহলে আপনার এখানে থাকা উচিত নয়।’ সিনেটর টমি টিউবারভিলের ‘নো শরিয়াহ অ্যাক্ট’ আদালতগুলোকে এমন বিদেশি আইনের ভিত্তিতে দেওয়া রায়, ডিক্রি বা চুক্তি কার্যকর করা থেকে বিরত রাখবে এবং এর ফলে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের কাস্টডি, দত্তক গ্রহণ এবং উত্তরাধিকারসহ এমন বিষয়েও বিদেশি আইন প্রয়োগ নিষিদ্ধ করবে, যদি তা আমেরিকান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়।

ট্রাম্পের বক্তব্যে আমেরিকান সংবিধানে স্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘনের প্রবণতা ফুটে উঠেছে বলে মনে করছেন সমালোচকরা। আমেরিকান মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো প্রেসিডেন্টের ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শরিয়াহর ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মানসিকতা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী মুসলমানদের স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় বিধিবিধান পালনের অধিকার রক্ষাকারী আমেরিকান সংবিধানের প্রথম সংশোধনী লঙ্ঘন করে। রাষ্ট্রের শীর্ষ নির্বাহীর পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্য যে কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্যই ভীতিকর। উল্লেখ্য, পিউ রিসার্চ সেন্টার এবং ইউএস রিলিজিয়ন সেন্সাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনসংখ্যা ৪৫ থেকে ৫৫ লাখ, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ১.৩ থেকে ১.৪ শতাংশ। এ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে খ্রিষ্ট ও ইহুদিবাদের পর ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম ধর্ম। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ২.৪ শতাংশ।

ট্রাম্পের শরিয়াহ আইনবিষয়ক এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসাবে মুসলিম অধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের একটি রাজনৈতিক ঘোষণা আমেরিকান মুসলিমদের প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তাদের মাঝে ভয়ভীতি ছড়িয়ে দেয় এবং প্রকৃত আইনগত সমস্যার সমাধান করার পরিবর্তে চরম ডানপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারদের বর্ণবাদী আচরণকে উৎসাহিত করে। আইন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, ধর্মীয় অনুশীলনগুলো আমেরিকান সংবিধানের অধীনে সুরক্ষিত, যতক্ষণ না সেগুলো বিদ্যমান ফৌজদারি বা দেওয়ানি আইন লঙ্ঘন করে। শরিয়াহ আইনের ওপর ফেডারেল বা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার চেষ্টা হলে তা অবিলম্বে গুরুতর সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ, জনবিক্ষোভ এবং ফেডারেল আদালতে মামলার মুখোমুখি হবে।

মুসলিম সংগঠন এবং নাগরিক অধিকার গোষ্ঠীগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ এবং শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করার সঙ্গে সম্পর্কিত রিপাবলিকান প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, এ বক্তব্যকে ইসলামবিদ্বেষী এবং সাংবিধানিক ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসাবে নিন্দা করেছে।

কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (কেয়ার) মতো সংগঠনগুলো ট্রাম্পের শরিয়াহবিরোধী ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, ট্রাম্পের উদ্যোগ আমেরিকান মুসলিমদের বর্ণবাদী টার্গেটে পরিণত করা এবং ভীতি উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক কৌশল। আমেরিকান মুসলিম নেতারা এবং আইন বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, শরিয়াহ ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলন, নৈতিকতা এবং অন্যান্য ধর্মীয় বিধিবিধান পালনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানকে প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করা কোনো সমান্তরাল আইনি ব্যবস্থা নয়। তারা বলেছেন, আমেরিকান আদালতগুলো ইতোমধ্যেই কঠোরভাবে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের আইনের অধীনে পরিচালিত। এর ব্যত্যয় ঘটলে তা হবে সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘনের শামিল। কারণ, ইসলামি নীতিকে লক্ষ্য করে সর্বাত্মক কোনো নিষেধাজ্ঞা বা আইন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর নিরাপত্তা লঙ্ঘন, যে সংশোধনীতে যে কোনো ধর্ম পালন করার বা না করার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, শরিয়াহ আইন কারও ধর্মীয় বিশ্বাস অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপার নয়, বরং যারা ইসলামের অনুসারী, তাদের শরিয়াহ আইন মেনে চলার পক্ষে নিজেদের অবস্থানকে রক্ষা করা।

শরিয়াহ আইন নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং রিপাবলিকানদের আপত্তির কারণ অন্যত্র এবং তা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস ও অঙ্গরাজ্যের আইনসভাগুলোসহ সরকারের বিভিন্ন স্তরে মুসলিম নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে মোট ২৫৫ জন মুসলিম প্রতিনিধি নির্বাচিত পদে রয়েছেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে কংগ্রেসে ৪ জন মুসলিম, ২৬টি অঙ্গরাজ্যে ৩২ জন মুসলিম অ্যাসেম্বলিম্যান ও ১৪ জন মুসলিম সিনেটর রয়েছেন। নিউ জার্সি, মিশিগান ও ক্যালিফোর্নিয়ায় মুসলিম আইনপ্রণেতার সংখ্যা সর্বাধিক। সিটি কাউন্সিলগুলোর ১১টির মেয়র মুসলিম এবং ৯৮ জন মুসলিম সিটি কাউন্সিলম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া শিক্ষা বোর্ডগুলোতে ৬৩ জন নির্বাচিত মুসলিম প্রতিনিধি দায়িত্ব পালন করছেন। ‘কেয়ার’-এর নির্বাহী পরিচালক নিহাদ আওয়াদ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এই রেকর্ডসংখ্যক নির্বাচিত মুসলিম প্রতিনিধি কেবল একটি ‘পরিসংখ্যান’ নয়, বরং পরিসংখ্যানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং যেসব স্তরে তারা প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেসব নির্বাচনি এলাকায় জনগণের মধ্যে তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। এসব প্রতিনিধিত্ব এমন একটি আমেরিকান মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিফলন, যারা ক্রমবর্ধমানভাবে আমেরিকান মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, সংগঠিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সেবা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শরিয়াহ আইন পরিপন্থি কোনো বিলের খসড়া প্রকাশ করেননি এবং এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো আইনকে সমর্থন করেননি এবং এ বিষয়ক কোনো নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেননি; তবুও তিনি শরিয়াহ আইনবিরোধী বক্তব্য দিয়ে তার একটি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, যা তার মেয়াদে ফেডারেল নীতিতে মুসলিমবিরোধী পরিবর্তন আনতে পারে-এমন আশঙ্কা আমেরিকান মুসলিমদের। কারণ, ইতোমধ্যে তার নির্বাহী আদেশগুলোর মধ্যে একাধিক আদেশে আমেরিকান ও বহির্বিশ্বের মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম