Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

জলবায়ু কূটনীতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে

Advertisement

Icon

আসিফ রশীদ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জলবায়ু কূটনীতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে

Advertisement

প্রতিবছর যখন জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন-কনফারেন্স অফ দ্য পার্টিজ (কপ) অনুষ্ঠিত হয়, তখন বিশ্বজুড়ে একটি পরিচিত দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, বিজ্ঞানী, পরিবেশকর্মী এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা সেখানে সমবেত হন। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা নিয়ে বক্তৃতা হয়, নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি আসে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা নিয়ে আলোচনা হয়, কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার করা হয়। কিন্তু সম্মেলন শেষ হওয়ার পর একটি প্রশ্ন থেকেই যায়-কপ থেকে বাস্তবে কতটা সুফল মিলল?

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এ প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের দায় তুলনামূলকভাবে নগণ্য হলেও এর অভিঘাত আমাদের ওপর অত্যন্ত বেশি। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, কৃষির ক্ষতি ও জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি-সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য শুধুই পরিবেশগত সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, অভিবাসন এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। বাংলাদেশসহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো এখন পর্যন্ত তাদের প্রকৃত ক্ষতির বিপরীতে কোনো উল্লেখযোগ্য বা সরাসরি ‘জলবায়ু ক্ষতিপূরণ’ পায়নি। জাতিসংঘ ঘোষিত ঐতিহাসিক ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ বা জলবায়ু ক্ষতিপূরণ তহবিলে উন্নত বিশ্ব থেকে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির।

তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে-বছরের পর বছর কপ আয়োজনের সুফল কী? সুফল অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই সুফলকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, বাস্তব পরিবর্তনের মাপকাঠিতে বিচার করতে হবে। কপ-এর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো জলবায়ু পরিবর্তনকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় এজেন্ডায় নিয়ে আসা। কয়েক দশক আগে জলবায়ু পরিবর্তনকে মূলত পরিবেশগত সমস্যা হিসাবে দেখা হতো। এখন এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন, মানবাধিকার, অভিবাসন, স্বাস্থ্য এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ জলবায়ু এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তবে জলবায়ু নিয়ে আলোচনা থেকে যদি বাস্তব অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা নিশ্চিত না হয়, তাহলে কপ ধীরে ধীরে একটি বার্ষিক বক্তৃতা-উৎসবে পরিণত হবে। বিশেষ করে ক্ষতিপূরণের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কোনো দেশ যখন এমন ক্ষতির মুখে পড়ে, যা আর অভিযোজনের মাধ্যমে ঠেকানো সম্ভব নয়, তখন সেই ক্ষতির দায় কে নেবে-এ প্রশ্ন বহু বছর ধরে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক আলোচনায় সামনে এনেছে। বাংলাদেশের নেতৃত্বে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থানও এ আলোচনাকে শক্তিশালী করেছে। কপ২৮-এ ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন।

তবে তহবিল প্রতিষ্ঠা আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়া এক বিষয় নয়। একটি তহবিল তৈরি হলো-তারপর কী? কত অর্থ থাকবে? কারা অর্থ দেবে? অর্থ অনুদান হবে, না ঋণ? অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়া কতটা সহজ হবে? ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো কি নিজেদের অগ্রাধিকার অনুযায়ী অর্থ ব্যবহার করতে পারবে? অর্থ কি নতুন ও অতিরিক্ত হবে, নাকি পুরোনো উন্নয়ন সহায়তাকেই নতুন নামে দেখানো হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ কেবল একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক শব্দবন্ধ হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই জলবায়ু কূটনীতির গুরুত্ব। শুধু কপ-এ গিয়ে বক্তৃতা করলেই হবে না; কপ-এর আগে, কপ চলাকালে এবং কপ-এর পর-তিন পর্যায়েই কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। বাংলাদেশের একার পক্ষে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে দরকষাকষি করা কঠিন। কিন্তু জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি শক্তিশালী জোট তৈরি করা সম্ভব। এক্ষেত্রে ক্লাইমেট ভালনেরাবল ফোরাম, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) গ্রুপ, জি৭৭ এবং অন্যান্য বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত, আমাদের ক্ষতিপূরণ দিন’-এমন সরল দাবি তোলাই জলবায়ু কূটনীতি নয়। এটি একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দরকষাকষির বিষয়। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, উন্নয়নের অধিকার, ঋণের বোঝা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে মানবাধিকার কূটনীতির মাধ্যমে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে ‘Human Rights and Climate Change’ প্রস্তাবের নেতৃত্ব দেয়। প্রস্তাবটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির সঙ্গে মানবাধিকারের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে এবং জলবায়ু অর্থায়নকে আরও সহজলভ্য, পূর্বানুমেয় ও অনুদানভিত্তিক করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকারের প্রশ্নও সেখানে স্থান পেয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু কূটনীতিকে শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসাবে দেখলে চলবে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান-সবাইকে নিয়ে একটি সমন্বিত কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় দিক হলো-যেসব দেশ বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করছে, তাদের আচরণ পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা। এখানে নৈতিক আবেদন যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্বার্থ কাজ করে। তাই জলবায়ু কূটনীতিকেও বাস্তববাদী হতে হবে। যে দেশ বেশি কার্বন নিঃসরণ করে, তার দায় বেশি-এই নীতিকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও শক্তিশালী করতে হবে। একইসঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনীতিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তব সমস্যাগুলো সামনে আনতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উন্নত দেশগুলোর মতো একই গতিতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে বলা সহজ; কিন্তু তাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রযুক্তি না দিলে সেই প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

এখানেই জলবায়ু ন্যায়বিচারের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের দাবি হওয়া উচিত-আমরা উন্নয়নের সুযোগ বন্ধ করতে চাই না; আমরা চাই উন্নয়ন যেন পরিবেশবান্ধব পথে হয়। আমাদের অভিযোজনের জন্য অর্থ চাই, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযুক্তি চাই, জলবায়ু-সহনশীল কৃষির প্রযুক্তি চাই, সমুদ্র ও নদীভাঙন মোকাবিলায় জ্ঞান ও বিনিয়োগ চাই। একইসঙ্গে যারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হবে, তাদের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও নিরাপদ অভিবাসনের ব্যবস্থাও চাই।

কারণ জলবায়ু পরিবর্তন আগামী দিনের অভিবাসনকে আরও তীব্র করতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে মানুষ যদি লবণাক্ততা, নদীভাঙন বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার কারণে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়, সেটিকে শুধু ‘অভ্যন্তরীণ অভিবাসন’ হিসাবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত মাত্রা বোঝা যাবে না। এটি মানবিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলবায়ু অর্থায়নের ধরন। জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশকে যদি ঋণ দিয়ে বলা হয়, ‘জলবায়ু মোকাবিলা করো’, তাহলে সেটি হবে এক ধরনের পরিহাস। কারণ অনেক উন্নয়নশীল দেশ ইতোমধ্যেই ঋণের চাপে রয়েছে। জলবায়ু দুর্যোগের পর আবার ঋণ নিয়ে পুনর্গঠন করতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই অনুদান, স্বল্পসুদের অর্থায়ন, দুর্যোগ-পরবর্তী ঋণ স্থগিতের ব্যবস্থা এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত ঋণ পুনর্গঠনের বিষয়গুলোকে জলবায়ু কূটনীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। বাংলাদেশ নিজেও আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো সংস্কার ও ঋণ-সহনশীলতার বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেছে।

তবে শুধু অন্যদের দিকে আঙুল তুললেই হবে না। বাংলাদেশের নিজের অবস্থানও হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য। জলবায়ু কূটনীতিতে নেতৃত্ব দিতে হলে দেশের অভ্যন্তরেও পরিবেশ রক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণ, বনায়ন এবং টেকসই নগরায়ণে দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটাতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের বক্তব্যের নৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি বাড়বে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কপকে একটি ‘ইভেন্ট’ নয়, একটি ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া হিসাবে দেখতে হবে। বছরজুড়ে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনায় নিজেদের দাবিগুলোর পক্ষে সোচ্চার হতে হবে। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে আলাদা আলাদা কূটনৈতিক সমঝোতা, আঞ্চলিক জোট, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনকে একই কৌশলের আওতায় আনতে হবে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত তিনটি-প্রথমত, নিঃসরণ কমাতে বড় দূষণকারী রাষ্ট্রগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি; দ্বিতীয়ত, অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য বাস্তব, সহজলভ্য ও অনুদানভিত্তিক অর্থ নিশ্চিত করা; তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকারকে আন্তর্জাতিক আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা।

কপ সম্মেলন সফল বলে বিবেচিত হবে তখনই, যখন তার সিদ্ধান্ত সম্মেলনকক্ষ থেকে বেরিয়ে মানুষের জীবনে পৌঁছাবে। একটি জলবায়ু সম্মেলনের সাফল্য কতজন নেতা বক্তৃতা দিলেন, কতটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ হলো কিংবা কতটি ছবি তোলা হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বিচার করতে হবে কত টন কার্বন নিঃসরণ কমল, কত অর্থ সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত দেশের কাছে গেল, কত মানুষ নিরাপদ হলো এবং কতটা প্রযুক্তি ও জ্ঞান ভাগাভাগি হলো-এসব দিয়ে।

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য তাই জলবায়ু কূটনীতি জাতীয় স্বার্থরক্ষার একটি হাতিয়ার। তাই পররাষ্ট্রনীতিতে জলবায়ুকে প্রান্তিক বিষয় হিসাবে রাখার সুযোগ নেই।

আসিফ রশীদ : উপসম্পাদক, যুগান্তর

[email protected]

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম