Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

আবার খুলতে হবে দখিনা দুয়ার

Advertisement

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আবার খুলতে হবে দখিনা দুয়ার

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

জাহাজের পর জাহাজ আসছে। পণ্য ভর্তি করছে, চলে যাচ্ছে। সাধারণত জাহাজগুলো নিয়ে আসে রুপা। এই রুপা দিয়ে তৈরি হয় রৌপ্যমুদ্রা। এই মুদ্রা বিনিয়োগ হচ্ছে কৃষি খামারে, গড়ে উঠছে নতুন নতুন জনপদ। রিচার্ড এম. ইটন তার ‘দি রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার’ গ্রন্থে এমনভাবেই মধ্যকালীন বাংলার অবস্থা বর্ণনা করেছিলেন। রিচার্ড এম. ইটনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত বা দ্বিমত থাকতেই পারে। তবে মধ্যকালীন বাংলার যে সমৃদ্ধি ছিল, তাতে বঙ্গোপসাগরের বিপুল ভূমিকা ছিল। সওদাগরদের সাগরপথের বাণিজ্য যেদিন থেকে হাতছাড়া হয়ে গেল, বাংলার দুর্দশা তখন থেকেই শুরু। গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরুর দেশটি নামতে নামতে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হলো।

একইভাবে এই যে পাশ্চাত্য আজ আর্থিকভাবে এত সমৃদ্ধ, তার নেপথ্যে সাগরে তাদের আধিপত্য। আগের সব সাম্রাজ্য ছিল স্থলভিত্তিক। ষোড়শ শতক থেকে ইউরোপিয়ানরা সাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা শুরু করলে পরিস্থিতি পালটে যেতে থাকে। বর্তমানে সাগরের নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু রাজনৈতিক আধিপত্যই নয়, একইসঙ্গে বাণিজ্য, মৎস্য, খণিজসম্পদেরও। এর রেশ ধরে সহজভাবে বলা যায়, বাংলাদেশকে যদি এগিয়ে যেতে হয়, তবে দখিনের দরজা খুলতে হবে এবং ভালোভাবেই। বাংলাদেশ সাড়ে তিন দিক একটি দেশ দিয়ে ঘেরা। শুধু একটি দিকই খোলা আছে। সেখান দিয়েই দখিনা বাতাস আমাদের গ্রহণ করতে হবে।

ইতিহাস সাগরপথে আমাদের সমৃদ্ধির কথা বলে। ১৪১৫ সালের মতো সময়কালেও আমরা দেখি, চীনা বাণিজ্য মিশনগুলো বদ্বীপটিতে সাটিন, সিল্ক ও পোরসিলিন ছাড়াও স্বর্ণ ও রুপা নিয়ে আসছে। এক দশক পর আরেক চীনা পর্যটক উল্লেখ করেছেন, বাংলার দূরপাল্লার সওদাগরেরা তংকার মাধ্যমে লেনদেন করছেন। পরবর্তী শতকেও এ ধরনটি বহাল ছিল। ১৫৬৯ সালে ভেনেশীয় পর্যটক সিজার ফেডেরিসি লিখেছেন, ‘রৌপ্য ও স্বর্ণ তারা পেগু [বার্মা] থেকে বাংলায় আনতেন, অন্য কোনো বাণিজ্য চলত না।’ বাংলার অর্থনীতি মুদ্রায়ন ও ভারত মহাসাগরীয় বাজারের সঙ্গে একীভূত হওয়ায় অঞ্চলটির রপ্তানিমুখী শিল্প খাতটি ব্যাপকভাবে বেগবান হয়। দশম শতকে মুসলিম অগ্রাভিযানের শুরুতেই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর মধ্যে বস্ত্র খাতটি প্রসিদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তবে মুসলিম বিজয়ের পর বস্ত্রসামগ্রীর উৎপাদনে ব্যাপকতা ও বৈচিত্র্য নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগে মার্কো পলো বাংলার সুতার বাণিজ্যিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন, ১৩৪৫ সালে ইবনে বতুতা এখানকার সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্রের প্রশংসা করেন। ১৪১৫ থেকে ১৪৩২ সাল পর্যন্ত চীনা কূটনীতিকরা বাংলার সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্র (মসলিন), গালিচা, বিভিন্ন বর্ণের নেকাব, মিহি পর্দা (ফারসি, শানা-বাফ), পাগড়ির সামগ্রী, নকশা করা সিল্ক ও বুটিদার টাফেটা (পাতলা, চকচকে কাপড়বিশেষ) উৎপাদনের কথা লিখেছেন। একশ বছর পর, ১৫০৩ থেকে ১৫০৮ সাল পর্যন্ত গৌড়ে অবস্থানকারী লদোভিকো ডি ভার্থেমা লিখেছেন, এখানে প্রতিবছর ৫০টি জাহাজে সুতি ও সিল্কসামগ্রী বোঝাই করা হয়।... এসব সামগ্রী তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান, আরব উপদ্বীপ, ইথিওপিয়া ও সমগ্র ভারতে চালান দেওয়া হয়। কয়েক বছর পর টম পিরেস ভারত মহাসাগরের পূর্বপারের বন্দরগুলোতে বাংলার বস্ত্রসামগ্রীর রপ্তানির কথা উল্লেখ করেছেন। স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে, বাংলা এশিয়ার বাণিজ্য ও উৎপাদনের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

এ সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ কখন হাতছাড়া হয়েছিল? সাগরে ইউরোপিয়ান আধিপত্যের সূচনা থেকে। মগ-ফিরিঙ্গিদের অত্যাচারের কথা কি ভোলা যায়? বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর বাংলার স্বাধীন সালতানাত আমলের পতন ঘটে প্রথমে। এ পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় সুলতানরা বাইরের জগৎ হতে সহযোগিতা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে থাকেন। তখন আসে মোগল যুগ। মোগলরা মগ-ফিরিঙ্গিদের দমন করে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছিল। তবে সাগর তখন ইউরোপিয়ানদের হাতেই। আর ১৭৫৭ সালে পলাশীর পর চট্টগ্রাম বা চাটগাঁ বন্ধ হয়ে যায়। কলকাতার যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশের বিপর্যয় পুরোদমে শুরু হয়।

আমাদের ‘সমুদ্রসীমা জয়ের’ এক দশকের বেশি সময় পার হয়েছে। এ জয়কে যেভাবে প্রচার করা হয়েছিল, তা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি। বাংলাদেশের পানিসীমা এখন প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। এটি বাংলাদেশের জন্য এক অপার সম্ভাবনার ভান্ডার। এর নিচে লুকিয়ে থাকা গ্যাস, তেল, খনিজসম্পদ এবং উপরিভাগের মৎস্যভান্ডার দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার শক্তি রাখে। তবে শুধু অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেই সম্পদ আহরণ করা যায় না; প্রয়োজন সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সুদূরপ্রসারী ভূ-কৌশলগত পরিকল্পনা। এসবের অভাবে গভীর মাছধরা কমে গেছে, অফশোর ব্লকগুলোতে পূর্ণাঙ্গ সাইসমিক জরিপ ও তেল-গ্যাস অনুসন্ধান হতে পারেনি। একইভাবে বিমসটেক ফোরামকে কাজে লাগিয়ে বঙ্গোপসাগরের বন্দর ডিজিটালাইজেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ‘নিয়ম নির্ধারণকারী’ হিসেবে বাংলাদেশের উত্থান ঘটতে পারে।

মাথায় এটাও রাখতে হবে যে, বঙ্গোপসাগর বর্তমানে বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের অন্যতম প্রধান মঞ্চ। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-তিন শক্তিই বঙ্গোপসাগরের দিকে নজর দিয়েছে।

চীনের প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে সংকীর্ণ প্রণালি মালাক্কা প্রণালি নামে পরিচিত সাগরভাগ দিয়েই চীনে পৌঁছায়। কিন্তু মালাক্কা প্রণালির ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণের কাছাকাছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলোর (যেমন : সিঙ্গাপুর) শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাত বা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি এ পথটি বন্ধ বা অবরুদ্ধ করে দেয়, তবে চীনের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া মালাক্কা প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি (ফিলিপস চ্যানেল) মাত্র ১.৫ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ২.৮ কিলোমিটার চওড়া। এটি একটি প্রাকৃতিক ‘চেকপয়েন্ট’। এত সরু রুট দিয়ে প্রতিদিন শতশত বৃহৎ তেলবাহী জাহাজ যাতায়াত করায় যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা জাহাজজটের কারণে দীর্ঘদিনের জন্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা থেকে মুক্তি পেতে চীন বঙ্গোপসাগরকে তার জ্বালানি নিরাপত্তার বিকল্প পথ হিসাবে বেছে নিয়েছে। মিয়ানমারের ক্যউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ এবং চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে সংযুক্ত তেল-গ্যাস পাইপলাইন সেই কৌশলেরই অংশ।

আবার ভারতের কলাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্র্যান্সপোর্ট প্রজেক্টে বঙ্গোপসাগর খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা সমুদ্রবন্দর থেকে মিয়ানমারের সিত্তওয়ে বন্দর হয়ে ভারতের স্থলবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরামকে সরাসরি যুক্ত করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এ প্রকল্পটি মূলত তিনটি ধাপে বিভক্ত একটি সমন্বিত পরিবহণ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে ভারত তাদের ‘চিকেনস নেক’ বা সিলিগুড়ি করিডরের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনাও করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও বঙ্গোপসাগর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বঙ্গোপসাগর গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থান দখল করে আছে। মার্কিন সামরিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এ পানিসীমা হলো ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া নৌঘাঁটি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুরের মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগসূত্র।

বাংলাদেশকে তিনটি হিসাবই মাথায় রাখতে হবে। তিনটি দেশই চাইবে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে। আবার তিনটি দেশই চাইবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে। বাংলাদেশ স্রেফ ব্যবহৃত হবে নাকি কৌশলগত এ এলাকাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবে, সেটিই বিবেচ্য বিষয়। এ কাজে যতটা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করবে আমাদের ভবিষ্যৎ।

বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য এক রহস্যময় উপহার। ঢেউয়ের প্রতিটি উত্থান-পতন যেমন সম্ভাবনার বার্তা দেয়, তেমনি হতে পারে অশনিসংকেত। এ সাগর আমাদের দিয়েছে এক বিশাল সুযোগ। তবে সুযোগ ও সুবিধা এক বিষয় নয়; সুবিধা আদায় করে নিতে হয় দূরদর্শিতা, সঠিক কৌশল এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি দিয়ে। বঙ্গোপসাগর ভবিষ্যতে আমাদের সমৃদ্ধির দ্বার উন্মোচন করবে নাকি বৃহৎ শক্তির ভূ-রাজনীতির ক্রীড়নক হয়ে থাকবে-তার উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের আগামী দিনের নীতিনির্ধারণী কৌশলের ওপর। বাংলাদেশ যদি নিজস্ব মেরুদণ্ড শক্ত রেখে সমুদ্রশাসন করতে না শেখে, তবে এ অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আমরা শুধু দর্শক হয়েই থাকব।

মোহাম্মদ হাসান শরীফ : সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম