কেমনে গাঁথে কালচারেরও মালা
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘শোন গো রূপসী কন্যা গো, কার লাগিয়া গাঁথো ফুলের মালা?’ আবদুল আলীমের এই মিঠা গান শুনতে শুনতে মাথায় অনেক প্রশ্ন এলো। সেই প্রশ্নগুলোর সূত্র ধরে সামনে হাঁটতে হাঁটতে আমি কালচার আর হেজিমনির আরও অনেক বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হলাম। আজকের লেখায় সেই প্রশ্নগুলো নিয়েই একটু হাঁটাহাঁটি করি।
আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আবদুল আলীম, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়-তারা কিন্তু মোটামুটি একই সময়ের শিল্পী। একই দুনিয়ার মানুষ, প্রায় একই সময়ে গ্রামোফোনে রেকর্ড করছেন, রেডিওতে গাইছেন। এমনকি আবদুল আলীম আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জন্মও একই বছর, ১৯৩১ সালে। অথচ আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস একজনকে মনে রাখছে ‘লোকশিল্পী’ হিসাবে, আর আরেকজনকে ‘আধুনিক গানের শিল্পী’ হিসাবে।
কেন? শুধু সুরের কারণে? মানে একদল অনেক বছর ধরে চলে আসা সুর থেকে গান করেছেন এবং আরেক দল অধুনা তৈরি হওয়া সুর? সেটাও তো ঠিক মিলে না। তাহলে তো রাগাশ্রয়ী গান আরও অনাধুনিক, মানে আরও অনেক আগের।
এখানেই আমার প্রশ্নটা আরও পরিষ্কার করে বলা দরকার। ‘আধুনিক’ শব্দটার আক্ষরিক অর্থই তো অধুনা, কনটেম্পোরারি। যদি বিশ শতকে নতুন করে লেখা এবং নতুন করে সুর করা একটা গানকে আমরা ‘আধুনিক গান’ বলি, তাহলে একই সময়ে নতুন করে লেখা এবং সুর করা আরেকটা গান শুধু তার সুরের মধ্যে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া বা অন্য কোনো দেশজ সংগীতের ফ্লেভার আছে বলে ‘লোকগান’ হয়ে যায় কীভাবে?
বিশ শতকের অসংখ্য আধুনিক গানের মধ্যে রাগসংগীতের ইনফ্লুয়েন্স আছে। রাগ তো আরও বহু পুরোনো সংগীতধারা। কিন্তু একটা নতুন কম্পোজড সং রাগের মেলোডিক ভোকাবুলারি ব্যবহার করলে সে ‘আধুনিক’ই থাকে। তাহলে আরেকটা নতুন কম্পোজড সং ভাটিয়ালি বা ভাওয়াইয়ার মেলোডিক ভোকাবুলারি ব্যবহার করলে সে কেন ‘লোকগান’ হয়ে যায়? এ জায়গায়ই আমার মনে হয় প্রশ্নটা শুধু সুরের থাকে না।
‘শোন গো রূপসী কন্যা গো, কার লাগিয়া গাঁথ ফুলের মালা’-এটা তো কোনো নাম না-জানা, শত শত বছর মুখে মুখে চলে আসা গানও নয়; একজন পেশাদার শিল্পী আবদুল আলীম গানটি রেকর্ড করছেন। তাহলে একে লোকগান বানাচ্ছে কে? ‘কার লাগিয়া’, ‘কইরা’, ‘আইল’-এই ভাষা? একই সুর রেখে যদি কথাগুলো হতো ‘কার জন্য’, ‘করে’, ‘এলো’, এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গানটা গাইতেন, আমরা কি তখনো এটাকে লোকগান বলতাম?
আবার শচীন দেববর্মণের কথা ধরি। তার সুরের অনুপ্রেরণায় ভাটিয়ালি, ধামাইল এগুলো আছে। ভারতীয় রাগসংগীতের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের এই দেশজ সংগীতধারাগুলোর একটা ফিউশন কোথায় যেন টের পাওয়া যায়। তিনি সম্ভবত ফিউশনের পারফেক্ট এগজাম্পল। তাছাড়া ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালির সুর দেশজ বলে যদি আবদুল আলীম বা আব্বাসউদ্দীন লোকশিল্পী হয়ে যান, তাহলে শচীন দেববর্মণের অসংখ্য গানে দেশজ বা লোকজ সুরের প্রভাব থাকার পরও তিনি কেন ‘আধুনিক’?
আবার দেখেন, গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’-এই গানের মধ্যে লালনের ‘মনের মানুষ’-এর ভাবজগতের একটা স্পষ্ট ধারাবাহিকতা আমরা দেখতে পাই। গগনের এ গানকে আমরা বলছি ফোক। অথচ এই গানের সুর নিয়েই রবীন্দ্রনাথ যখন ‘আমার সোনার বাংলা’ লিখলেন, তখন সেটা আর ফোক থাকল না-সেটা রবীন্দ্রনাথের গান, রবীন্দ্রসংগীত, এবং পরে আমাদের জাতীয় সংগীত। একই সুর গগনের হাতে ফোক, রবীন্দ্রনাথের হাতে এসে মেইনস্ট্রিম বেঙ্গলি ক্যাননের অংশ। এ জায়গাটাই আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং।
তাই আমার প্রশ্নটা আসলে লোক আর আধুনিকের সুরগত পার্থক্য নিয়ে না, বরং কে এই নামগুলো দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করল সেটা নিয়ে। আর এখানেই আমার কাছে সংগীতের এ প্রশ্নটা আরও বড় একটা কালচারাল প্রশ্নের সঙ্গে গিয়ে মিলে যায়। কে ঠিক করে কোনটা হাই কালচার, কোনটা লো কালচার? কে ঠিক করে কোনটা প্রগতিশীল, কোনটা পশ্চাৎপদ? কোনটা আধুনিক, কোনটা লোক? কালচারাল পারসেপশন কে তৈরি করে এবং সেই পারসেপশন শেষ পর্যন্ত কী ধরনের ক্ষমতা তৈরি করে?
ঔপনিবেশিক কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে শহুরে ভদ্রলোক সংস্কৃতি তৈরি হলো, তার ভাষা, তার রুচি, তার সংগীত যদি নিজেকে ‘আধুনিক’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, আর একই সময়ে পূর্ববঙ্গ বা বাংলার অন্য অঞ্চলের ভাষা ও সংগীতের প্রকাশকে ‘লোক’, ‘পল্লি’, ‘আঞ্চলিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে এখানে কি শুধু সংগীতের ধারা তৈরি হচ্ছে, নাকি একই সঙ্গে একটা সাংস্কৃতিক শ্রেণিবিন্যাসও তৈরি হচ্ছে-যেখানে একটা ভাষা আধুনিক, পরিশীলিত, কাঙ্ক্ষিত, অর্থাৎ যে মানে তোমাকে পৌঁছাতে হবে; আর অন্যটা লোকজ, গ্রামীণ, নিচের দিকের কোনো একটা উপশ্রেণি?
কিন্তু এই উচ্চ আর নিম্নের সম্পর্কটা বাংলাদেশে একসময় ভাঙতেও শুরু করে। আমার মনে হয়, সবচেয়ে কার্যকরভাবে এই ভাঙার কাজটা করেছে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীত এবং তার পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব আধুনিক গানের একটা ধারা। আজম খান থেকে শুরু করে সোলস, মাইলস, ফিডব্যাক, লাকী আখন্দ, জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, ওয়ারফেজ-পরে প্রিন্স মাহমুদ এবং আরও অনেকে! অন্যদিকে খান আতাউর রহমান, আজাদ রহমান, আলাউদ্দিন আলী, আলম খান, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মতো সুরকার এবং মনিরুজ্জামান মনির, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান, নজরুল ইসলাম বাবুর মতো গীতিকার-তাদের হাতে এসে একটা মজার ঘটনা ঘটল। আধুনিক হওয়ার জন্য আমাদের গানের আর কলকাতার দিকে তাকিয়ে থাকতে হলো না। আমাদের শহর, আমাদের রাস্তা, আমাদের প্রেম, আমাদের বিরহ, আমাদের মেলা, আমাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আমাদের কথার ধরন-এগুলোই আধুনিক গানের বিষয় এবং ভাষা হয়ে উঠল। ফিডব্যাক যখন ‘মেলায় যাইরে’ গায়, আজম খান যখন যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশের তরুণের ভাষায় গান করেন, জেমস বা আইয়ুব বাচ্চু যখন তাদের নিজস্ব উচ্চারণ, চিত্রকল্প আর সুর নিয়ে সামনে আসেন, তখন সেই ভাষাকে আর ‘লোক’ বলে মূলধারার বাইরে সরিয়ে রাখা যাচ্ছে না। সেই ভাষাই তখন মূলধারা, সেই ভাষাই তখন আধুনিক। মাহমুদ জঙ্গী, বাপ্পি খান, আইয়ুব বাচ্চু, লতিফুল ইসলাম শিবলী, দেহলভী, মারজুক রাসেল, কামরুজ্জামান কামু, পথিক নবীদের মতো মানুষ আমাদের স্বর হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশ নিজের প্রেম, প্রকৃতি, দেশ, বিষাদ এবং আকাঙ্ক্ষাকে নিজের ভাষায় বলতে শুরু করেছে। আমার কাছে এই জায়গাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে বাংলাদেশ শুধু কলকাতার তৈরি আধুনিকতার একটা স্থানীয় সংস্করণ তৈরি করছে না; ধীরে ধীরে সে নিজেই নিজের আধুনিকতার কেন্দ্র হয়ে উঠছে। কলকাতা আর সেই একমাত্র মানদণ্ড থাকছে না, যার মতো হলে আমরা আধুনিক হব। আমাদের ভাষা, আমাদের সুর, আমাদের চিত্রকল্প, আমাদের জীবন—এগুলো দিয়েই আধুনিক হওয়া সম্ভব, এই আত্মবিশ্বাসটা সম্ভবত এই প্রজন্মের সংগীতকারদের হাতেই সবচেয়ে জোরালোভাবে তৈরি হয়েছে। সাহিত্যে যে ভূমিকা রেখেছেন আল মাহমুদ, হুমায়ূন আহমেদ, শহীদুল জহির, ব্রাত্য রাইসুসহ আরও অনেকে, থিয়েটারে সেলিম আল দীন, সিনেমায় একদল বেয়াড়া তরুণ এরকম ভূমিকা রেখেছেন।
শেষ করি একটা কথা দিয়ে।
ইদানীং কালচার নিয়ে আমি অনেক লেখালেখি করছি। অনেকের হয়তো প্রশ্ন আসতে পারে, এটার পেছনে কী চিন্তা কাজ করছে? উত্তরটা সিম্পল। যেকোনো বিপ্লবের পরে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা নয়। একই সঙ্গে কালচারাল ল্যান্ডস্কেপ এবং পারসেপশনে বিপ্লবের মূল চেতনাকে প্রবাহিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের জুলাই বিপ্লব কার বিরুদ্ধে হয়েছে? আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, যারা পনেরো বছর গুম, খুন, লুটপাট করে, ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থেকেছে। কিন্তু এত বছর তারা ক্ষমতায় থাকল কীভাবে? তাদের শক্তির বড় জায়গা ছিল দুইটা। একদিকে আধিপত্যবাদী শক্তির নিরঙ্কুশ সমর্থন, কারণ তারা এখানে একটা পাপেট গভর্নমেন্ট বসিয়েছিল। আর বাংলাদেশের ভিতরে এই পাপেট গভর্নমেন্ট সমর্থন পেল কীভাবে? পেল কালচারাল পারসেপশনের কারণে। ফলে দেশের ভিতরে তাদের সবচেয়ে বড় কারেন্সি ছিল এই কালচারাল পারসেপশন। ফ্যাসিবাদকে জায়েজ করার কাজটাও তারা করেছে এই কালচারাল পারসেপশন দিয়ে। সেটা কী? তারা প্রগতিশীল, তারা হাই কালচার, তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে।
জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বপ্রেমী মানুষ এদের মসনদ তছনছ করে দিয়েছে। এরা পালিয়ে গেছে, কিন্তু এদের কালচারাল রেমন্যান্ট তো রয়ে গেছে। এই কালচারাল ন্যারেটিভ অ্যান্ড পারসেপশনের উত্তরটা তাই কালচারালি দিতে হবে।আমাদের সময় আমরা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাটাকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কাজে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছি। নববর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে করেছি, ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা এবং বড়দিনকে সাংস্কৃতিকভাবে উদযাপনের মধ্য দিয়ে করেছি। সারা দেশজুড়ে এক মাসব্যাপী জুলাই পুনর্জাগরণ কর্মসূচি করেছি। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করেছি। ষোল বছরের অপকর্ম এবং জুলাই আন্দোলনের বীরত্ব ও ট্র্যাজেডি নিয়ে অজস্র দর্শকপ্রিয় ডকুমেন্টারি বানিয়েছি, যেগুলোর সম্মিলিত ভিউ এখন পর্যন্ত দুইশো মিলিয়নের উপরে। আবার ১৬ ডিসেম্বর ৬৪ জেলায় একযোগে বিজয় দিবস উপলক্ষে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান নিয়ে কনসার্টের আয়োজন করেছি। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ আর জুলাই—দুইটাকেই আমরা দুই হাতে ধারণ করার চেষ্টা করেছি।
একইভাবে আমাদের পরিচয়ের সবগুলো দিককেই আমরা ধারণ করতে চেয়েছি। আমরা বাঙালি, আমরা চাকমা, মারমা, গারো; আবার আমাদের ধর্মীয় পরিচয় আছে—মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান। আমাদের এই সব পরিচয়কেই সংস্কৃতির মধ্যে সন্নিবেশ করার চেষ্টা করেছি, যাতে কোনো হেজেমনিক কালচার ঢুকতে না পারে। কারণ হেজেমনিক কালচারের পূর্বশর্তই হচ্ছে এই পরিচয়গুলোর মধ্যে সংঘর্ষ এবং ফাটল সৃষ্টি করা।
সামনে আরও কাজ করতে হবে, অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। সরকারে বিএনপি থাকুক বা পরবর্তীতে অন্য কেউ আসুক, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য দিয়ে এই কাজগুলো চলতে থাকতে হবে। বর্তমান সরকার এই বিষয়ে কী ভাবছে না ভাবছে আমি জানি না। তবে আমরা আমাদের মতামতগুলো বলে যেতে পারি।
এর আগেও আমি কালচার নিয়ে লিখেছি। একটা কালচারাল রোডম্যাপ লিখেছি, যেখানে হিস্টরিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড বর্ণনা করেছি—কীভাবে কালচারকে টুল হিসেবে ব্যবহার করে ষোল বছরের ফ্যাসিবাদ আমাদের বুকে চেপে বসেছিল, পরাধীনতা আমাদের বুকে চেপে বসেছিল। ওই কালচারাল রোডম্যাপে আমি করণীয় অনেকগুলো কাজের কথাও বলেছি। এরপর আমি আবুল মনসুর আহমদকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছি। সেখানেও কিন্তু আমি এই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নগুলো তোলার চেষ্টা করেছি।
এই কথাগুলো এবং এই প্রশ্নগুলো যে আমাদের জনপরিসরে বারবার ফিরে আসছে, এটাও জুলাইয়ের একটা বড় অবদান। এখন এই প্রশ্নগুলোকে যদি আমরা আমাদের সামনের দিনের কাজে নিয়মিতভাবে রূপান্তর করতে পারি, তাহলেই জুলাই এবং মুক্তিযুদ্ধের মালা গাঁথা সম্ভব হবে।
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী : সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, চলচ্চিত্র নির্মাতা
