Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অন্যমত

পুরোনো খোলস থেকে বের হতে হবে

Advertisement

Icon

আবু আহমেদ

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পুরোনো খোলস থেকে বের হতে হবে

ছবি: যুগান্তর

Advertisement

আমাদের চারদিকে যে অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতা বিরাজ করছে, তার মূলে রয়েছে দারিদ্র্য। দেশের বিনিয়োগে খরা এবং অর্থনীতির গতিহীনতা দারিদ্র্যের বিস্তার ঘটাচ্ছে। আর এর ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বলি, সমাজে বিভক্তি বলি, মারামারি আর হানাহানির সংস্কৃতি বলি, চাঁদাবাজি-ছিনতাই-রাহাজানি বলি, মব কালচার বলি-এ সবকিছুই আসছে দারিদ্র্য থেকে। যদি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার না বাড়ে এবং সঠিক মাত্রায় কর্মসংস্থান না হয়-সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়বেই। যেভাবে দিন দিন দরিদ্র লোকের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে শেষ পর্যন্ত আমাদের সমাজে এটা একটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে।

সরকার তার নিজস্ব গতিতেই চলছে। কিছু ক্ষেত্রে ছোট ছোট কাজগুলো তো করবেই সরকার; কিন্তু কিছু কাজ সরকারকে খুব দ্রুত করতে হবে। অগ্রাধিকারভিত্তিক যে কাজগুলো রয়েছে, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই দ্রুত করতে হবে। অগ্রাধিকারের কাজগুলো সরকার এগিয়ে নিলে জাতি একটা আশার আলো দেখতে পাবে। তাই সরকারের সে পথেই যাওয়া উচিত। পুরো দেশ একটা স্থবিরতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। তেমন কোনো চমকপ্রদ সংবাদ আমরা পাচ্ছি না। সবকিছুতেই কেমন যেন একটা ম্লান অবস্থা বিরাজ করছে। শেয়ারবাজার তার জৌলুস হারিয়ে চুপচাপ বসে আছে যেন, কোনো কাজ করছে না। অবশ্য শেয়ারবাজারে নতুন কমিশন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাকে কমিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাকে নিয়ে আমরা আশাবাদী। কারণ তিনি একজন অভিজ্ঞ লোক। কিন্তু নতুন কমিশনও শেয়ারবাজারে ভালো কোনো রেজাল্ট দেখাতে পারছে না। আমি বলতে চাই, শুধু মুখে কথা বললে হবে না, রেজাল্ট দেখাতে হবে। জনগণ ভালো কিছু চমক দেখতে চায়। ভালো ভালো বিদেশি কোম্পানি আমাদের শেয়ারবাজার থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে গেছে। আমরা তাদের ফেরাতে পারিনি। অর্থাৎ ওইসব বিদেশি কোম্পানিকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি। কেন পারিনি, সে প্রশ্নের জবাবে বলতে হয়, আমরা তাদের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধাগুলো দিতে পারিনি। সুবিধা না পেলে তারা এখানে থাকবে কেন? এখন শেয়ারবাজারে গতি ফেরাতে হলে দু-চারটি ভালো কোম্পানিকে এখানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, তা সরাসরি তালিকাভুক্ত করেই হোক অথবা আইপিওর মাধ্যমে। এতে যারা আমাদের শেয়ারবাজার ছেড়ে চলে গেছে, তারাও তখন ফিরে আসবে।

আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কমপক্ষে ৫.৫ শতাংশে উন্নীত করে তা ধরে রাখতে হবে। এর জন্য যা করা দরকার, আমাদের তা-ই করতে হবে। এখন বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। সরকার এখানে-সেখানে ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। কিছু কলকারখানাকে ২০০ কোটি, ১০০ কোটি, ৫০ কোটি টাকা আর্থিক সুবিধা দিয়ে এগুলোতে গতি ফেরাতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে কাউকে সুবিধা দিতে হলে ইউনিফর্ম অনুযায়ী সুবিধা দেওয়া উচিত। এভাবে সরাসরি আর্থিক সুবিধা না দিয়ে অন্য কোনোভাবেও দেওয়া যায়। যেমন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়ে দিলে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুবিধাটা নিতে পারত। সরাসরি আর্থিক সুবিধা প্রদান করলে বিষয়টিকে অনেকে বৈষম্যমূলক বলে প্রশ্ন তুলতে পারে। শুধু তাই নয়, যারা ব্যাংক ঋণ ফেরত দিতে পারত, তারা খেলাপি হয়ে আর ফেরত দিতে চাইবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ধরনের পলিসিকে আমি আগেও সমর্থন করতে পরিনি, এখনো পারি না। কারণ বৈষম্যমূলক যে কোনো পলিসিই খারাপ ফল দেয়। সুতরাং বাংলাদেশ ব্যাংককে এ ধরনের বৃত্তের বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য প্রথমেই দরকার ব্যাংকের সুদের হার কমানো। মানে রেপো রেট কমানো উচিত। ইতোমধ্যে সরকার রেপো রেট ৫০ পয়সা কমিয়েছে। পরবর্তী পলিসির জন্য আরও ৫০ পয়সা কমাতে হবে আগামী দেড়-দুই মাসের মধ্যে। আমার পরামর্শ হচ্ছে, পলিসি রেট বা রেপো রেটকে ৮-এ নিয়ে আসতে পারলে মার্কেট ইন্টারেস্ট ১০ বা ১১-এর কাছাকাছি থাকবে। ফলে উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবে। শিল্প ও কলকারখানায় উৎপাদন বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে।

এখন দেশে ব্যবসা করার ব্যয় বেশি। তার ওপর পণ্য খালাসে রয়েছে জটিলতা। কারণ পোর্ট ঠিকমতো অপারেশন করে না। তাছাড়া সুদের হার বেশি হওয়ায় একুমুলেটেড বার্ডেন বেশি হয়ে যায়। এত ব্যয় করে স্বাভাবিকভাবেই এদেশে কেউ ব্যবসা করতে চাইবে না। যা হোক, এখানে ডি-রেগুলেশন করার কথা বলা হচ্ছে। এটা হয়তো সরকার করবে। কিন্তু বেসরকারি খাত একবার যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে যায়, তাহলে ওটাকে জাগ্রত করতে, সক্রিয় করতে সময় লাগে। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য সমূহ ক্ষতিকর।

আমি আগেও বলেছি, দরিদ্র লোকদের বিভাজন করা সহজ, তাদের বিভিন্ন পক্ষ-বিপক্ষ বানানো সহজ এবং তাদের ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত করাও সহজ। তাই কোনো সমাজে বিভাজন থাকলে সে সমাজে অস্থিরতা থাকবেই। আর অস্থির সমাজ, অস্থির রাষ্ট্র কখনো এগোতে পারে না। তা রাজনীতির ক্ষেত্রেই হোক বা অর্থনীতির ক্ষেত্রে। তাই দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে আমাদের যা কিছু প্রয়োজন, তা-ই করতে হবে। আজ ৫৬ বছর হতে চলল, আমরা বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছি। কিন্তু দীর্ঘ এ ৫৬ বছরে আমরা খুব একটা এগোতে পেরেছি বলে মনে হয় না। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ রয়েছে, যারা যুদ্ধবিধ্বস্ত হয়েও নিঃস্ব-অসহায় অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো যদি উঠে দাঁড়াতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না? আসলে আমাদের এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা উচিত। খুঁজে দেখা উচিত এসব দেশের কর কাঠামো কেমন, তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পলিসিগুলো কোন ধারায় চলছে, বিশ্ববাজারে তারা কীভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পেরেছে ইত্যাদি। আমাদের সঙ্গে তাদের কী কী মিল ও অমিল রয়েছে, তাও দেখা উচিত। আমাদের আশপাশে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে, যা আমরা অনুসরণ করতে পারি। কিন্তু আমরা সেদিকে নেই। আমরা শুধু পারি ঋণের মধ্যে ডুবে থাকতে। আসলে ঋণের মধ্যে ডুবে থাকা মানে সামনে ঋণের ভারে আরও ডুবে যাওয়া। কারণ এক ঋণ আরেক ঋণকে কাছে টানে। আমাদের অর্থনীতির বিশাল অংশ চলে যায় ঋণের সুদ পরিশোধ করতে। এভাবে যদি ঋণের ভারে আমরা ডুবতেই থাকি, তাহলে আমরা ভবিষ্যতে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারব বলে মনে হয় না।

প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি দুটি একসঙ্গে যায়, এটা ঠিক আছে এবং সহনশীল। এটা পৃথিবীর সবখানেই আছে। কিন্তু বাংলাদেশে এর চিত্র ব্যতিক্রম। মানে এদেশে প্রবৃদ্ধি হবে না, কিন্তু মূল্যস্ফীতি হতে থাকবে। এমনটাই নিয়ম হয়ে গেছে এখানে। যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে তা হবে বিপজ্জনক। তখন দরিদ্র লোকের সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে। রেশন কার্ড দিয়ে কিংবা টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি বাড়িয়ে সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। আমাদের সমস্যার মূল জায়গায় ফোকাস করতে হবে। এর সমাধান হচ্ছে মানুষকে কর্মের দিকে আনা। সেজন্য বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে। আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা আছেন। তারা অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছেন। অবশ্য একটা সময় তারা সরকারের কাছ থেকে অনেক বেশি সুবিধা নিয়েছেন। যেমন বিদ্যুৎ খাতের মতো বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় খাত থেকে সুবিধা নিয়েছেন। সে সুবিধাগুলো হয়তো এখন আর অব্যাহত রাখা যাবে না। কিন্তু বেসরকারি খাতের আকাঙ্ক্ষাকে সরকারের আমলে নিতে হবে। সরকারি উদ্যোগে, সরকারি বিনিয়োগে কর্মসংস্থান বেশি হবে, এটা আশা করা আর ঠিক নয়। বিশ্বে সরকারি কর্মকাণ্ডকে গুটিয়ে আনা হচ্ছে। বেসরকারি খাতের জন্য আলাদাভাবে জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে। আর আমরা আমাদের এখানে এর উলটোটা করছি। সরকার নিজের উদ্যোগে নিজে খরচ বাড়াচ্ছে। মানে নিজে চলার জন্য ব্যয়ের পরিধি বাড়াচ্ছে। আর বেসরকারি খাতের ঋণের পরিধি সংকুচিত হচ্ছে। এটাই দেশের অর্থনীতিকে ভাবিয়ে তুলেছে। সরকারের ব্যয় বাড়ছে পরিচালনার জন্য, কোনো প্রকল্প চালানোর জন্য নয়। সরকারের ব্যয় বাড়ছে সরকারের নিজের আকার বড় করার জন্য। নিজের সুবিধাগুলো বাড়ানোর জন্য। অর্থাৎ সরকারের অধীনে যারা কাজকর্ম করে, তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য। এসব কারণে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সংকুচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে বেসরকারি খাতের সংকোচনও বাড়ছে। কারণ অর্থনীতির জন্য সরকার যদি টাকা-পয়সা নিজেই নিয়ে নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থ আর থাকে না। বা থাকলেও তা সামান্য। এ সামান্য অর্থ নিয়ে বেসরকারি খাত কীভাবে এগোবে? একদিকে করের হার বেশি, অপরদিকে সুদের হার বেশি, তাছাড়া অর্থনীতিতে যে অর্থটা প্রবাহিত হচ্ছে, এর সিংহভাগই নিয়ে যাচ্ছে সরকার। তাহলে বেসরকারি খাত দাঁড়াবে কীভাবে? এটা দেশের অর্থনীতির জন্য খুব ভালো ম্যানেজমেন্ট নয়। এভাবে চলতে থাকলে সামনে সমূহ বিপদ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। সুতরাং এ পদ্ধতি থেকে আমাদের খুব দ্রুত সরে আসা উচিত।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি

অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম