Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

মক্কা চুক্তি : সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

Advertisement

Icon

মে. জে. (অব.) ফজলে এলাহী আকবর

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মক্কা চুক্তি : সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

এ বছরের ৭ আগস্ট মুসলমানদের পবিত্র নগরী মক্কায় ঘটে গেছে এক অভূতপূর্ব ঘটনা, যা বর্তমান ভূরাজনীতির হিসাব অনেকটাই পালটে দেবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ওই দিনে সৌদি আরবের মক্কায়, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ‘মক্কা দলিল’ নামে এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এ চুক্তিটিকে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসাবে অভিহিত করলেও মক্কা চুক্তিকে অনেকেই ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এর জন্য অবশ্য চুক্তিটির সবচেয়ে আলোচিত ধারাটিকেই উদ্ধৃত করা হচ্ছে। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, পক্ষভুক্ত তিনটি দেশের যে কোনো একটি দেশ বহিঃশত্রুর আক্রমণের শিকার হলে, তিন দেশই তা নিজেদের ওপর আঘাত হিসাবে বিবেচনা করবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ বাধ্যবাধকতা হুবহু ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর অনুরূপ এবং ধারাটি একই সঙ্গে জাতিসংঘের আর্টিকেল ৫১-এ বলা ‘ব্যক্তি এবং সমষ্টির আত্মরক্ষার্থের অধিকার’-এর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবে জানা গেছে, রিয়াদে এ সংস্থার সচিবালয় হবে এবং প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল হিসাবে পাকিস্তান দায়িত্ব পালন করবে।

এ জোট গঠনের পর থেকেই বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি নিয়ে তুমুল চর্চা হচ্ছে। বাংলাদেশের এ জোটে পক্ষভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা এবং যৌক্তিকতা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করাও এ নিবন্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ এ জোটে যোগদান করলে বিশেষ করে, ভারত, চীন ও আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব পড়বে কি না, সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও এই আলোচনায় স্থান পাবে।

মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উল্লেখযোগ্য জোটগুলো : মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত নিরাপত্তা ধারণার গোড়াপত্তন অনেক আগে হলেও, প্রায় প্রতিটি জোট কোনো না কোনো কারণে গঠনকালীন প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে না পেরে হয় বিলীন অথবা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। উদাহরণ স্বরূপ, ১৯৫৫ সালের ‘বাগদাদ জোট’ বা পরে যেটা ‘সেনটো’ নামে পরিচিত ছিল তার কথা বলা যায়। তুরস্ক, পাকিস্তান, ইরান, ইরাক ও ইংল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত সোভিয়েতবিরোধী এ জোটটি অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং অসংগতিপূর্ণ হুমকি ধারণার কারণে ভেঙে যায়। একইভাবে একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী ‘ওআইসি’ আজ কাগুজে বাঘ। মূলত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের উদ্যোগে গঠিত ‘জিসিসি কাউন্সিল’-এর কার্যকারিতাও খুব একটা চোখে পড়ে না। এ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক অন্তত তিনটি জোট বিদ্যমান, যার সবকটির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এর মধ্যে I₂U₂ বা ভারত-ইসরাইল-ইউএসএ-ইউএইকে নিয়ে গঠিত সংস্থাটি পানি, জ্বালানি, পরিবহণ, মহাকাশ গবেষণা, স্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা শেকল তৈরির কাজ করছে। ভবিষ্যতে এ সংস্থায় সৌদি আরব ও তুরস্কের যোগদান করার কথা ছিল। যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে জোটটিতে সৌদি আরব এবং তুরস্কের ভবিষ্যৎ সংযুক্তি এবং আফ্রিকামুখী সম্প্রসারণ নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক আরেকটি অর্থনৈতিক জোট হচ্ছে IMEC বা ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডর, যা চালু হলে ভারত থেকে ইউরোপ যাওয়ার সময় ৪০ শতাংশ এবং পরিবহণ খরচ ৩০ শতাংশ কমে যাবে। করিডরটির পূর্বাংশ নৌপথে ইউএই-এর বিভিন্ন বন্দর হয়ে আরব উপসাগরে প্রবেশ করবে এবং উত্তরাংশ সৌদি আরব, জর্ডান এবং ইসরাইলের হাইফা বন্দর ঘুরে রেলওয়ে এবং সড়কপথে ইউরোপে প্রবেশ করার কথা। পরিষ্কার হাইড্রোজেন পাইপলাইন প্রতিষ্ঠা, বৈদুতিক গ্রিড স্থাপন এবং সাগরের তলদেশে দ্রুতগতির ডেটা কেবল স্থাপনের মতো বেসামরিক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে জোট গঠনের কথা বলা হলেও, এটাকে অনেকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের বিরুদ্ধে ভারতের একটি পালটা চাল হিসাবে মনে করে। সর্বশেষ যে জোটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাববলয় বিস্তার করার প্রচেষ্টা নিয়েছে, তা হলো ‘আব্রাহাম একর্ড’। আব্রাহাম একর্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমেরিকার প্রেসক্রিপশনে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা। এই ইউএসএ, বাহরাইন ইউএই, ইসরাইল, মরক্কো, সুদান ও কাজাখস্তান-এ ৬টি দেশ নিয়ে গঠিত আব্রাহাম একর্ডের ভবিষ্যৎও এখন ঝুঁকির মুখ পড়েছে। ইতোমধ্যে মরক্কো সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করায় চুক্তিটির সাফল্য নিয়ে সবাই এখন সন্দিহান। ওই আলোচনা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্যে অধিকাংশ জোট গঠনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পৃক্ত থাকলেও মক্কা চুক্তি সরাসরি আঞ্চলিক উদ্যোগে হয়েছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি : পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরে এসে দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি চূড়ান্ত রূপ নেয়। অন্যদিকে ন্যাটোর দ্বিতীয় শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং দেশীয় প্রযুক্তির অত্যাধুনিক ড্রোন, নৌ সরঞ্জাম, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তির উদ্ভাবক তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্কের ভিত্তি অনেক প্রাচীন। ইরান-আমেরিকা-ইসরাইলের যুদ্ধ এ সম্পর্ককে দ্রুত ভূ-কৌশলগত সামরিক সম্পর্কে রূপান্তর ঘটিয়েছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এতদিন নিজেদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ঘাঁটিগুলোর উপস্থিতিতে নিজেদের সুরক্ষিত মনে করত। কিন্তু ইরানের মিসাইল আক্রমণের মুখে, আরব দেশগুলোকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন তার যুদ্ধ সরঞ্জাম নিরাপদে সরিয়ে নেয় এবং শুধুই ইসরাইলের নিরাপত্তায় মনোযোগী হয়, তখন সৌদি আরব অনেকটা বাধ্য হয়ে মক্কা জোট গঠন করে। তবে শুরুতেই চুক্তিটি থেকে কাক্সিক্ষত সাফল্য আশা করা ঠিক হবে না, কারণ এ চুক্তির ধারাগুলো নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা আছে। তবে ভবিষ্যতে তিনটি শক্তিশালী মুসলিম দেশ নিয়ে গঠিত এ জোটের গুরুত্ব এবং প্রভাব নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। চুক্তিটি বিশ্লেষণ করলে জোটের তিন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের প্রত্যেকের কৌশলগত এবং ঝুঁকিজনিত ভিন্নতা দৃষ্টিগোচর হয়। যেমন, সৌদি আরবের রয়েছে ইরানকেন্দ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ, ইয়েমেন ও হুথি হুমকি, তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তাসহ পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা শঙ্কা। অন্যদিকে তুরস্কের প্রয়োজন সিরিয়া, ইরাক, ককেশাস অঞ্চলে প্রভাব, নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং তার ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বাজার আরও সম্প্র্রসারণ করা। এদিকে পাকিস্তানের লক্ষ্য হচ্ছে সামরিক ও অর্থনৈতিক খাতে সহযোগিতা, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং ক্রমবর্ধমান হারে বৈরী হয়ে ওঠা ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে, সৌদি আরব এবং তুরস্কের সহায়তা লাভ করা।

মক্কা জোট ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব : যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে এটিকে ‘বড়, সাহসী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ’ হিসাবে অভিনন্দন জানিয়ে ট্রুথ সোশ্যালে আরও লেখেন ‘তিন দেশ এখন থেকে আরও অর্থপূর্ণভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা দিতে পারবে’। বিশ্লেষকদের ধারণা তিন দেশ, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রদেয় নিরাপত্তা বোঝাটা ভাগ করে নেওয়ায় তারা আপাতদৃষ্টিতে খুশি। অবশ্য এতে করে আব্রাহাম একর্ডের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবে বলেও ওয়াকিবহাল মহল মনে করে। চীনও আপাতদৃষ্টিতে চুক্তিটি নিয়ে নির্লিপ্ততা দেখিয়েছে। চুক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে প্রকাশ্যে তাদের কোনো বক্তব্য না এলেও বিভিন্ন মন্তব্য প্রতিবেদনে তারা চুক্তিটির বহুপাক্ষিকতা, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রম ক্ষয়িষ্ণু মার্কিন প্রভাববলয় এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাকে সাধুবাদ জানিয়েছে। চীন অনেকদিন ধরেই সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনার দুতিয়ালি করছিল, তাই মক্কা জোট নিয়ে তার নাখোশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। এদিকে রাশিয়ার অবস্থান আরও স্বচ্ছ। প্রেসিডেন্ট পুতিনের মুখপাত্র দেমিত্রি পেসকভ চুক্তিটিকে ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্তম্ভ’ হিসাবে অভিহিত করেছে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্জেই লেভরভ, ইরানসহ অন্যদের যোগদানের সুযোগ করে দিয়ে, জোটটিকে রাশিয়ার প্রস্তাবিত ‘বৃহত্তর উপসাগরীয় নিরাপত্তা ধারণা’কে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। মক্কা চুক্তিকে অনেকেই যখন ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের রক্ষাকবচ হিসাবে দেখার চেষ্টা করছে, তখন ইরান এ চুক্তির বাপারে পুরোপুরি নির্লিপ্ত মনোভাব দেখাচ্ছে। পাকিস্তান এবং সৌদি আরবও বিভিন্ন চ্যানেলে কয়েকবার ইরানকে এ চুক্তি যে ইরানের বিরুদ্ধে নয় সে ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছে। তুরস্কের সঙ্গেও ইরানের চমৎকার বোঝাপড়া রয়েছে। কাজেই ইরান এ চুক্তি নিয়ে অনেকটাই নির্ভার বললে অত্যুক্তি হবে না।

(বাকি অংশ আগামীকাল)

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর : বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা; চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটিজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এফএসডিএস)

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম