প্রতিষ্ঠিত হোক জলবায়ু ন্যায়বিচার
Advertisement
আসিফ রশীদ
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর কোনো ধারণার বিষয় নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে যাওয়া থেকে শুরু করে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন-এ সবকিছু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে আগামী ৯ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় শুরু হতে যাচ্ছে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন (কপ ৩১)। এবারের সম্মেলনে প্রকৃত অর্থে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠিত হবে, নাকি বরাবরের মতো করপোরেট স্বার্থের চোরাবালিতে ঢাকা পড়ে যাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবি, সেটাই দেখার বিষয়।
নেপালে গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ হিমবাহ-গলন সৃষ্ট বন্যার পর যে প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে তা হলো, যে সংকট তৈরিতে দেশটির নিজের কোনো ভূমিকা প্রায় নেই, সেই সংকটের ভয়াবহ মূল্য কেন তাকে দিতে হবে? এ বিপর্যয়ের পর নেপাল যে ভাষায় কথা বলছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধু মানবিক সাহায্য চাইছে না; বলছে, এটি ‘দান’ নয়, ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’। নেপালের যুক্তি সরল-যেসব দেশ ঐতিহাসিকভাবে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে পৃথিবীকে উষ্ণ করেছে, তাদের কর্মকাণ্ডের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ছে এমন দেশগুলোর ওপর, যাদের নিজস্ব নিঃসরণ খুবই কম।
এ জায়গাতে বাংলাদেশের প্রসঙ্গও চলে আসে। নেপাল হিমবাহ গলে যাওয়ার অভিঘাতে বিপর্যস্ত; বাংলাদেশও হিমালয়ের নিুপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন, বন্যা ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি বহন করছে। মালদ্বীপের মতো ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সামনে তো অস্তিত্বেরই প্রশ্ন। অতএব নেপালের দাবি শুধু নেপালের দাবি নয়; এটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্বের একটি বৃহত্তর অংশের ন্যায়বিচারের দাবি।
প্রশ্ন হতে পারে, ক্ষতিপূরণ কি কেবল সাহায্য? জলবায়ু আলোচনায় সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াই এখানেই। উন্নত দেশগুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’কে সহায়তা বা অর্থায়নের কাঠামোর মধ্যে দেখতে চেয়েছে। ক্ষতিপূরণ শব্দটির মধ্যে দায় স্বীকারের প্রশ্ন রয়েছে। আর দায় স্বীকার করলে পরবর্তী প্রশ্ন আসে-কার দায়, কতটা দায় এবং কত অর্থ?
কপ ২৮-এ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ গড়ে উঠলেও এ তহবিলের আকার এখনো প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ তহবিলে ২৭টি পক্ষের প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৬৮.৪ মিলিয়ন ডলার; আর ২০২৫ সালের শেষে UNFCCC (জলবায়ু পরিবর্তনবিষযক জাতিসংঘের কাঠামোগত কনভেনশন) প্রায় ৮১৭ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীতে জলবায়ু সংকট যে গতিতে বাড়ছে, তার তুলনায় অর্থের প্রবাহ এখনো অতি সামান্য।
নেপালের দাবি তাই একটি বড় কাঠামোগত প্রশ্ন সামনে এনেছে-জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে কি প্রতিবছর নতুন করে ত্রাণ চাইতে হবে, নাকি এক্ষেত্রে একটি পূর্বনির্ধারিত ন্যায়সংগত আর্থিক ব্যবস্থা থাকবে? বাংলাদেশের জন্যই বা এর অর্থ কী? বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো-জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তার নৈতিক ও বাস্তব উভয় ধরনের যুক্তি আছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের বক্তব্যেও বলা হয়েছে, জলবায়ু চুক্তির কাঠামো সাধারণ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ক্ষতিপূরণ বা রাষ্ট্রীয় দায়ের প্রশ্নকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে না। এখন প্রয়োজন সেই অবস্থানকে আরও জোরালো কূটনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। প্রথমত, বাংলাদেশকে নিজেদের জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি করতে হবে। কত মানুষ ঘূর্ণিঝড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, নদীভাঙনে কত জমি হারিয়েছে, লবণাক্ততায় কৃষি ও পানির উৎসের কত ক্ষতি হয়েছে, জলবায়ুজনিত অভিবাসনে নগর অর্থনীতির ওপর কত চাপ পড়েছে-এসবের একটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ডেটাবেজ প্রয়োজন। কারণ আন্তর্জাতিক ফোরামে দরকষাকষিতে শুধু ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত’ বললে হবে না। বলতে হবে-‘এই ক্ষতির পরিমাণ এত; এর মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষতি এত; অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি এত; ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এত।’ দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে নেপাল ও মালদ্বীপের সঙ্গে একটি ‘Climate Vulnerable Countries Coalition’ ধরনের কার্যকর কূটনৈতিক জোট গড়ে তুলতে হবে। ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোট AOSIS, Least Developed Countries Group, G77+China I V20-এর মতো প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে লক্ষ্য হতে হবে একটি যৌথ দাবি-‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে’ পর্যাপ্ত, নতুন ও অনুদানভিত্তিক অর্থ দিতে হবে; অর্থ পেতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে; ক্ষতিগ্রস্ত দেশকে ঋণ নয়, অনুদান দিতে হবে; এবং ক্ষতির হিসাব নির্ধারণে শুধু জিডিপি নয়, মানবিক ও পরিবেশগত ক্ষতিও বিবেচনা করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বৈষম্য আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। যারা কার্বন নিঃসরণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে ও রাখছে, সেই শিল্পোন্নত দেশগুলো আজও তাদের ঐতিহাসিক দায় স্বীকার করতে দ্বিধাগ্রস্ত। অথচ বাংলাদেশ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র কিংবা আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলের দেশগুলোর মতো যারা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নামমাত্র ভূমিকা রেখেছে, তারাই এর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করছে। এই যে অন্যায্যতা-যেখানে অপরাধ এক পক্ষের আর শাস্তি ভোগ করছে অন্যপক্ষ-এটাই জলবায়ু ন্যায়বিচারের মূল রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক সংকট। কপ ৩১-এর প্রাক্কালে আমাদের সবার আগে এই কাঠামোগত বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে।
গতানুগতিক কপ সম্মেলনগুলোতে আমরা প্রায়ই উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এবং সুন্দর কথামালার ফুলঝুরি দেখেছি। কিন্তু কার্যকর অর্থায়ন বা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের রূপায়ণে উন্নত দেশগুলোর টালবাহানা প্রমাণ করে, তাদের কাছে বাণিজ্যের মুনাফা মানুষের জীবনের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। কেবল কার্বন বাজেট কমানোই কপ ৩১-এর মূল এজেন্ডা হওয়া উচিত নয়; হওয়া উচিত জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অধিকার এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ও সময়োপযোগী ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। ঋণের জালে জড়িয়ে জলবায়ু তহবিল বিতরণ করার যে নতুন ঔপনিবেশিক মানসিকতা তৈরি হয়েছে, তা প্রতিরোধ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য জলবায়ু ন্যায়বিচার কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি সরাসরি বেঁচে থাকার শর্ত। উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমি আজ লোনাজলে প্লাবিত; মানুষের পানীয় জলের তীব্র সংকট। প্রতিটি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আমাদের অর্থনীতিকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিচ্ছে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের কপ-এ কেবল অনুদান চাওয়ার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে বৈশ্বিক ফোরামে ঐতিহাসিক ক্ষতির দায় আদায়ের জোরালো দাবি তুলতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য যারা দায়ী, তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা কেবল অনুকম্পার বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক অধিকার।
আসন্ন কপ ৩১-এর সফলতার মাপকাঠি নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে যে, বিশ্বনেতারা মুনাফাভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির লোভ সংবরণ করে মানবতা ও প্রকৃতির সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে পারেন কিনা। যদি এ সম্মেলনেও সেই পুরোনো আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা আর কথার মারপ্যাচ চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। জলবায়ু ন্যায়বিচার মানে কেবল কার্বন নিঃসরণ কমানো নয়; এর অর্থ হলো একুশ শতকের এই অসম বিশ্বে মানুষের সমতা, মর্যাদা এবং ধরিত্রীকে রক্ষা করার এক যৌথ অঙ্গীকার।
জলবায়ু ন্যায়বিচারের মূল কথা তাই একটাই-যারা সংকট তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে, তাদেরই সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। আর যারা সবচেয়ে কম দায়ী হয়েও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের জন্য সাহায্য নয়, নিশ্চিত করতে হবে ন্যায়সংগত অধিকার।
আসিফ রশীদ : উপসম্পাদক, যুগান্তর
