Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অন্যমত

শিল্প খাতকে মাইনাসে রাখা যাবে না

Advertisement

Icon

আবু আহমেদ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শিল্প খাতকে মাইনাসে রাখা যাবে না

Advertisement

ওসমানী গ্লাস শিট শিল্পটি এক সময় যথেষ্ট নামকরা ছিল, এখন আর নেই। ছাতক সিমেন্ট শিল্পটিও বেশ নাম কামিয়েছিল। এসবই কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে। এ শিল্পগুলো পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ-উত্তরকালে এসব শিল্পকারখানা আমরা যেন হারিয়ে ফেলেছি। পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ ২৩ বছরের যা কিছু অর্জন, তার বেশির ভাগই ছিল শিল্প খাতে। এ খাতকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি। বিসর্জন দিয়ে দিয়েছি। এরপর আশির দশকের শেষদিক থেকে একটা পরিবর্তন আমরা লক্ষ করি। কিন্তু সে সময় দেশে বড় কোনো ইন্ডাস্ট্রির বিকাশ ঘটেনি। স্টিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে, গাড়ির সংযোজন বা তৈরির ক্ষেত্রে, কিংবা হাই ভ্যালু অ্যাড করে সেসব ক্ষেত্রে এবং আইটির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো অর্জন আমাদের নেই।

১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড স্থাপন করে। এ শিল্পের মাধ্যমে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলকে পরিশোধন করা হতো। এর উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ১৫ লাখ টন। অর্থাৎ ১৫ লাখ টন পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট পরিশোধন করা হতো। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের জন্য এ উৎপাদনই যথেষ্ট ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আজ পর্যন্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের মতো আরেকটি বড়সড় পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি শিল্প আমরা তৈরি করতে পারিনি। এটা অবশ্যই আমাদের জন্য লজ্জার কথা। এখন আমাদের পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টের অধিকাংশই বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদেশ থেকে পরিশোধন করে আনতে হয়। ফলে আমাদের সঞ্চিত অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

আসলে আমরা হচ্ছি একটা দুর্ভাগা জাতি। কেননা আমাদের যেখানে যেটা করা দরকার ছিল, আমরা সেটা করতে পারিনি। ফলে আমাদের এ দুর্গতি। যদি সময়মতো সঠিক পদক্ষেপগুলো আমরা নিতে পারতাম, তাহলে হয়তো আমাদের আজকের এ পরিণতি হতো না। শেখ হাসিনার শেষের ৪-৫ বছর থেকেই অর্থনীতিতে অধোগতি শুরু হয়েছে। বিষয়টি প্রতিফলিত হচ্ছিল বিভিন্ন সূচকের মাধ্যমে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার নিম্নমুখী হচ্ছিল, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমে যাচ্ছিল। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ট্রেড ব্যালেন্স, আমদানি-রপ্তানি আমাদের অর্থনীতির বিরুদ্ধে যাচ্ছিল। ডলারের বিপরীতে মুদ্রার মান কমে গিয়ে দেশ একটা চাপের মধ্যে ছিল। আমাদের বৈদেশিক ধারদেনা বাড়ছিল। ফলে একটা পর্যায়ে এসে আমাদের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ১৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এলো। দেশের এ পরিস্থিতির কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো আমাদের এলসি দিচ্ছিল না। এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য একটা লজ্জার কথা। এ অবস্থায় ইন্টারন্যাশনাল রেটিং এজেন্সি মুডিস আমাদের ‘বি’ গ্রেড বা তারও নিচে নামিয়ে দিল। ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলো আমাদের এলসি গ্রহণ করছিল না। তারা ক্যাশ পেমেন্ট চাচ্ছিল।

দেশের এমন অবস্থায় ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসাবে ক্ষমতায় আসেন। তিনি একটা ভাঙাচোরা, অর্ধ বা আংশিক ফাংশন করা অর্থনীতি পেলেন। এমন অর্থনীতিকে টেনে তোলা দুঃসাধ্য ব্যাপার বটে। তবে অর্থনীতির অধোগতিটি তার সময় রোধ করা গেছে। মানে আমাদের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছিল, ডলার বাজারভিত্তিক করা হচ্ছিল এবং বিনিময় হার যতটা সম্ভব এক জায়গাতেই ছিল। কিন্তু ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দেশের বিনিয়োগে যে অধোগতি শুরু হয়েছিল, সেটা আর উপরের দিকে যায়নি। বরং আরও একটু কমে গিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গভর্নর এলেন, নতুন অর্থ উপদেষ্টা এলেন। অর্থনীতিতে ইনটারিম ম্যানেজমেন্টের আগমন হলো। নতুন উদ্যমে তারা কাজ করতে শুরু করলেন। অর্থাৎ অর্থনীতিকে অধোগতি থেকে রক্ষা করাই হয়তো মিশন ছিল তাদের। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু মূল্যস্ফীতি রোধ করার নামে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি কতটা অগ্রসরমান ছিল, সে বিষয়টি প্রশ্ন আকারে দেখা দেয়। কারণ সুদের হার বাড়ানোর কারণে প্রাইভেট সেক্টরের ক্রেডিট ডিমান্ড আরও কমে গেল। সবকিছু মিলিয়ে বিদেশে আমাদের পণ্যের চাহিদা কমে গেল। অর্থাৎ বিদেশিরা বিশ্বাস করছিল না, বাংলাদেশ থেকে তারা যেসব পণ্য কেনে, সেগুলো বাংলাদেশ এখনো সরবরাহ করতে পারবে। একটা আস্থাহীনতার দিকে আমরা ধাবিত হচ্ছিলাম। এর কারণ ছিল, হাসিনা সরকার দেশের পরিসংখ্যান নিয়ে খেলায় মেতেছিল। মানে তারা পরিসংখ্যানের মধ্যে অনেক ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছিল। শেখ হাসিনার সময়ে তারা যতটা অর্জন করেনি, সেটা তার থেকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেখিয়েছিল। জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার বলি, বিনিয়োগ বলি, মূল্যস্ফীতির সূচক বলি-সব ক্ষেত্রেই তারা একটু ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছে। এজন্য বাংলাদেশের পরিসংখ্যানগত পরিমাপগুলো অনেকে বিশ্বাস করতে চাইত না। যা হোক, এখন এগুলোকে সংশোধনের চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে ধীরে।

গত ৪-৫ বছরের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, আমাদের দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। এটা এক সময় ২২ শতাংশ ছিল, এখন হয়তো ৩২ শতাংশের কাছাকাছি। এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয় বর্তমানে সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে, সেটা হচ্ছে, আমাদের বিশাল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রার দায় বা বৈদেশিক ঋণ। আমাদের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ১১০ বিলিয়ন ডলারে। বৈদেশিক ঋণের পাশাপাশি সরকারের অভ্যন্তরীণ দায়ও অনেক। ঘাটতি বাজেট তো আমরা বছরের পর বছর ধরে করেই যাচ্ছি। গত ১০ বছর ধরে দেখছি, ঘাটতি বাজেট আমাদের দেশে একটা অপরিহার্য কমপোনেন্ট হয়ে গেছে। আমাদের বাজেটারি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ঘাটতি বাজেটের আশ্রয় নেওয়া, এটা এখন ট্রাডিশন। গত ২ বছরে এটা আরও বেড়ছে, এ বছরেও বেড়েছে। ঘাটতি বাজেট বাড়ার ফলে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের দায় বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ এখন হয়ে গেছে এক নম্বর দায়। এসব অতীতের ঋণের টাকা। এগুলো ফুলেফেঁপে পুরো দেশকে এখন আঁকড়ে ধরছে।

দেশে বেকার সমস্যা বাড়ছে। যেহেতু অর্থনীতিতে নতুন করে বিনিয়োগের আভাস পাওয়া যাচ্ছে না, সেহেতু দেশের কলকারখানাগুলোতে গতি আসছে না। বিনিয়োগ স্থবিরতার ফলে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে বেকার সমস্যাও হু হু করে বাড়ছে। নতুন উদ্যোগ না থাকায় নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিও হচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে বেকার সমস্যা প্রকট আকারে দেখা দেবে। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে আমি যেটা অতীতেও বলেছি, এখনো বলব, সরকারের নীতিনির্ধারকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রেই হোক বা ট্যাক্স রেট রেশনালাইজড করার ক্ষেত্রেই হোক, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সূচকের সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য করের হার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও কমাতে হবে। আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরকে শতভাগ কার্যকর করতে হবে। বড় বড় প্রকল্পে অর্থায়ন থেকে দূরে সরে গেলে চলবে না। পিপিপি আকারে হোক অথবা বিদেশি পার্টনার নিয়ে হোক বা মাল্টি পার্টনার নিয়ে হোক, বড় প্রকল্পগুলো আমাদের এগিয়ে নিতে হবে। যেহেতু এখন প্রাইভেট সেক্টর এগিয়ে আসছে না, ফলে এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব বড় বড় শিল্পকারখানা বিভিন্ন গ্রুপের হাতে ছিল বা আছে, সেগুলোকে সচল রাখতে হবে। বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না। ফুড আইটেম বলি বা অন্য ছোটখাটো রিফাইন্ড জিনিস বলি, টেক্সটাইল মিল বলি, যাই হোক না কেন, এগুলোকে চালু রাখতে হবে। তা না হলে অর্থনীতির স্থবিরতা আরও বাড়বে। অনেক শিল্প গ্রুপে হয়তো দুর্নীতি হয়েছে, ঋণখেলাপি হয়েছে; তবে এসব কারণে তাদের শিল্পকারখানা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হবে না। তাদের শিল্পকারখানাগুলো যদি বন্ধ থাকে, তাহলে একদিকে যেমন বেকারত্ব সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে ব্যাংকের কোনো পাওনাই তারা শোধ করবে না। পরিশোধ করতে পারবে না। সবকিছু মিলিয়ে আমি মনে করি, ওদের শিল্পকারখানাগুলো যাতে চালু থাকে, সে ব্যবস্থাটা সরকারকে করতে হবে। কারণ যে কেউ ইচ্ছা করলেই বড় একটা টেক্সটাইল মিল তৈরি করতে পারবে না। আমাদের চোখে দেশে ১০-১২টি গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে, মানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাউজেস রয়েছে। এগুলো থেকে রাতারাতি ভালো কোনো ফল পাওয়া না গেলেও বছরজুড়ে কোনো কোনো সময়ে এরা সফলতার মুখ দেখবে। অর্থনীতি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বলতে চাই, এগুলোকে যদি আমরা মাইনাসে রাখি, তাহলে আমাদের অর্থনীতির ক্ষতি হবে। ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে এবং হচ্ছে। আমরা আর অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকে অগ্রসর হতে চাই না।

অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম