Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

জ্বালানি তেলের আপৎকালীন মজুত গড়ে তোলা জরুরি

Advertisement

Icon

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বালানি তেলের আপৎকালীন মজুত গড়ে তোলা জরুরি

ফাইল ছবি

Advertisement

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত তীব্রতর হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজার আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ২ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করে যায়। অবশ্য পরবর্তী সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্য কিছুটা হ্রাস পেয়ে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ ও সংঘাত শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ৬০ থেকে ৬৫ ডলারে ওঠানামা করছিল। গত আগস্টের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের গড় মূল্য বেড়েছে ২৫ শতাংশ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ যদি সহসাই না থামে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার অতিক্রম করে যেতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানের ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু করার পর গত এপ্রিলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ১২৬ ডলারে উন্নীত হয়েছিল।

মার্কিন এবং ইসরাইলি বাহিনী ইরানে আক্রমণ শুরু করার পর তাদের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় হরমুজ প্রণালিকে ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা। কৌশলগত কারণে হরমুজ প্রণালি ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিশ্বের যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়, তার অন্তত ২০ শতাংশ বা ২ কোটি ব্যারেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে।

কাজেই হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করা ইরানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আর যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে নিজেদের আধিপত্যে নিয়ে যেতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ যেভাবে দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে, তাতে কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না এ সংঘাত কতদিন চলবে। কাজেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।

উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখা এবং গৃহস্থালির কাজ সম্পন্ন করার জন্য বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলকেই প্রধান ভরসা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কোনো কারণে জ্বালানি তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়ায়। জ্বালানি তেলের গুরুত্ব কতটা তা অনুধাবন করা যায় ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হলে অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর ওপর জ্বালানি তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর। এর ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল নিয়ে হাহাকার শুরু হয়।

ওপেকের এ নিষেধাজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৪ গুণ বা ৩০০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৩ মার্কিন ডলারেরও কম। ১৯৭৪ সালে জানুয়ারি মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১২ ডলারে উন্নীত হয়।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে একে ‘প্রথম তেল সংকট’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। ওপেকের জ্বালানি তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত এ নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় এবং অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। তারপর যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলো আপৎকালীন সংকট মোকাবিলার জন্য অভ্যন্তরীণভাবে জ্বালানি তেলের মজুত গড়ে তোলে। যেসব দেশে তেল উৎপাদিত হয় না, তারা আমদানির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ গড়ে তোলে।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে ভেনিজুয়েলায়। দেশটির মাটির নিচে আনুমানিক ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল মজুত আছে বলে ধারণা করা হয়। এটি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ১৭ শতাংশের মতো। ভেনিজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল মজুত থাকলেও তারা প্রতিদিন মাত্র ৯ থেকে ১০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল উত্তোলন করে। ভেনিজুয়েলার জ্বালানি তেল অত্যন্ত ভারী ও ঘন। এ ধরনের জ্বালানি তেল উত্তোলনের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ও প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়, তা দেশটির নেই। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনিজুয়েলা তাদের জ্বালানি তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়।

যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বিশ্বের সর্বাধিক জ্বালানি তেল উত্তোলনকারী দেশ। দেশটি প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৩২ লাখ ব্যারেল থেকে ১ কোটি ৩৫ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল উত্তোলন করে থাকে। সৌদি আরব প্রতিদিন গড়ে ৯৫ লাখ ব্যারেল থেকে ১ কোটি ১ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল উত্তোলন করে থাকে। রাশিয়া প্রতিদিন ৯৫ লাখ ব্যারেল থেকে ১ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল উত্তোলন করে। অন্যদিকে কানাডা, ইরাক প্রতিদিন যথাক্রমে ৫২ লাখ ব্যারেল এবং ৪৪ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল উত্তোলন করে থাকে।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহার হয় যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটি প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৯০ লাখ থেকে ২ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল ব্যবহার করে থাকে। বিশ্বে প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ। পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল উত্তোলন করা সত্ত্বেও প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়।

নিজস্ব সূত্র থেকে আহরিত ও আমদানিকৃত জ্বালানি তেল প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে দেশটি তার সার্বিক চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত তেল বিদেশে রপ্তানি করে থাকে। মার্কিন বৈদেশিক নীতিতে জ্বালানি তেলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সৃষ্টি এবং তা গভীরতর করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি তেলকে বিশেষ বিবেচনায় রাখে। এ বছরের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, ভেনিজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্যই দেশটির প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করা হয়েছে।

জ্বালানি তেল শুধু বিশ্ব অর্থনীতিকেই নিয়ন্ত্রণ করছে তা নয়; আরও নানা কারণে জ্বালানি তেলের গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বে এখনো এমন কোনো জ্বালানি আবিষ্কৃত হয়নি, যা সরাসরি জ্বালানি তেলের বিকল্প হিসাবে অবদান রাখতে পারে। কাজেই এ মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতি এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রাখার জন্য জ্বালানি তেলের শক্তিশালী মজুত গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। নিজস্ব উৎস থেকে জ্বালানি তেল আহরণ করে নিরাপদ মজুত গড়ে তোলাটাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত।

কিন্তু সব দেশ চাইলেই তাদের নিজস্ব সূত্র থেকে আহরিত জ্বালানি তেল দিয়ে নিরাপদ মজুত গড়ে তুলতে পারবে না। কারণ খুব কম দেশই আছে, যাদের ভূগর্ভে পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল সংরক্ষিত আছে। যেসব দেশের ভূগর্ভে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের উপস্থিতি রয়েছে, তারা নিশ্চিতভাবেই সৌভাগ্যবান দেশ।

আমরা যদি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বিবেচনা করি তাহলে দেখব, বাংলাদেশ প্রাকৃতিক গ্যাসসম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ; কিন্তু জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পরনির্ভর। বাংলাদেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরলের উৎপাদন অতি সামান্য। চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হয়। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন মাত্র ৩ হাজার ব্যারেল এবং পেট্রোলিয়াম উপজাত হিসাবে পাওয়া অপরিশোধিত তরলসহ মোট ৯ হাজার থেকে সাড়ে ৯ হাজার ব্যারেল জ্বালানি তেল আহরণ করা সম্ভব।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের দৈনিক চাহিদা হচ্ছে ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল বা বছরে এ চাহিদার পরিমাণ ৭০ থেকে ৭৪ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে উত্তোলিত জ্বালানি তেল দ্বারা মোট চাহিদার মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ শতাংশ মেটানো সম্ভব। অবশিষ্ট ৯৬-৯৭ শতাংশ জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটানো হয় আমদানির মাধ্যমে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করে, তার মধ্যে প্রায় ৭৬ শতাংশই সরাসরি ব্যবহারযোগ্য। অবশিষ্ট ২৪ শতাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, যা স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের পর ব্যবহার করা হয়।

সরকার গ্যাস সংকট মেটানোর জন্য নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনসহ ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে চিহ্নিত সমুদ্রসীমায় ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ২০১২ সালের ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালের ৭ জুলাই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা চিহ্নিত হয়।

মিয়ানমার তার সমুদ্রসীমায় ৪টি গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছে। সেখান থেকে তারা বিপুল পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করে তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার ও রপ্তানি করছে। প্রতিদিন এসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। সম্প্রতি তারা আরও ৪টি গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছে। সব মিলিয়ে দেশটি বঙ্গোপসাগরের মিয়ানমার অংশে ৮ থেকে ১০টি বড় অনুসন্ধান কূপ ও ফিল্ড আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ভারত সব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরে তার নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২৫টিরও বেশি তেল-গ্যাসক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে এবং বেশকিছু ক্ষেত্রে থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস ও তেল আহরণ করছে।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেল পাওয়া যায় না বললেই চলে। গ্যাসক্ষেত্রের উপজাত হিসাবে যে সামান্য পরিমাণ জ্বালানি তেল পাওয়া যায়, তা দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। আগামীতে সমুদ্রসীমানায় ও স্থলভাগে গ্যাস ও জ্বালানি তেল অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণভাবে জ্বালানি তেলের কয়েকটি নতুন সংরক্ষণাগার তৈরি করে তাতে জ্বালানি তেল আমদানি করে আপৎকালীন মজুত গড়ে তোলা যেতে পারে।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : অর্থনীতিবিদ, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা

অনুলিখন : এম এ খালেক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম