রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের দূরত্ব ঘোচানো জরুরি
Advertisement
সাজ্জাদ সাব্বির
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট দরকারের মুহূর্তে। জাতীয় পরিচয়পত্র করতে গিয়ে একজন নাগরিক কতবার অফিসে যান, জমির কাগজের জন্য কতজনের কাছে ধরনা দেন, হাসপাতালে একটি শয্যা পেতে তাকে কারও পরিচয় ব্যবহার করতে হয় কি না, থানায় অভিযোগ জানালে তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় কি না, সরকারি ভাতা পেতে তাকে স্থানীয় প্রভাবশালীর দ্বারস্থ হতে হয় কি না-প্রতিদিনের এসব অভিজ্ঞতাই নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের প্রকৃত চেহারা তৈরি করে।
রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি হলো সেবা। নাগরিক কর দেন, আইন মানেন এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর অর্থ ও বৈধতা দেন। বিনিময়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিককে নিরাপত্তা, বিচার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সেবা দেওয়া। আর এ নাগরিক সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হলেই মূলত নাগরিক আর রাষ্ট্রের দূরত্ব বাড়ে। রাষ্ট্রের সংবিধান বা আইন যত সুন্দরই হোক, নাগরিক যদি রাষ্ট্রীয় সেবা পেতে গিয়ে অপমান, অনিশ্চয়তা, ঘুষ, দালাল কিংবা রাজনৈতিক সুপারিশের মুখোমুখি হন, তাহলে রাষ্ট্র তার কাছে দূরের একটি ক্ষমতাকেন্দ্র হয়ে থাকে।
লি কুয়ান ইউয়ের সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। লি কুয়ান ইউয়ের সিঙ্গাপুর রাষ্ট্রগঠনের মূল স্তম্ভ ছিল কার্যকর সরকার, মেধাভিত্তিক প্রশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং দক্ষ মানবসম্পদ। তার দৃষ্টিতে উন্নয়ন মানে শুধু বড় প্রকল্প বা জিডিপি বৃদ্ধি নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের কাজ কত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে করতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৬০-এর দশকে সিঙ্গাপুরে আবাসন সংকট ছিল তীব্র। ১৯৬০ সালে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বাস করত। ১৯৮৫ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ সরকারি আবাসনের আওতায় আসে। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ সিঙ্গাপুরির নিজস্ব বাড়ির মালিক এবং প্রায় ৮০ শতাংশ সরকারি আবাসনে বসবাস করেন।
লি কুয়ান ইউয়ের কাছে আবাসন ছিল অর্থনৈতিক প্রকল্পের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি মাধ্যম। মানুষ যখন নিজের বাড়িকে রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজের ভবিষ্যতের অংশ হিসাবে দেখতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্র আর শুধু কর আদায়কারী বা নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকে না। রাষ্ট্র হয়ে ওঠে নাগরিকের প্রতিদিনকার জীবনের অংশ।
লি কুয়ান ইউয়ের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো মেরিটোক্রেসি ও দক্ষ প্রশাসন। সরকারি নিয়োগ, পদোন্নতি ও নেতৃত্ব তৈরিতে যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। দক্ষ মানুষকে সরকারি চাকরিতে আকৃষ্ট করতে প্রতিযোগিতামূলক বেতন ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগও রাখা হয়েছিল। সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতায় সরকারি সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক সুযোগকে রাষ্ট্রের সক্ষমতার কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।
এস্তোনিয়ার উদাহরণ এখানে আরও প্রাসঙ্গিক। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় সেবার ১০০ শতাংশ অনলাইনে পাওয়া যায়। ডিজিটাল স্বাক্ষর ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন নাগরিককে বারবার সরকারি দপ্তরে যাওয়ার প্রয়োজন কমেছে এবং সরকারি হিসাব অনুযায়ী এতে বছরে গড়ে পাঁচ কর্মদিবস সময় সাশ্রয় হয়।
বাংলাদেশও এই পথে মাঝে মাঝে উদ্যোগী হলেও ব্যাপক দুর্নীতি, কর্মকর্তাদের অদক্ষতা এবং আন্তরিকতার অভাবে তা বেশিদূর এগোতে পারেনি। এটুআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ ডিজিটাল সেন্টার রয়েছে, যা ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নানা সরকারি সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে ‘নাগরিক সেবা বাংলাদেশ’ উদ্যোগের আওতায় ৫০০টির বেশি নাগরিক সেবাকেন্দ্র চালুর কথাও জানানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই তথ্য সত্য হলেও নাগরিকের ভোগান্তি কমেনি। এখানে সমস্যা শুধু প্রযুক্তির অভাব নয়। বড় প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নাগরিককে সেবাগ্রহীতা হিসাবে দেখে, নাকি ক্ষমতার অধীন ব্যক্তি হিসাবে দেখে।
নিউজিল্যান্ডের অভিজ্ঞতাও এখানে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ৪৬ শতাংশ মানুষ কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর উচ্চ বা মাঝারি মাত্রার আস্থা প্রকাশ করেছেন, যা ওই সময়ে ওএইসিডি গড় ৩৯ শতাংশের চেয়ে বেশি। একই সময়ে প্রশাসনিক সেবা ব্যবহারকারীদের ৭০ শতাংশ সেবায় সন্তুষ্ট ছিলেন। ওএইসিডি বলছে, কার্যকর ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ জনসেবা এবং নাগরিকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের আস্থার সম্পর্ক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে এখন অনেক নীতিগত বিতর্কের সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করানো জরুরি : নাগরিককে রাষ্ট্রের কাছে যেতে হবে, নাকি রাষ্ট্র নাগরিকের কাছে যাবে? আমাদের নেতৃত্বকে অত্যন্ত বাস্তববাদী হতে হবে। কোনো নীতি রাজনৈতিকভাবে সুন্দর শোনার থেকেও সেটি বাস্তবে কাজ করছে কি না, তাতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত কর্মদক্ষতা পর্যালোচনা ও নীতি সংশোধনকে প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে রূপান্তর করতে হবে। একইসঙ্গে, নাগরিকের জীবনমানকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে। শিল্পায়ন, শিক্ষা, আবাসন, অবকাঠামো, বন্দর, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং দক্ষ মানবসম্পদকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। এবং এমন কিছু জাতীয় লক্ষ্য থাকতে হবে, যেগুলো সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাবে না।
দুর্নীতিকে রাষ্ট্রের সংস্কৃতিতে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। দুর্নীতি দমন কাঠামোকে শক্তিশালী করে, আইনের প্রয়োগ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের উচ্চমানের সততা প্রত্যাশা করাকে ব্যবস্থার অংশ করে নিতে হবে। একইসঙ্গে দুর্নীতির সুযোগ, প্রণোদনা এবং রাজনৈতিক সুরক্ষা কমাতে হবে।
প্রফেসর রওনক জাহান সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলেছেন, গণতন্ত্র টেকসই করতে শক্তিশালী ও স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন এবং নাগরিকের আইনের শাসনের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তার মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিজেদের নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে পারলেই আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের দূরত্ব কমানো মানেই শুধু অনলাইন সেবা চালু করা না। এর অর্থ হলো থানায় গেলে পরিচয় না দেখে অভিযোগ গ্রহণ করা, হাসপাতালে গেলে রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই চিকিৎসা পাওয়া, ভূমি অফিসে গেলে দালাল ছাড়া কাজ হওয়া, আদালতে গেলে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় না থাকা এবং সরকারি কর্মকর্তা নাগরিকের প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য থাকা। রাষ্ট্রকে নাগরিকের কাছে দৃশ্যমান হতে হবে সেবায়, ন্যায়বিচারে এবং জবাবদিহিতে।
লি কুয়ান ইউয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তার কঠোর নেতৃত্ব নয়; রাষ্ট্রকে এমন একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা, যার উপস্থিতি মানুষ প্রতিদিন নিজের জীবনে অনুভব করে। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিকের কাজ এগিয়ে নিতে কোনো ‘ভাই’, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কোনো বিশেষ সুপারিশের দরকার হবে না। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের দূরত্ব যত কমবে, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও তত বাড়বে। আর আস্থাবিহীন রাষ্ট্র যত শক্তিশালীই দেখাক, ভেতর থেকে সেটি দুর্বল।
সাজ্জাদ সাব্বির : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ
