নিউইয়র্কের চিঠি
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রাখতে ট্রাম্পের প্রলোভন!
Advertisement
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ডোনাল্ড ট্রাম্প
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে করে তুলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালে ট্রাম্প যেসব অঙ্গরাজ্যে খুব সহজে বিজয় নিশ্চিত করেছিলেন, সেসব স্থানে অবস্থান ধরে রাখতে এখন বিপুল ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে হচ্ছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র ছয় সপ্তাহ বাকি; কিন্তু রিপাবলিকানদের জন্য পরিবেশের এতটাই অবনতি ঘটেছে যে, নির্বাচনি লড়াইয়ে তাদের হিসাব-নিকাশ এলোমেলো হয়ে গেছে। ডেমোক্রেটরা এতে বেশ খুশি, কারণ তারা রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্যগুলোকে এর আগে কখনো এতটা অনুকূল ভাবতে পারেনি। তবুও তারা সতর্ক, আমেরিকান নির্বাচনি মানচিত্র কারও ভাবনার চেয়েও জটিল। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে আসার দুই বছরও কাটেনি। কিন্তু এরই মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে তার এবং দলীয়ভাবে রিপাবলিকানদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়ার পেছনে কাজ করেছে তার শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে বেড়ে যাওয়া জ্বালানিসহ ভোগ্যপণ্য এবং জরুরি সেবার উচ্চমূল্য নিয়ে সাধারণভাবে আমেরিকানদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ, যা দেশজুড়ে রিপাবলিকানদের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করছে।
ফেডারেল রিজার্ভ গত সপ্তাহে সুদের হার বৃদ্ধি করায় বাড়ির মর্টগেজ হার, গাড়ির ঋণ, ক্রেডিট কার্ডের ঋণের জন্য সুদহার আরেক ধাপ চাপ সৃষ্টি করেছে ঋণগ্রহীতাদের ওপর। ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের মূল্যে কোনো স্বস্তি আশা না করার জন্য ট্রাম্পের বক্তব্য রিপাবলিকানদের জন্য আরও সংকট সৃষ্টি করেছে।
১৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস এবং সিয়েনা ইউনিভার্সিটির যৌথ জাতীয় জরিপ ফলাফলে দেখা গেছে, ডেমোক্রেটরা কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের চেয়ে প্রায় ৯ শতাংশ পয়েন্টের সুবিধা নিয়ে এগিয়ে আছে। নির্বাচনের মাত্র ৬ সপ্তাহ আগে এটি বড় একটি ব্যবধান, যা ডেমোক্রেটদের জয়লাভের আশাকে প্রবল করেছে।
কংগ্রেসের নিুকক্ষ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের মাইনরিটি লিডার নিউইয়র্কের কংগ্রেসম্যান হাকিম জেফ্রিস বলেছেন, ‘রিপাবলিকানরা আতঙ্কিত এবং হাউজে নিয়ন্ত্রণ হারানোর দ্বারপ্রান্তে। সিনেটেও তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে উভয় দলই হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সিনেটের প্রতিযোগিতাকে এত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে যে, তারা কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইকে এখনো পরিবর্তনশীল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। নির্বাচনি বিজ্ঞাপনে দুদলই পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করছে। তারা বিজ্ঞাপন খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে-নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন অঙ্গরাজ্যগুলো যাতে কোনোভাবে হাতছাড়া হয়ে না যায়।
ডেমোক্রেটদের সুবিধা বেশি, যেসব অঙ্গরাজ্যে তারা আগে কখনো জয়ের ধারেকাছে আসতে পারেনি, ট্রাম্পের জনস্বার্থবিরোধী নীতির কারণে সেই রাজ্যগুলোর দরজা ডেমোক্রেটদের জন্য অনেকটা উন্মুক্ত হয়ে গেছে। ডেমোক্রেট ক্যাম্পেইনের দাবি হচ্ছে, তারা রিপাবলিকানদের দখলে থাকা ৫৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যার মধ্যে কয়েকটি এমন আসনও রয়েছে, যেখানে দুই বছর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০ পয়েন্ট পর্যন্ত ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, মধ্যমেয়াদি নির্বাচনের ঠিক আগে ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে। মুখরক্ষার জন্য তিনি দাবি করেছেন, তেহরান নিয়মিতভাবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খুঁজছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে তা মনে হয় না। নিজ দেশে জনমতের ধাক্কা সামলাতে তিনি গত কয়েক মাস ধরেই যুদ্ধবিরতির কথা বলছেন; কিন্তু বাস্তব কোনো সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে কোনো না কোনো নতুন শর্ত সামনে এনে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছেন।
একদিকে আলোচনার কথা বলা এবং পাশাপাশি ইরানের ওপর ওয়াশিংটনের সামরিক চাপ অব্যাহত থাকায় আলোচনার পরিবেশ কতটা কার্যকর, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে এবং যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে ইরানিদের চেয়েও বেশি সংশয়ের মধ্যে রয়েছেন আমেরিকানরা। ট্রাম্পের কথার ওপর তারা আস্থা রাখতে পারছেন না, যার প্রতিফলন নভেম্বরের মধ্যমেয়াদি নির্বাচনে অবধারিতভাবেই পড়বে। সেজন্য অন্য যে কোনো পক্ষের চেয়ে এ নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কংগ্রেসের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নির্বাচনে যুদ্ধের ব্যয়, জ্বালানির দাম, আমেরিকান সেনাদের নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক নীতির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটলে তা ট্রাম্পের জন্য কিছুটা ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনতে পারে।
কংগ্রেসে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রণ রক্ষার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আর কী করতে পারেন? গত সপ্তাহের শেষদিকে ট্রাম্প টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যমেয়াদি নির্বাচনি কনভেনশনে বক্তৃতা দেওয়ার সময় দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা যদি হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সিনেট ধরে রাখতে পারে, তাহলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে প্রদান করা হবে। বিশ্বের বহু দেশে ভোট বাগানোর জন্য ভোটারদের নগদ অর্থ, বিভিন্ন উপকরণ প্রদান করা নিয়মিত ব্যাপার এবং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি ছাড়াও বস্তুগত প্রার্থী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দলগুলোর অবৈধ আর্থিক লেনদেন অনেকটা খোলামেলা ব্যাপার।
এ ধরনের লেনদেন নির্বাচনের আগেই হয়ে থাকে। যারা জয়লাভ করেন, তারাও ভোটারদের ঘুস দেন, যারা জয়লাভ করেন না, তারাও ঘুস দেন। এটি অলিখিত নিয়মের মতো। অর্থ নিয়ে ভোটার অর্থ প্রদানকারী প্রার্থীকে ভোট দেবে কিনা, সে নিশ্চয়তা না থাকলেও ভোটারের পেছনে অর্থব্যয়, আপ্যায়ন করা নির্বাচনের প্রায় আবশ্যিক অনুষঙ্গ এবং প্রাচ্যদেশে প্রার্থী ও দলের নির্বাচনি ব্যয়ের বিপুল অংশই ব্যয় হয় ভোটার কেনায় ও ভোটারদের আপ্যায়ন করায়।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো এটি উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তার দলকে জেতালে তার দেশের নাগরিকদের মাথাপিছু নগদ ৫ হাজার ডলার হারে প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যেসব দেশে ভোটার কেনাবেচা চলে, সেই দেশগুলোতে নির্বাচনের আগেই অর্থের লেনদেন হয়ে থাকে এবং তা গোপনেই সম্পন্ন হয়। নির্বাচন শেষ, লেনদেনও শেষ। কিন্তু ট্রাম্পের ৫ হাজার ডলার হারে প্রদানের ঘোষণা প্রকাশ্য এবং তার দল হাউজ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বহাল রাখতে পারলেই কেবল অনুরূপ পরিমাণ অর্থ ভোটাররা পাবেন। যেহেতু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব আমেরিকান নাগরিককে এ অর্থ দিতে চেয়েছেন, অতএব কে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীকে ভোট প্রদান করেছে অথবা তার বিপক্ষ দলের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে, তা বিচার করা হবে না। শর্ত একটাই-রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাম্পের ৫ হাজার ডলার প্রদানের প্রস্তাব ভোটারদের ঘুস প্রদান করার মতো শোনালেও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, এটি কোনো ঘুস নয়, এ অর্থ দেওয়া হবে ‘লভ্যাংশ’ হিসাবে, যা তার ভাষায় তার প্রশাসনের ‘অসাধারণ অর্থনৈতিক সাফল্যে’র একটি অংশ।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের ৫ হাজার ডলারের প্রস্তাবকে সরাসরি ‘ঘুস’ না বলে ‘প্রলোভন’ বলছেন। তাদের দৃষ্টিতে দুটিই অনৈতিক এবং আমেরিকান রাজনীতিতে ভোটার পর্যায়ে অর্থের প্রবাহ এ দেশের নির্বাচনি রাজনীতিকে দ্রুত অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যাবে, ট্রাম্পের বক্তব্য সেই আভাসই দিয়েছে।
ট্রাম্পের ভোটার বাগানোর কৌশলের পাশাপাশি এ প্রশ্নও উঠেছে যে, রিপাবলিকানরা যদি হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সিনেটে তাদের নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখে, তাহলে আমেরিকান নাগরিকরা সত্যিই তাদের প্রেসিডেন্টের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫ হাজার ডলার করে অর্থ লাভ করবে কিনা। ‘দ্য বুলওয়ার্ক ডেইলি’র খ্যাতিমান সাংবাদিক ক্যাথেরিন র্যাম্পেল বলেছেন, রিপাবলিকানরা জয়ী হলে আমেরিকানরা আদৌ সেই ৫ হাজার ডলার পাবে কিনা, সে বিষয়েও আমাদের সংশয়ী হওয়া উচিত।
কারণ ট্রাম্প এর আগেও মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা আমেরিকানদের চলতি বছরের জুনে ২ হাজার ডলার হারে প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’ (ডিওজিই) শুল্ক লভ্যাংশ হিসাবে এবং ওবামাকেয়ার ছাড় থেকে। তার এ প্রতিশ্রুতিগুলো ঘুস বা প্রলোভন ছিল না। কিন্তু বাস্তবে কেউ এ অর্থ পায়নি। আমেরিকান সেন্সাস ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৪৫ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক রয়েছেন। প্রত্যেককে ৫ হাজার ডলার করে দিলে প্রয়োজন পড়বে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থ যদি জোগানো সম্ভবও হয়, এজন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে এবং কংগ্রেস যদি অনুমোদন দেয়, তাহলে এ বিপুল অর্থের খেসারত হিসাবে আসবে বাজেট ঘাটতি ও মুদ্রাস্ফীতি। অতএব ধরেই নেওয়া যায়, ট্রাম্পের কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ রাখার সব কৌশল মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৬০-এর দশকের পর যে কোনো সময়ের তুলনায় আমেরিকান গণতন্ত্র বর্তমান সময়ে অনেক বেশি বিপন্ন, বিপর্যস্ত-যার প্রমাণ হিসাবে তারা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধির কথা বলেছেন। একটি শক্তিশালী, মুক্ত সংবাদমাধ্যমের দ্বারা গণতন্ত্র ভালোভাবে সুরক্ষিত হয়। কিন্তু সেই স্বাধীনতা আক্রমণের মুখে পড়লে জনগণের কাছে পূর্ণ সত্য পৌঁছানো নিশ্চিত করা যায় না এবং গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই অবস্থার মধ্যে পড়েছে। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠানোও এখন ঝুঁকিপূর্ণ।
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক
