Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সুবিধা ও ঝুঁকি

Advertisement

Icon

মহিউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সুবিধা ও ঝুঁকি

Advertisement

২০২৬ সালের ৭ আগস্ট। তারিখটি হয়তো ক্যালেন্ডারের পাতায় সাধারণ একটি সংখ্যা, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির মানচিত্রে এটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সেদিন মক্কার পবিত্র ভূমিতে মিলিত হয়েছিলেন তিন রাষ্ট্রপ্রধান-সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তারা স্বাক্ষর করেন মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি-এমন চুক্তি, যা তিন রাষ্ট্রকে একত্রে বেঁধে দিয়েছে নিরাপত্তার অভিন্ন শপথে : এক রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ মানেই তিন রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ। এ বাক্যটি শুধু কূটনৈতিক ঘোষণা নয়। এটি হলো তিন রাষ্ট্রের ভাগ্যকে একসূত্রে বাঁধা এক নতুন প্রতিশ্রুতি।

২০২৬ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের আগুনে যখন মধ্যপ্রাচ্য দগ্ধ, তখন সৌদি আরবের আকাশে উড়ে আসছিল ইরানি ড্রোন। তেল স্থাপনাগুলো ছিল ঝুঁকির মুখে, হরমুজ প্রণালি হয়ে উঠেছিল যুদ্ধের জলপথ। তুরস্ক ও পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধের আগুনে না পড়লেও তারা বুঝতে পারছিল-অস্থিতিশীলতা একদিন তাদের দরজায়ও কড়া নাড়তে পারে। এই ভয়, এই অনিশ্চয়তা, এই অস্থিরতার মধ্যেই জন্ম নিয়েছে এক নতুন নিরাপত্তা স্থাপত্য-মক্কা চুক্তি, যা তিন রাষ্ট্রকে একত্রে দাঁড় করিয়েছে এক অভিন্ন প্রতিরক্ষা নীতিতে। যুদ্ধের আগুনের মাঝেই নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়-এটাই ইতিহাসের নিয়ম।

মক্কার আল-সাফা প্রাসাদের প্রতিটি দেওয়াল যেন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। সেদিন সেখানে আলোচনার টেবিলে বসেছিলেন তিন রাষ্ট্রপ্রধান। সৌদি আরব-মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক হৃদয়, ইসলামের দুই পবিত্র নগরের অভিভাবক। তুরস্ক-ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী, এক দ্রুতবর্ধনশীল প্রতিরক্ষা শিল্পের অধিকারী। পাকিস্তান-মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র। চুক্তির ভাষা ছিল দৃঢ়, স্পষ্ট, অটল-যে কোনো এক রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ মানেই তিন রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ।

এটি ন্যাটোর ধারা-৫-এর মতোই একটি সম্মিলিত নিরাপত্তা নীতি। চুক্তির মূল শর্ত হলো এক রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে তিন রাষ্ট্রই আক্রান্ত বলে গণ্য হবে। এটি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোট। তিনটি দেশই বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। সৌদি আরবের আছে অঢেল টাকা, যা প্রতিরক্ষা প্রকল্পের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। তুরস্কের আছে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি-ড্রোন, রাডার, যুদ্ধজাহাজ। পাকিস্তানের আছে সামরিক জনবল ও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। এ চুক্তির আওতায় দেশ তিনটি যা যা করবে, তার মধ্যে আছে : গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা সমন্বয়।

মনে হতে পারে, মক্কার পবিত্রতার সঙ্গে এ জোটের প্রতীকী সম্পর্ক আছে। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলো মক্কায়, জুমার দিনে। এটি একটি কূটনৈতিক মাইলফলক। একইসঙ্গে জানান দেয় যে, এটি সংহতির একটি প্রতীকী ঘোষণা।

তিনটি দেশেরই আছে নিজ নিজ গল্প-যা চুক্তিকে আরও অর্থবহ করে। ইরানি হামলার পর সৌদি আরব বুঝেছিল-একক প্রতিরক্ষা আর যথেষ্ট নয়। তাদের দরকার প্রযুক্তি, সামরিক জনবল এবং আঞ্চলিক মিত্রতা। তুরস্ক চায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন প্রভাববলয়। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সামরিক সহযোগী। ২০২৬ সালে তারা কয়েক হাজার সৈন্য, ড্রোন ও বিমান সৌদি আরবে মোতায়েন করে। এ তিন রাষ্ট্রের অভিন্ন স্বার্থই চুক্তিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। ফলে তৈরি হয়েছে ভূরাজনীতির নতুন মানচিত্র। বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অঞ্চলের নিরাপত্তা স্থাপত্যকে পুনর্গঠন করবে।

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের ঢেউ দেখা। চুক্তিবদ্ধ দেশ তিনটি চাইলে তাদের পরিধি বাড়াতে পারে এবং বাংলাদেশকে চুক্তিবদ্ধ করে নিতে পারে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশকে ওই তিনটি দেশ ভূরাজনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

বাংলাদেশের ভূরাজনীতি এক অদ্ভুত দ্বৈততায় গড়া। এটি বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। অন্যদিকে, এটি একটি বড় ও প্রতাপশালী দেশের প্রতিবেশী। টিকে থাকার ও এগিয়ে যাওয়ার স্বার্থে এ দেশের দরকার সবার সহানুভূতি ও সমর্থন। বাংলাদেশের কূটনীতি সবসময়ই ছিল সামঞ্জস্যের শিল্প-ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব-সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে এগিয়ে চলা। মক্কা চুক্তি সেই সামঞ্জস্যের ওপর নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। মক্কা চুক্তি যদি ইসলামি সংহতির প্রতীকী জোট হিসাবে দেখা হয়, তাহলে বাংলাদেশ তাতে যোগ দিলে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যে তার অবস্থান আরও দৃঢ় করবে, আন্তর্জাতিক ইসলামিক ফোরামে তার কণ্ঠ আরও শক্তিশালী হবে, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি সৌদি আরবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রেমিট্যান্সের একটা বড় অংশ আসে সৌদি আরব থেকে। সৌদি আরবে যত বিদেশি কাজ করে, বাংলাদেশিদের অবস্থান তাদের শীর্ষে। মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে এ সম্পর্ক আরও কৌশলগত রূপ পেতে পারে। তুরস্ক ও পাকিস্তান-দুই দেশই বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগী। তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি, পাকিস্তানের সামরিক প্রশিক্ষণ-বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এগুলো ব্যবহার করছে। জোটে যোগ দিলে যৌথ মহড়া, প্রযুক্তি বিনিময়, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা-এসব আরও বাড়তে পারে।

বঙ্গোপসাগর এখন ভূরাজনীতির নতুন কেন্দ্র। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-সবাই এখানে সক্রিয়। বাংলাদেশ যদি একটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা জোটে থাকে, তবে তার সামুদ্রিক নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

তবে এর উলটো দিকও আছে। বিভিন্ন বিশ্লেষক ও নাগরিকের আলোচনায় সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো উল্লেখিত হচ্ছে। তার একটি হলো, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ভারত। ভারত সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান জোটকে কীভাবে দেখবে-এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশ যদি এ জোটে যোগ দেয়, তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশের কূটনীতি সবসময়ই ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে। একটি সামরিক জোট সেই ভারসাম্যকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।

চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী। বন্দর, সেতু, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো-সবখানেই চীনের উপস্থিতি। মক্কা চুক্তি যদি যুক্তরাষ্ট্র বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো ব্লকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে, তবে চীন তা ভিন্নভাবে দেখতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি চীনের বিনিয়োগের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। এ সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

মক্কা চুক্তির মূল শর্ত-এক রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ মানেই তিন রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ। বাংলাদেশ যোগ দিলে তাকে এ দায়বদ্ধতা বহন করতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’-এ নীতি একটি সামরিক জোটের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীল। ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত, সিরিয়া-ইয়েমেন যুদ্ধ-সব মিলিয়ে অঞ্চলটি জটিল। বাংলাদেশ যদি মক্কা জোটে যোগ দেয়, তবে তাকে এ সংঘাতগুলোর রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হতে পারে।

কোনো দেশের প্রতি অনুরাগ আর কোনো দেশের প্রতি বিদ্বেষের মানসিকতা দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি সাজানো ঠিক হবে না। বাংলাদেশকে সবার আগে দেখতে হবে তার জাতীয় স্বার্থ, তার নাগরিকদের নিরাপত্তা। বাংলাদেশ যেমন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না, তেমনি আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নেতা হওয়ার সামর্থ্য এ দেশ অর্জন করেনি। প্রকৃতপক্ষে আমরা গত সাড়ে পাঁচ দশক ধরে নিজেদের দেশটাকেই ভালোভাবে সামাল দিতে পারিনি। তাই আমাদের পা ফেলতে হবে খুব সাবধানে। এখানে অ্যাডভেঞ্চারের কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত যা-ই হোক-তা হবে ইতিহাসের অংশ, ভূরাজনীতির মানচিত্রে একটি নতুন রেখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আলোচনার বিষয়। মক্কার আকাশে যে আলো জ্বলে উঠেছে, বাংলাদেশ সেই আলোকে দূর থেকে দেখছে। কিন্তু সে আলোয় পা রাখবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম