Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

দলগুলোর অস্থি-মজ্জায় দলতন্ত্র যেন মিশে গেছে

Icon

মহিউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দলগুলোর অস্থি-মজ্জায় দলতন্ত্র যেন মিশে গেছে

বাংলাদেশের গ্রাম-যে গ্রাম একসময় ছিল নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কাশবনের মতো শান্ত, যেখানে রাজনীতি ছিল পাড়ার মুরব্বির পরামর্শ, আর নির্বাচন ছিল সামাজিক আস্থার এক উৎসব-সেই গ্রাম আজ দলীয় প্রতীকের রঙে সয়লাব। সময়ের স্রোত বয়ে গেছে, আর সেই স্রোতের ভেতর দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চরিত্র বদলে গেছে ধীরে ধীরে, কখনো অদৃশ্যভাবে, কখনো প্রবল ঝড়ে। দলীয়করণের এ যাত্রা যেন এক দীর্ঘ মহাকাব্য-যেখানে ক্ষমতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পৃষ্ঠপোষকতা, আর মানুষের আশা-নিরাশার গল্প একসূত্রে গাঁথা।

স্বাধীনতার পর প্রথম ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ছিল যেন গ্রাম-বাংলার সহজ-সরল জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। সেই সময় দলীয় পরিচয় ছিল দূরবর্তী শহুরে শব্দ। গ্রামের ছবি ছিল অন্যরকম, যেখানে নিয়ামক ছিল ব্যক্তির চরিত্র, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, আর মুরব্বিদের আস্থা। কিন্তু ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় গ্রাম শাসনের ধারণা, রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় প্রশাসনিক পুনর্গঠন-সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতির অঙ্কুর ধীরে ধীরে গ্রামে শেকড় ছড়াতে শুরু করে। রাজনৈতিক দলগুলো বুঝল-গ্রামই হলো ক্ষমতার প্রকৃত ভিত্তি। এভাবেই শুরু হলো দলীয় প্রভাবের অনানুষ্ঠানিক যুগ। এ সময়টিকে বলা যায় দলীয়করণের অদৃশ্য, কিন্তু গভীরপর্ব।

গ্রাম-বাংলার প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ যেন হয়ে উঠল জাতীয় দলের একেকটি শাখা। উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, সরকারি সম্পদ-সবকিছুই ধীরে ধীরে দলীয় আনুগত্যের সুতোয় বাঁধা পড়তে লাগল। গ্রামের মানুষ বুঝতে শুরু করল-উন্নয়ন চাইলে দলকে মানতে হবে, সেবা চাইলে পরিচয় দেখাতে হবে। রাজনীতি তখন আর শুধু শহরের সংসদ ভবনে কিংবা সচিবালয়ে সীমাবদ্ধ থাকল না; এটি নেমে এলো গ্রাম-বাংলার উঠোনে, চায়ের দোকানে, হাটের মোড়ে, এমনকি কৃষকের জমির আলেও।

২০১৬ সালে হলো গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চালু হলো দলীয় প্রতীকভিত্তিক নির্বাচন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চরিত্র পালটে গেল এক লহমায়। যে ইউনিয়ন পরিষদ একসময় ছিল সামাজিক নেতৃত্বের প্রতীক, সেটি হয়ে উঠল দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুদ্ধক্ষেত্র। দলীয় প্রতীক যেন শুধু একটি চিহ্ন নয়-এটি হয়ে উঠল ক্ষমতার হাতিয়ার আর রাজনৈতিক সংঘর্ষের ক্ষেত্র। গ্রাম-বাংলার শান্ত মাঠে তখন শুরু হলো নতুন নাটক-একই দলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের উত্তেজনা, আর নির্বাচনের দিনগুলোতে চরম অস্থিরতা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পৃষ্ঠপোষকতা যেন এক পুরোনো নদী-যা কখনো শুকায় না। দলীয়করণের এ নদী আরও গভীর হলো স্থানীয় সরকারে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বুঝলেন, দলীয় পরিচয়ই তাদের ক্ষমতার পুঁজি। সরকারি প্রকল্প, ঠিকাদারি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি-সবকিছুই দলীয় আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল। গ্রামের মানুষও বুঝল, সেবা পেতে হলে দলকে মানতে হবে। এভাবে স্থানীয় সরকার আর নাগরিক সেবার প্রতিষ্ঠান থাকল না, বরং হয়ে উঠল দলীয় ক্ষমতা ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র।

২০২৪-২০২৬ সময়ে দলীয়করণ পেল নতুন রূপ। প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রভাব আরও দৃঢ় হলো। সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ-সব জায়গায় দলঘনিষ্ঠ প্রশাসকদের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক উঠল। বিরোধীরা বলল-এটি নির্বাচন বিলম্বের কৌশল। সমর্থকরা বলল-এটি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা; কিন্তু গ্রাম-বাংলার মানুষ দেখল-স্থানীয় সরকার এখন আর শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, প্রশাসনের মাধ্যমেও দলীয় নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ।

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর আগের মতো ‘নির্দল’ ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা নিয়ে এক ধরনের সামাজিক সম্মতি তৈরি হয়েছে। ফলে নিয়ম পালটাচ্ছে। যতদূর জানা যায়, আগামী শীত মৌসুমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। নির্বাচনের জন্য এ সময়টি ভালো। তখন শিক্ষার্থীদের স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হবে। নির্বাচনের সময় স্কুল এবং স্কুলশিক্ষকের ভূমিকা বেড়ে যায়। স্কুল হয় ভোটকেন্দ্র, শিক্ষকরা কেন্দ্র পরিচালনা করেন।

দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো উপরে-উপরে একমত হলেও ভেতরে-ভেতরে দলতন্ত্র ঘাপটি মেরে আছে। দলতন্ত্র দলগুলোর অস্থি-মজ্জায় যেন মিশে গেছে। তার নমুনা দেখছি বেশ কিছুদিন ধরে। গ্রাম-বাংলার হাটে-মাঠে-ঘাটে শোভা পাচ্ছে ঢাউস আকারের ডিজিটাল পোস্টার আর ব্যানার। সেখানে সম্ভাব্য প্রার্থীরা চেয়ারম্যান পদে জনগণের ‘দোয়া’ চাচ্ছেন। পোস্টার-ব্যানারের এক কোণে দলের নেতার ছবি। অর্থাৎ তিনি কোন দলের বরকন্দাজ, তা জানান দিতে মরিয়া।

দলগুলোও দলের লোকদের জিতিয়ে আনতে মরিয়া। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তবে এরই মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছেন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা আসার আগেই বিভিন্ন এলাকায় তারা মাঠে নেমে পড়েছেন। অনেক জায়গায় চেয়ারম্যান পদে দলের একাধিক নেতা প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন। কেউ কেউ এলাকায় জনসংযোগও শুরু করেছেন। কোনো কোনো ইউনিয়নে তিন-চারজন পর্যন্ত বিএনপি নেতা প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে দলসমর্থিত একক প্রার্থী ঠিক করা এবং অন্যদের তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করাই দলের সামনে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থীর ওপর জোর দিচ্ছেন। বিভিন্ন জেলা ও মহানগর কমিটির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং দলের ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলোয় তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলে আসছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘একক প্রার্থী’ ঠিক করতে হবে এবং সবাইকে মিলে দলসমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে হবে। অর্থাৎ, ‘নির্দলীয়’ নির্বাচন হলেও প্রার্থী দেবে দল। ২৭ আগস্ট বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি না করে ঐক্য বজায় রাখার জন্য সংসদ-সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

নেতাদের ভাবনায় আছে, নির্বাচনের আগে একাধিক প্রার্থীকে সমঝোতায় আনতে না পারলে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ তৈরি হবে। এতে দলের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হওয়ারও আশঙ্কা আছে। তাই সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সমন্বয় করা, কাউকে বুঝিয়ে প্রার্থিতা থেকে নিবৃত্ত করা এবং শেষ পর্যন্ত একজনকে দলীয় সমর্থন দেওয়ার কৌশল নিতে হবে বিএনপিকে। নেতারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা আসার আগেই একাধিক নেতা মাঠে নেমে পড়ায় শেষ পর্যন্ত সবাইকে একক প্রার্থীর পক্ষে আনা কঠিন হতে পারে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির নেতাদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা আছে। স্থানীয় নেতাদের ধারণা, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নির্বাচনে থাকার চেষ্টা করবেন। তাদের অনেকে এখন পলাতক থাকলেও তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় ভেতরে-ভেতরে একজন করে প্রার্থী ঠিক করে মাঠে নামতে পারেন।

অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরা আগে থেকেই মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টিও প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে বিএনপিকে বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি দলের ভেতরের একাধিক প্রার্থীর সমস্যাও সামলাতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তুতি থেমে নেই। দলটির নেতারা বলছেন, প্রার্থী বাছাইসহ অনেক প্রস্তুতিই শেষ হয়েছে। ১৩টি সিটি করপোরেশনের বেশির ভাগের প্রার্থীও চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে। তবে তফসিল ঘোষণার আগে প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হবে না। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, তারিখ এখনো স্পষ্ট না হলেও প্রস্তুতি থেমে নেই। প্রার্থী বাছাইসহ ৭৫-৮০ শতাংশ প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।

এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। তবে তৃণমূলে আলোচনার ভিত্তিতে ১১ দলীয় ঐক্যের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলে এতে কোনো বাধা থাকবে না বলে জানিয়েছেন তারা।

এদিকে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে বিএনপি যেসব প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে, তাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার পক্ষে জামায়াত। দলটির নেতারা মনে করেন, এর ফলে বিএনপি নির্বাচনে অতিরিক্ত সুবিধা পাবে। আবার সেই প্রশাসকরা প্রার্থী হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

দেখা যাচ্ছে, দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন হলেও দলগুলো থাকছে সরাসরি। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে এটি হতে যাচ্ছে দলগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের একটি উপলক্ষ্য। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে এক ধরনের বাতাস বইছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় সে বাতাস উলটো দিকেও বইতে পারে। নির্বাচন যদি সত্যি সত্যি অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়, তাহলে ধরে নেওয়া যায়, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী জয়ী হবেন। জাতীয় রাজনীতির চেয়ে স্থানীয় ইস্যুই এখানে কাজ করে বেশি।

প্রশ্ন হলো, নির্বাচন নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হবে কিনা। রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিরোধিতা করেছিল। কারণটি সহজেই অনুমেয়। জাতীয় নির্বাচন আগে হলে উপর থেকে নাটাই ঘোরাতে সুবিধা। সে ক্ষেত্রে আমরা হয়তো আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের মহড়া দেখতে পাব। এটি হতে পারে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ‘ইজ্জতের লড়াই’।

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম