সম্বোধনের বদল, রাজনীতির সংস্কৃতিরও কি বদল
Advertisement
জাহেদুল আলম হিটো
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কখনো কখনো তার সংবিধানের পাতায় যতটা দৃশ্যমান, তার চেয়েও বেশি ধরা পড়ে তার ভাষায়। ক্ষমতাসীনকে আমরা কী নামে ডাকি, তাকে কীভাবে সম্বোধন করি, তার সামনে আমাদের শব্দগুলো কতটা নত হয়ে আসে-এসব আপাততুচ্ছ বিষয় আসলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের গভীরে থাকা মানসিকতারই প্রতিচ্ছবি। এ বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের নামের আগে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ ইত্যাদি সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারের অবসান ঘটানোর সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেবল ভাষারীতি পরিবর্তন বলে দেখলে হয়তো এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যটি অনুধাবন করা যাবে না। এটি ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বড় একটি রাজনৈতিক বার্তা-রাষ্ট্রে ব্যক্তি নয়, পদ ও প্রতিষ্ঠানই মুখ্য; ক্ষমতার উৎস কোনো ব্যক্তি নন, জনগণ।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই, সেখানে রাষ্ট্রীয় পদাধিকারী ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যে মর্যাদার মৌলিক বিভাজন থাকে না। দায়িত্বের পার্থক্য থাকে, ক্ষমতার পরিধির পার্থক্য থাকে, কিন্তু নাগরিকত্বের মর্যাদায় কোনো ঊর্ধ্ব-নিচ নেই। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপরিচালনা করেন, কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক নন; মন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু জনগণের ঊর্ধ্বে নন। তাদের ক্ষমতার বৈধতা আসে জনগণের কাছ থেকে এবং সেই ক্ষমতার হিসাবও দিতে হয় জনগণের কাছেই। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চর্চায় আমরা প্রায়ই এর বিপরীত একটি সংস্কৃতি দেখেছি। নেতাকে নেতা হিসাবে সম্মান করার পরিবর্তে তাকে এমন এক উচ্চতায় বসানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রশ্ন করা যেন অপরাধ, সমালোচনা যেন অবমাননা এবং ভিন্নমত যেন আনুগত্যহীনতার নামান্তর। নেতৃত্বকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রশংসা, ব্যক্তিপূজা এবং আনুগত্যের প্রদর্শন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক আচরণের স্বাভাবিক অংশে পরিণত হলে গণতন্ত্রের প্রাণ ‘জবাবদিহিতা’ নীরবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বকে অতিমানবীয় মর্যাদায় উপস্থাপনের প্রবণতা আমরা দেখেছি।
রাজনীতিবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের কর্তৃত্বের তত্ত্ব এ প্রসঙ্গে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়। কোনো নেতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা ক্যারিশমা যখন রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কর্তৃত্বকে ছাপিয়ে যায়, তখন প্রতিষ্ঠান ক্রমে ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। নিয়মের জায়গায় ব্যক্তির ইচ্ছা, প্রতিষ্ঠানের জায়গায় আনুগত্য এবং যুক্তির জায়গায় প্রশংসা স্থান নিতে শুরু করে। এ কারণেই রাজনৈতিক সংস্কারের প্রথম শর্ত হতে পারে ক্ষমতার ভাষাকে গণতান্ত্রিক করা। রাষ্ট্রীয় পদকে সম্মান করতে হবে, কিন্তু পদাধিকারীকে দেবত্বের আসনে বসানো যাবে না। নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন প্রশ্নহীন আনুগত্যে পরিণত না হয়। বরং একটি সুস্থ গণতন্ত্রে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধার প্রকাশ হলো নেতাকে সত্য কথা বলার সুযোগ ও সাহস তৈরি করা।
তবে শুধু সম্বোধনের শব্দ বদলালেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে যাবে-এমন সরল আশাবাদে এদেশের মানুষ ভাসতে চাইতেই পারে। যদিও আমরা জানি, শব্দ পরিবর্তনে কেবল দরজা খুলতে পারে, কিন্তু ঘরের ভেতরের আসবাব বদলাতে যেতে হবে বহুদূর। রাজনৈতিক সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা হবে প্রতিষ্ঠান ও আচরণে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার নানা উদ্যোগের কথা ৩১ দফায় রয়েছে। বহুদলীয় রাজনীতির বিকাশ, স্থানীয় সরকারে বিকেন্দ্রীকরণ এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা-এসব উদ্যোগ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে এ দেশে বহুল আলোচিত। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সময়কার এসব উদ্যোগের পাশাপাশি তারেক রহমানের ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান সংস্কারের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নে একটি বিস্তৃত রূপরেখা। তারই প্রতিফলন আমরা এ প্রজ্ঞাপনে দেখতে পাই।
এখানে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি থেকে শক্তিশালী হবে? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাতন্ত্র্য, সংসদের জবাবদিহি, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে শক্তিশালী শাসক নয়; শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান; যা বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি। এ জায়গাতেই ‘রাষ্ট্র মেরামত’ ধারণাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। রাষ্ট্র মেরামত কোনো একদিনের কাজ নয়, কোনো জাদুর কাঠিও নয়। এটি একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা। ভুল প্রতিষ্ঠানকে সংশোধন করতে হয়, দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হয় এবং এমন নিয়ম প্রতিষ্ঠা করতে হয়, যা ব্যক্তি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়বে না। ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বিন্যাসের এ ধারণাকে ‘গ্র্যাজুয়ালিস্ট ইনস্টিটিউশনালিজম’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়।
রাজনীতির ভাষাও তাই সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আমরা যদি প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসাবে দেখি, সমালোচককে বিশ্বাসঘাতক ভাবি এবং ক্ষমতাসীনকে প্রশ্নাতীত মনে করি, তাহলে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের দিনে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। গণতন্ত্রের আসল চর্চা ঘটে সংসদে, দলীয় সভায়, সংবাদমাধ্যমে, প্রশাসনের আচরণে এবং নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিদিনের সম্পর্কের মধ্যে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তাই এমন একটি পরিবর্তন প্রয়োজন, যেখানে ভিন্নমত মানেই বিরোধিতা নয়, বিরোধিতা মানেই শত্রুতা নয় এবং সমালোচনা মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। বরং মতের পার্থক্যকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। সম্বোধনের পরিবর্তন সেই বৃহত্তর যাত্রার একটি প্রতীক হতে পারে। ভাষা মানুষের চিন্তাকে যেমন প্রকাশ করে, তেমনি চিন্তাকেও প্রভাবিত করে। অতএব রাষ্ট্রীয় ভাষা যদি নাগরিককে মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতাবানও জবাবদিহির বাইরে নন, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ‘মাননীয়’ শব্দটি থাকবে কী থাকবে না, প্রশ্নটি তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোন দিকে যেতে চাই। এমন এক সংস্কৃতির দিকে, যেখানে ক্ষমতাকে ঘিরে তোষামোদ ফুলের মতো ফুটবে? নাকি এমন এক সংস্কৃতির দিকে, যেখানে সত্য কথা বলার সাহসই হবে রাজনৈতিক সততার প্রধান পরিচয়? বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তরে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছেন। রাষ্ট্রের কর্তা নয়, রাষ্ট্রের সেবক এ মানসিকতা যদি রাজনৈতিক আচরণে প্রতিষ্ঠিত হয়; ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান যদি ক্ষমতার কেন্দ্র হয়; আনুগত্য নয়, জবাবদিহি যদি রাজনীতির প্রধান মূল্যবোধ হয়ে ওঠে, তবেই একটি পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম হবে।
সম্বোধনের একটি শব্দ বদল হয়তো সেই দীর্ঘ যাত্রার ছোট্ট একটি পদক্ষেপ। কিন্তু ইতিহাসের বড় পরিবর্তনও তো অনেক সময় শুরু হয় ছোট কোনো প্রতীকী মুহূর্ত থেকে। শব্দের বা ভাষার এ পরিবর্তন একদিন কি আমাদের রাজনৈতিক আচরণ, প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতার দর্শনকেও বদলে দিতে পারে? আমরা আশাবাদী এ কারণে যে, বর্তমান সরকারের মূলমন্ত্র ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
জাহেদুল আলম হিটো : রাজনৈতিক কর্মী
