Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

রূপপুর, কপ্টার এবং আমলাদের অর্থপ্রেম

Advertisement

Icon

ড. মাহবুব হাসান

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রূপপুর, কপ্টার এবং আমলাদের অর্থপ্রেম

Advertisement

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি চুল্লি ইতোমধ্যেই চালু হতে পারত। কিন্তু হয়নি। কেন হলো না? কারণ মার্কিনি নিষেধাজ্ঞা। রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তারই ফল হচ্ছে এটা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিশের জন্য দুটি হেলিকপ্টার কেনাও। দ্রুত সরবরাহ করবে-এ শর্তে রাশিয়ার কাছে থেকে দুটি হেলিকপ্টার কিনেছে বাংলাদেশ জি-টু-জি ভিত্তিতে ২০২১-এ। অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার আর রাশিয়ার সরকারের সঙ্গে যুক্ত এ কেনাকাটা। এখানে কোনো তৃতীয়পক্ষ নেই। যখন কিনেছিল কপ্টার দুটি, তখনও রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়নি। চুক্তি হওয়ার দুই মাস পর রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে। আর যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। যে সরকারি সংস্থার কাছে থেকে কপ্টার দুটি কিনছে বাংলাদেশ, সেই পণ্যের ওপরও নেমে আসে নিষেধাজ্ঞার খড়্গ। কিন্তু আমাদের প্রজ্ঞাবান আমলারা এবং আওয়ামী রাজনীতিকরা টাকা পরিশোধের কাজটি করেছেন খুব নিষ্ঠার সঙ্গে। যুগান্তরের রিপোর্ট থেকে তুলে দিচ্ছি-

‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ও ইউক্রেন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এরপর রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদনকারী সব প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনার মাত্র ২ মাস আগে ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে দুটি হেলিকপ্টার কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ সরকার ২০২৪ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ৩ অর্থবছরে ৪২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করার কথা। শর্তানুযায়ী ওই সময়ের মধ্যেই হেলিকপ্টার দুটি সরবরাহ করার কথা ছিল রাশিয়ার।

কিন্তু রাশিয়া কথা রাখেনি। এমনকি হেলিকপ্টার দুটি প্রস্তুতও করতে পারেনি। কিন্তু রাশিয়ান সরকার যেমন জানে, তারা হেলিকপ্টার সরবরাহ করতে পারবে না, তেমনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারও জানত, তারা হেলিকপ্টার পাবে না। এ জানার পরও ‘জেনে-শুনে বিষপান’ করেছে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট আমলারা।

‘পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে দায়িত্ব পালন করা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানান, ‘জি-টু-জি পদ্ধতিতে হেলিকপ্টার কেনা হলেও এর মধ্যস্থতাকারী সৈয়দ আহসান আহমেদ সায়মুমকে ক্রয়মূল্যের ওপর ৪ শতাংশ হারে ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা কমিশন দেওয়া হয়েছে। সাইমুম তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ক্যাশিয়ার ছিলেন। নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানার পরও আট কর্মকর্তা চালান পরীক্ষা (পিএসআই) করতে রাশিয়া যাওয়ার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ওই কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, চুক্তির শর্ত অনুসারে যেতে হয়েছিল, কারণ এটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি।’

যিনি এ পণ্য কেনার মধ্যস্থতাকারী, সেই লোককে তার কমিশনের সোয়া সতেরো কোটি টাকা পরিশোধের কারণ কী? আবার এ প্রশ্নও ওঠে, যে পণ্য গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট কেনা হচ্ছে, সেই পণ্যের জন্য কেন একজন বেসরকারি মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ দেওয়া হবে? সরকারি কেনাকাটায় মধ্যস্থতাকারী রাখার যে আইনি ব্যবস্থা রাখার হয়েছে, তা দেশের সম্পদ রক্ষার চেয়ে তা নস্যাৎ করারই এক প্রক্রিয়া। যিনি বা যারা এরকম আইনি সিদ্ধান্ত তৈরি করেছিলেন, তারা দুর্নীতির দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন নিঃসন্দেহে, না হলে সরকারি মাল লুটের এ ব্যবস্থা কি করতে পারতেন?

আসুন একটি সম্ভাব্য কেনার তথ্যে যাই। বিষয়টি বিমান কেনাকাটার। ফরাসি কোম্পানি বেশ আগেই প্রস্তাব দিয়েছে, তাদের বিমান যাতে আমাদের সরকার কেনে। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের কাছে কয়েক বিলিয়ন ডলারে বিমান বিক্রির কথা বলছেন।

আমরা ফরাসি এয়ারবাস কিনব, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কিনব? যে দেশেরই বিমান আমরা কিনি না কেন, নিশ্চয় মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে রাখা হবে। আপনারা চিন্তা করে দেখেন, সেজন্য মধ্যস্থতাকারীকে কী পরিমাণ জনগণের অর্থ দিতে হবে। আমলারা বলবেন, দিতে হবেই, কেননা, এটাই জি-টু-জি পণ্য কেনার ব্যবস্থাপত্র। আবার পণ্য পান বা না পান, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সরবরাহকারী দেশের সংস্থাকে নিয়মিতই টাকা পরিশোধ করতে হবে। যে পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্গত, সেই পণ্যের মূল্য পরিশোধের উদগ্র বাসনা কেন? আওয়ামী লীগ আমলে ওই বাসনা ছিল, আমরা তার দোষ ধরব না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও কেন সরকারি কোষের মূল্যবান ডলার ব্যয়ের রাশ টানা হলো না? আবার যে পণ্য আসবে না জেনেও কী করে তারা পিএসআই করতে ৮ জন রাশিয়ায় গেলেন? তারা যে জেনে-বুঝেই সরকারি টাকায় দরিয়ায় ঢালার ব্যবস্থায় সিদ্ধহস্ত, তাতে কোনো ভুল নেই।

এখানে দুটি-তিনটি অন্যায়-অবৈধ কাজ তারা করেছেন-

১. চুক্তি করার দুই মাসের মধ্যেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তারা চুক্তি বাতিলের ব্যবস্থা নিতে পারতেন; কিন্তু তারা তা করেননি। নিশ্চয় স্বারষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালকে তারা বিষয়টি জানিয়েছিলেন; কিন্তু মধ্যস্থতাকারীর টাকা যাতে বেহাত না হয়, সেজন্য তিনি পেমেন্ট করতে উৎসাহ দিয়েছেন।

২. পিএসআই করতে যাওয়াও অবৈধ ও অপরাধমূলক।

৩. পণ্য পাওয়া যাবে না জেনেও কেন তারা রাশিয়া ভ্রমণ করলেন। আর কে কে তাদের রাশিয়া ভ্রমণের পারমিশন দিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আমলাদের মানবিক ও কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি অন্যায়? তাদের দেশপ্রেম কি যাচাইসাপেক্ষ নয়? তারাও তো এদেশেরই সন্তান; কিন্তু তাদের কাজে-কর্মে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেই দেশপ্রেম পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

তারা চুক্তিটি বাতিলের জন্য চেষ্টা করতে পারতেন। আসাদুজ্জামান কামালকে বলতে পারতেন এর পরিণাম কী হবে। তারা নিজেরাও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি করতে পারতেন। তাদের সামনে রূপপুরের উদাহরণ ছিল। তারা সে পথে যাননি। কারণ তারা জানেন শেষতক আমলারাই বিজয়ী হবেন। আর রাজনীতিকরা জেলে যাবেন, কিংবা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যাবেন অন্য দেশে, মূলত ভারতে। ভারত হচ্ছে সন্ত্রাসী আর অপরাধীদের আশ্রয়স্থল।

এ আমলাতন্ত্র সংস্কার করা জরুরি। যে কাঠামো জনগণের অর্থ-সম্পদ লুটেরাদের হাতে তুলে দিতে কসুর করে না, সেই তন্ত্র অচল দো-আনি। অচল দো-আনি দিয়ে জনগণের সেবা করা যায় না। জনগণের সেবা করতে হলে সেই প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ করা দরকার, যা কেন্দ্রের শাসন প্রান্তিকের উৎপাদকের হাতে গিয়ে সম্পদে রূপান্তরিত হতে পারে। আমরা কি সেই রূপান্তরের প্রাথমিক সূচনা দেখতে পাচ্ছি বর্তমান বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক পরিকল্পনা আর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে? পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরই বলা যাবে, প্রশাসনের দায়িত্ব-কর্তব্য জনগণের জন্য নির্মিত হয়েছে। তবে, সবার আগে বাংলাদেশ রচনা করতে হলে আমলাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দেশপ্রেমিক, জনগণমনস্ক হতে হবে। কারণ আমরা চাই, এমন দক্ষ ও মননধর্মী আমলা, যারা রাজনৈতিক সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণ ও তার কুফল দেখাবেন। পাশাপাশি তারা ভালো ও প্রকৃত উপকারী প্রকল্প প্রাক্কলিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করবেন।

ড. মাহবুব হাসান : কবি ও সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম