উপযুক্ত স্কুলিং : রাষ্ট্র মেরামতের প্রথম শর্ত
Advertisement
খোন্দকার কাওসার আহমেদ
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গোটা বিশ্বে শিক্ষা নিয়ে এতটাই পর্যালোচনা, গবেষণা ও প্রয়োগ হয়েছে যে, শেখানোর বিষয়টি এখন রীতিমতো বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে। শুধু বিজ্ঞান নয়, শিল্পেও। অতি সংক্ষেপে, বিজ্ঞান ও শিল্প সহযোগে শিক্ষা পরিবেশনের বিষয়টিকে ‘প্যাডাগোজি’ বলা যায়। প্যাডাগোজির আলোচনায় কী শেখানো হবে, কীভাবে শেখানো হবে এবং কে শেখাবেন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো চলে আসে।
কী শেখানো হবে-এটা একটা দার্শনিক প্রশ্ন। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে শিক্ষার উদ্দেশ্য, তথা আধুনিক শিক্ষার দর্শন। আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? সরল উত্তর হচ্ছে : জীবনকে অর্থবহ করার দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা এবং উপার্জনক্ষম মানবিক মানুষে পরিণত হওয়া। অর্থাৎ অর্থবহ জীবন, উপার্জনক্ষম ও মানবিক মানুষ তৈরি করা।
এখন আমাদের শিক্ষিত সমাজের দিকে তাকান, বেশুমার উপার্জনক্ষম মানুষ দেখতে পাবেন; কিন্তু অর্থবহ জীবনের মানবিক মানুষ কয়জন পাবেন? মোটাদাগে আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা সংকীর্ণ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে কতিপয় ‘টাকা কামানো’ মানুষ তৈরি করছে মাত্র-এ ছাড়া আর কী!
কীভাবে শেখানো হবে? এটা মনস্তাত্ত্বিক একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শিক্ষার উদ্দেশ্য হাসিল করানোর জন্যই শিক্ষককে পরিস্থিতির বিবেচনায় বিভিন্ন শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল বেছে নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্যাডাগোজি অজস্র বৈজ্ঞানিক ও নান্দনিক শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল সরবরাহ করে থাকে-এ দেশের অল্পসংখ্যক শিক্ষকই এর সন্ধান রাখেন। এখনো এমন অনেক শিক্ষক আছেন, যারা ‘বেত্রাঘাত’কে আদর্শ তরিকা মনে করেন, যা অত্যন্ত হীন ও সস্তা শিক্ষকতা।
‘নম্বর’কে কেন্দ্র করে পরীক্ষানির্ভর ভয়াবহ প্রতিযোগিতা রয়েছে এ দেশের শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে। এর মাশুলও জাতিকে দিতে হচ্ছে। আশু প্রতিকার না হলে সামনে আরও দিতে হবে। নির্জন বাসায় ‘মা’ পচে-গলে মরে আছেন, আর তার শিক্ষিত সন্তানরা যে যার স্বার্থসিদ্ধিতে নিমগ্ন! যে কোনো অসুন্দর ও অশুভ প্রতিযোগিতা ‘দানব’ উৎপাদনের কারখানা। বিপরীতে সহযোগিতামূলক ‘দলগত’ পদ্ধতিতে সুপ্ত থাকে সামাজিকীকরণের বীজ-আমাদের কাছে কেন জানি তা আদৃত হতে পারছে না!
ফ্রান্সের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জে. ডেলরস। ভদ্রলোক দশ বছর (১৯৮৫-১৯৯৫) ইউরোপীয় কমিশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৯৬ সালে ইউনেস্কোর কাছে শিক্ষাবিষয়ক একটা প্রবন্ধ জমা দেন, নাম-‘লার্নিং : দ্য ট্রেজার উইদিন’। ডেলরস সেখানে শিক্ষার চারটি স্তম্ভ বর্ণনা করেছেন-১. জানতে শেখা, ২. করতে শেখা, ৩. হতে শেখা, ৪. একসঙ্গে বসবাস করতে শেখা। এই চারটি স্তম্ভ ইউরোপের শিক্ষাব্যবস্থায় সমাদৃত হয়। আমার প্রশ্ন হলো : অনুরূপভাবে আমাদের শিক্ষার স্তম্ভ কয়টি ও কী কী-কেউ বলতে পারবেন?
‘কে শেখাবেন’-এ বিষয়কে উপজীব্য করে অনেক দেশে শিক্ষার বিভিন্ন স্তর মোতাবেক ‘শিক্ষক’ তৈরি করা হচ্ছে। ব্যবস্থা থাকছে শিক্ষকের জন্য নানা প্রশিক্ষণের। বাংলাদেশে শিক্ষক তৈরির সিস্টেম নেই, অথচ হয়ে থাকে অসংখ্য ‘শিক্ষক নিয়োগ’! অবশ্য, মাঝেমধ্যেই শিক্ষকদের জন্য আয়োজন করা হয় বিভিন্ন প্রশিক্ষণের।
এ দেশে বিবিধ প্রশিক্ষণে টইটম্বুর মাধ্যমিক স্তরের একজন শিক্ষক স্কুলে এসে তার প্রশিক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারেন না। এর অন্যতম কারণ হলো ‘স্কুলের বিরুদ্ধ পরিবেশ’। পাত্রের তলায় যদি ফুটো থাকে, তাহলে উপর থেকে যত ভালো কিছুই ঢালা হোক, পাত্র তা ধারণ করতে পারবে না-ছিদ্রপথে বেরিয়ে যাবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের আগে ছিদ্র বা ফুটো বন্ধ করা জরুরি। প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পৃষ্ঠপোষকতা, সহকর্মীদের নির্ভেজাল সহযোগিতা, অভিভাবকদের বোধগম্য করা এবং সর্বোপরি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছাড়া প্রশিক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতাকে কার্যকর করা অসম্ভব।
শিক্ষা নিয়ে সব উত্তম উদ্যোগই ভেস্তে যাওয়ার একটা বড় কারণ হলো ‘ত্রুটিপূর্ণ মূল্যায়ন পদ্ধতি’। বিদ্যমান মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত নম্বর বা কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের বেশি কিছু পাওয়ার জজবাই হারিয়ে ফেলেছে, যার মধ্যে সত্যিকারের ‘এডুকেশন’ গরহাজির।
শিক্ষার্থী, সঙ্গে অভিভাবককূল ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টারে-যেখানে গ্যারান্টিসহকারে অধিক নম্বর হাসিলের ট্রেনিং দেওয়া হয়। কথা হলো, ‘ট্রেনিং’ ও ‘এডুকেশন’ কি এক বিষয়? প্রশিক্ষণ মানুষকে দক্ষ করতে পারে, কিন্তু নৈতিক ও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ উৎপাদন করতে হলে উপযুক্ত শিক্ষার বিকল্প নেই। একথা সত্য, আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা অসংখ্য দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারলেও ভেতরের মানুষটিকে নৈতিক ও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন করতে মোটামুটি ব্যর্থ। আর তাছাড়া কারাই বা অধিক নম্বর প্রাপ্তির ট্রেনিং দিচ্ছে-তার হদিস নেওয়ার তাগিদ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। ফলাফল-স্কুলিং বলতে যা বোঝানো হয়ে থাকে, তার চূড়ান্ত অধঃপতনের নিশানা অনেক আগে থেকেই উড়তে শুরু করেছে! প্রশাসন, ব্যুরোক্রেসি, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্র ঠিক হলেই দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা সমুন্নত হয়ে যাবে-এমন চিন্তা সম্ভবত সঠিক নয়। বরং উপযুক্ত স্কুলিং কায়েম করেই প্রশাসন, ব্যুরোক্রেসি, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্র মেরামত করা সম্ভব। নচেৎ নয়।
তাই সরকারের কাছে উদাত্ত আহ্বান : শিক্ষক নিয়োগ দিন, উপযুক্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করুন; কিন্তু তার আগে সরেজমিন বিদ্যালয়গুলোর হালহকিকত গভীর অভিনিবেশ সহকারে অবলোকন করুন। মাঠপর্যায়ের অবস্থা আমলে আনুন। উপর থেকে ভালো কিছু ঢালবেন, কিন্তু তার আগে পাত্রের ছিদ্র বা ফুটো অনুসন্ধান করবেন না-তা তো হয় না।
খোন্দকার কাওসার আহমেদ : শিক্ষক ও গবেষক
