Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নিউইয়র্কের চিঠি

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও সেপ্টেম্বরের ব্যস্ততা

Advertisement

Icon

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও সেপ্টেম্বরের ব্যস্ততা

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন উপলক্ষ্যে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাস নিউইয়র্ক সিটি বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে বেশি কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র্রে পরিণত হয় এ মহানগরী। এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। ১৯৩ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেবেন বিশ্বের ১৫০ জন রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে বড় আকারের সরকারি প্রতিনিধিদল ছাড়াও আসবেন বেসরকারি খাতের বহুসংখ্যক প্রতিনিধি। সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে নিউইয়র্কের ছোট-বড় হোটেলগুলো কানায় কানায় পরিপূর্ণ থাকে। নিরাপত্তার কঠিন চাদরে মুড়িয়ে ফেলা হয় ম্যানহাটানে ইস্ট রিভারের কোলঘেঁষে অবস্থিত জাতিসংঘ সদরদপ্তর ও আশপাশের কয়েকটি এভিনিউ, বিশেষ করে যেসব এলাকার বহু তারকাবিশিষ্ট হোটেলগুলোতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানরা ওঠেন। নিউইয়র্কপ্রবাসী বিশ্বের প্রতিটি দেশের নাগরিকরা এ সময়ে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন তাদের নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের দেশের প্রতিনিধি দলের সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনে। সমগ্র নিউইয়র্ক এ সময় অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি সরগরম থাকে।

গত ৮ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। তবে উচ্চপর্যায়ের বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বাংলাদেশের জন্য এবারের অধিবেশন দুটি কারণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এবারের সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সাধারণ পরিষদে তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সভাপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। ঠিক ৪০ বছর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের ওই সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসাবে খলিলুর রহমান ইতোমধ্যে প্রথামাফিক শপথ গ্রহণ করেছেন। দ্বিতীয়ত, দুই দশক পর বিএনপি বাংলাদেশে সরকার গঠনের পর সরকারপ্রধান হিসাবে ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নিউইয়র্কে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি নয়দিন অবস্থান করবেন বলে জানা গেছে এবং ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে তার ভাষণ দেবেন। রীতিমাফিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘ অধিবেশনে আগত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের জন্য নিউইয়র্কে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। এবারও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র সফররত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে এক সংবর্ধনার আয়োজন করেছেন। সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদে তার ভাষণে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি, গণতান্ত্রিক নবায়ন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্পর্ক জোরদার করার ওপর আলোকপাত করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এবারের সাধারণ অধিবেশনের প্রধান প্রতিপাদ্যগুলো-বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে পৌঁছার প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠার সমন্বিত প্রচেষ্টা, রাষ্ট্রক্ষমতায় লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে পুরুষ ও নারী প্রতিনিধিত্বের ব্যবধান কমিয়ে আনা এবং বিশ্বে ঐতিহাসিকসংখ্যক সশস্ত্র সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমস্যা সমাধানের পথ অনুসন্ধান করতে অন্যান্য রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের প্রচেষ্টার প্রতিধ্বনিও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে উচ্চারিত হবে। নিউইয়র্কে অবস্থানকালে তিনি বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া ছাড়াও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হবেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশি জনগণ দেশে ও প্রবাসে সমান রাজনৈতিক সচেতন। অন্য কোনো দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড ভিন্ন দেশের মাটিতে পরিচালিত হয়, এমন কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ না থাকলেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের রাজনীতি নিয়ে বিদেশেও সক্রিয়। বাংলাদেশের নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী বিদেশে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শাখা থাকার ওপর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় প্রতিটি বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলের শাখা রয়েছে, শাখাগুলোর কমিটি কেন্দ্র কর্তৃক অনুমোদিত। যদিও দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিএনপি শাখার কেন্দ্র অনুমোদিত কোনো কমিটি নেই, তবুও দলটির নেতাকর্মীরা দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। দেশ থেকে দলের নেতারা যুক্তরাষ্ট্র সফরে এলে স্থানীয় নেতারাই তাদের দেখভাল করেন, দলীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। আওয়ামী লীগ হোক, বিএনপি হোক, উভয় দলের ক্ষেত্রে এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। যখন যে দলের সরকার ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের সরকারপ্রধান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে যোগ দিতে এলে প্রবাসী নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসাহের জোয়ার বয়ে যায়। নিজেদের কর্মব্যস্ততা ফেলে তারা যুক্তরাষ্ট্র সফররত প্রধানমন্ত্রী ও সফরসঙ্গীদের নিয়ে মেতে থাকেন এবং নানা ধরনের ব্যয়বহুল ও জাঁকজমকপূর্ণ কর্মসূচি আয়োজন করেন, তাদের মূল্যবান উপহারসামগ্রী প্রদান করেন এবং দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেখান। এসব ছাড়াও বিশেষ করে সরকারপ্রধানকে নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করাও একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মা বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নিউইয়র্কে সংবর্ধিত হওয়ার দীর্ঘ ২১ বছর পর সম্মানিত হবেন। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য এটি যথার্থই আনন্দ-উচ্ছ্বাসের উপলক্ষ্য। ২৫ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জাঁকজমকপূর্ণ নাগরিক সংবর্ধনা প্রদানের জন্য জোর প্রস্তুতি চলছে। যদিও এ ধরনের সংবর্ধনার ব্যয় দলীয় পর্যায়েই সংস্থান করা হয়, কিন্তু গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করলে সরকারি ব্যয়ে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের তত্ত্বাবধানে এক অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সংবর্ধনায় সাতশ’র বেশি বিশিষ্ট প্রবাসী বাংলাদেশিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এজন্য সরকারের ব্যয় হয়েছিল ২ লাখ ৪৩ হাজার ডলার। এর ধারাবাহিকতায় নিউইয়র্ক কনস্যুলেট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংবর্ধনায় এবার এক হাজার প্রবাসীর অংশগ্রহণের পরিকল্পনা করে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি) একটি বাজেট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠালে প্রধানমন্ত্রী সরকারি ব্যয়ে তার সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন না করার পক্ষে মতামত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে দিয়েছেন। তাতে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি হতাশ না হয়ে নিজেদের উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনার আয়োজন করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিএনপি নেতারা প্রধানমন্ত্রী ও দলীয়প্রধানকে সংবর্ধনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ম্যানহাটান ম্যারিয়ট মার্কেস হোটেলে বুকিং দিয়েছেন বলে জানা গেছে। সংবর্ধনার পুরো ব্যয়ভার তারাই বহন করতে আগ্রহী।

কিন্তু ইতঃপূর্বে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেকর্ডসংখ্যক ১৭ বার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। অতীতে বাংলাদেশের আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান প্রতিবছর সাধারণ পরিষদে আসেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। খালেদা জিয়া দুই মেয়াদে ১০ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কয়েকবার মাত্র সাধারণ পরিষদে এসে ভাষণ দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী সেপ্টেম্বরের অধিবেশন উপলক্ষ্যে প্রতিবারই রাষ্ট্রীয় খরচে দু’শতাধিক সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধি নিয়ে এ সফরকে পরিণত করেছিলেন অনেকটা প্রমোদ ভ্রমণে। শেখ হাসিনা নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটানে যে হোটেলগুলোতে অবস্থান করতেন, সেই হোটেলগুলোর লবি পরিণত হতো আওয়ামী লীগের হাটে। প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হোটেলে ভিড় জমাতেন বিভিন্ন স্বার্থশিকারি ও তদবিরবাজরা। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ প্রতিবছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানে নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করত, দর্শক সারিতে বিশিষ্ট প্রবাসীদের পরিবর্তে দেখা যেত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মুখ। নিউইয়র্কে সংবর্ধনা গ্রহণের বিষয়টি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক ধরনের বাতিকে পরিণত হয়েছিল। তারেক রহমান তার প্রথম জাতিসংঘ সফরে লক্ষণীয় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। জানা গেছে, তার সফরসঙ্গী হবেন সীমিতসংখ্যক ব্যক্তি। নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ মাত্র ৪০ জন। এ পরিমিতি বোধ রাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয়ে ভবিষ্যতের জন্য অনুকরণীয় হোক।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম