দারিদ্র্য ও অনুন্নয়নের অদৃশ্য মাত্রা
Advertisement
সুমন জিহাদী
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৯৪৯ সালের দিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান তার এক বক্তব্যে দারিদ্র্যের পরিবর্তে ‘অনুন্নয়ন’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং সেই থেকে পৃথিবী দারিদ্র্য বিমোচনের পরিবর্তে উন্নয়নের প্রতি বেশি মনোযোগী হয় বলে মেক্সিকোর অর্থনীতিবিদ গুস্তাভো এস্তেভা ১৯৯২ সালে তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলো সেসময় ঠিক কোন কারণে এলডিসি বা ‘লিস্ট ডেভেলপ্ট কান্ট্রি’ হিসাবে পরিচিতি পেতে শুরু করে, তারও একটি ইঙ্গিত এখানে পাওয়া যায়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দারিদ্র্যকে সঠিকভাবে না বুঝে উন্নয়নের জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠার কারণে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। দারিদ্র্য নিয়ে এত বেশি কাজ, এত বেশি গবেষণা হওয়ার পরও কেন দারিদ্র্য বিমোচন হয়নি এ প্রশ্নে যাচ্ছি না; বরং এখনো দারিদ্র্যকে সঠিকভাবে চিত্রায়িত করার কাজটিও সম্পন্ন হয়নি। খুব সম্ভবত পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত নানা রূপে, নানা বর্ণে দারিদ্র্য রয়ে যাবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দারিদ্র্য দূর করতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, দারিদ্র্য আমাদের চারপাশে প্রবলভাবে রয়েছে। কিছু দারিদ্র্য দূর থেকে দেখলেই ধারণা পাওয়া যায়, তীব্রতা অনুমান করা যায়। যেমন বাংলাদেশ, মিয়ানমার, নেপাল বা নাইজেরিয়া। এ দেশগুলোর জন্য আমি সচেতনভাবেই ট্রুম্যানের ‘অনুন্নত’ শব্দটি ব্যবহার করতে চাই না। কিছু দারিদ্র্য দূর থেকে বোঝা যায় না, কাছে যেতে হয়; সিস্টেমের মধ্যে বসবাস করার একপর্যায়ে সে দারিদ্র্য দৃশ্যমান হয়। যেমন ব্রাজিল বা তুরস্ক। অনেকে থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামকে এ কাতারে ফেলতে চান। এ দেশগুলোর রাজধানী, অবকাঠামো ও পর্যটন এমনভাবে সজ্জিত থাকে যে এর আড়ালের দুর্দশা আপাতভাবে অদৃশ্য থাকে। সুতরাং দারিদ্র্যের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সব প্রবাহের ভিন্ন ভিন্ন রূপকে সন্ধান করতে হবে আমাদের।
দারিদ্র্যকে বহুমস্তকবিশিষ্ট দশানন মনে করলে ভুল হবে না। এর অনেক মাথা, অনেক মুখচ্ছবি বা চেহারা। কিন্তু অবাকভাবে শুধু আর্থিক দারিদ্র্যকেই আয়নার সামনে নিয়ে আসা হয়, তার চেহারার ওপর কাটাছেঁড়া হয়। কিন্তু অন্য চেহারাগুলো আড়ালে থেকে যাওয়ার কারণে পৃথিবীব্যাপী অনেক দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্যোগ সফল হয়নি; ভণ্ডুল হয়ে গেছে হাজার হাজার উন্নয়ন প্রকল্প। আপাতভাবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নেওয়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো সফল হলেও তা কার্যকরভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করতে পারে না। এমনকি ক্ষুদ্রঋণের যে তাত্ত্বিক কাঠামো, সেটিও দারিদ্র্যের বহুমুখিতা নিয়ে আলোচনা করে না। আর্থিক দারিদ্র্যের মধ্যে ক্ষুদ্র অনেক ভাগ থাকতে পারে, যেমন সম্পদের দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের দারিদ্র্য, বিনিয়োগের দারিদ্র্য। আর্থিক দারিদ্র্যকে অধিক গুরুত্ব দেওয়াতে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র, সম্পদের বণ্টন তত্ত্ব, সুযোগ ব্যয় তত্ত্ব ও ক্ষুদ্রঋণ তত্ত্বের মতো নানা তত্ত্বের জন্ম হয়েছে। আর্থিক দারিদ্র্য হ্রাস করার পেছনে এ ধারণাগুলোর বাস্তব প্রয়োগের অবদান গুরুত্বপূর্ণ বটে। কিন্তু একজন কম আয়ের মানুষকে আরও কাছে থেকে দেখার সুযোগ আছে; একটি দরিদ্র দেশকে আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। ব্যক্তির ক্ষেত্রে-তার শিক্ষা কম থাকতে পারে, দক্ষতার অভাব থাকতে পারে, থাকতে পারে সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতা অথবা অপরাধপ্রবণতাও প্রবল হতে পারে। তার হাতে ক্ষুদ্রঋণের কিছু টাকা বা সামাজিক নিরাপত্তার ভাতা প্রদান করে সত্যিকারের দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয় বলেই মনে করি। অনেকেই দ্বিমত করতে পারেন যে, শিক্ষা-সংস্কৃতি বা সুশাসন নিয়ে কি কোনো সরকার কাজ করছে না? করছে। কিন্তু সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ ছিল না। একজন মানুষ, যার মূল্যবোধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতার প্রবল ঘাটতি থাকার পরও শুধু আর্থিক সাহায্য বা ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে প্রদত্ত ছাগল পালনের ব্যবস্থার কারণে তার দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে বলে আলোচনা করা হয়, তখন সেটি সঠিক নয় বলে মনে করি। সরকারি বা বেসরকারি লোকেরা তা করলেও তত বড় ভুল হয় না, একজন গবেষক বা একজন জ্ঞানহিতৈষী সেটি করলে যে ভুলটি হয়।
সংস্কৃতি বলতে নানা উপকরণ বোঝায়, যেমন গান, বাজনা, চলচ্চিত্র, ভাষা, ধর্ম বা বৈচিত্র্যপূর্ণ নাগরিক পরিচিতি। এ বৈচিত্র্যই যেমন আমাদের শক্তি, তেমন এ বৈচিত্র্যই আমাদের যত বিভেদের কারণ। বৈচিত্র্যের আরেক নাম ভিন্নতা। এ বৈচিত্র্যের কারণেই ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান আলাদা হয়েছে, এ বৈচিত্র্যের কারণেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তান আলাদা হয়েছে। এ সীমানা বিভাগের কারণে নদী-সাগর, পাহাড়-খনিজের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ ভাগ হয়ে গেছে দেশে দেশে। এ কারণে ভিন্নতার অর্থনৈতিক মূল্য আছে। এটি মুদ্রা ও আর্থিক লেনদেনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কবি কবিতা লিখবে, শিল্পী ছবি আঁকবে, অভিনয় করবে; বাদক বাজাবে বাজনা। এগুলোর প্রত্যেকটিরই আর্থিক মূল্যের পাশাপাশি সামাজিক মূল্য আছে। একটি সমাজে যদি কর্মস্পৃহা কমে, সাংস্কৃতিক পেশা ও ব্যবসা হ্রাস পায়, তাহলে এর তরঙ্গ পুরো অর্থব্যবস্থায় আঘাত করতে পারে। সাংস্কৃতিক চর্চা মানুষের অপরাধপ্রবণতা কমায়, সমাজকে স্থিতিশীলতা দেয়। সুতরাং সুন্দর সংস্কৃতি মানুষকে সহমর্মী ও সহনশীল করে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সহায়ক। একইভাবে শিক্ষা মানুষকে উদ্ভাবন করতে উৎসাহিত করে, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে এবং করে তোলে উৎপাদনমুখী। একজন অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষকে দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসা হলে তার এসব দারিদ্র্যকেও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কিন্তু প্রায়োগিক পর্যায়ে তা একটু জটিল, তবে অসম্ভব নয়। তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করা যায় এবং তা জরুরি। সেটির প্রায়োগিক কাঠামো নিয়ে সরকার বা বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করতে পারে। একজন গ্রাহক ব্যাংক ঋণ নেওয়ার পর ব্যবসা শুরু করতে হলে সরকারি অফিস থেকে নানা ধরনের লাইসেন্স ও কাগজপত্র দরকার হয়। তার কাছে সেই সেবা সঠিক মূল্যে ও মানসম্মতভাবে সরবরাহ করতে না পারলে সেটি শাসনতান্ত্রিক দারিদ্র্য। তার দোকানে চাঁদাবাজি হলে বা লুটপাট হলে তিনি বিচারপ্রার্থী হবেন। সে বিচার না পেলে সে রাষ্ট্র বিচারিকভাবে দরিদ্র। ধর্মে যদি তিনি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ অথবা খ্রিষ্টান হন, তার সামাজিক ও ব্যবসায়িক জীবন যদি ধর্মের কারণে উপেক্ষিত বা শোষিত হয়, তাহলে সে সমাজ সাংস্কৃতিকভাবে দরিদ্র এবং তিনিও সংক্রামকভাবে সে দারিদ্র্য লালন করবেন।
উন্নয়নের সংজ্ঞায় যখন জীবনধারণের মান বা হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স পরিমাপ করা হচ্ছে, দারিদ্র্য বিমোচনে সে সূচকের আলোচনা ততটা প্রবল নয়। আবার যাপিত জীবনের মান তো সব ক্ষেত্রে নাগরিকের ওপর নির্ভর করছে না। অর্থনীতিবিদ রেগনার নার্কসের দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের মতো অশিক্ষারও তো এমন দুষ্টচক্র থাকতে পারে। অল্প শিক্ষা, অল্প দক্ষতা, অল্প সুযোগ, অল্প সম্পৃক্ততা এবং পরিশেষে আবারও অশিক্ষা ও জীবনের সুযোগ ব্যয়। এমনকি এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম প্রবাহিত হতে পারে জ্যামিতিক হারে। একজন দরিদ্র মানুষের অর্থকষ্টের কারণে সে এ দুষ্টচক্র ভাঙতে পারছে না। এ কারণে তার গ্র্যান্ট বা মাইক্রোক্রেডিট প্রয়োজন হয়, যার মাধ্যমে সে একটি বিগ পুশ করতে পারে। সেই গ্র্যান্ট বা মাইক্রোক্রেডিট হলো বাহ্যিক হস্তক্ষেপ, যেটি দরিদ্র ব্যক্তি নিজে করতে পারে না; অন্য কারও সাহায্য প্রয়োজন হয়। এবারে অর্থচিন্তার বাইরে থেকে দেখা যাক। একজন অসুস্থ মানুষের উৎপাদনশীলতা স্বাভাবিকভাবেই কম হবে। তাকে বিগ পুশ কীভাবে দেওয়া যাবে? দেশের স্বাস্থ্যখাত যদি তাকে বাহ্যিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সুস্থ না করে, সেক্ষেত্রে সেই কম উৎপাদনশীলতা থেকেই যাবে এবং এ দায় তার একার থাকে না। সমাজ ও রাষ্ট্র তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। দারিদ্র্য বিমোচন কখনোই উন্নয়নের বাই-প্রোডাক্ট হতে পারে না। দুটোর জন্য আলাদা আলাদা নীতি ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। দারিদ্র্য পরিমাপ করছে জাতীয়-আন্তর্জাতিক সব সংস্থা, সংজ্ঞা-সূচক সব তাদের, কিন্তু দায়ের ভাষা নির্দেশ করছে দরিদ্র ব্যক্তিকে। এটিই বর্তমান তাত্ত্বিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, যা রাষ্ট্রকে নাগরিকের দারিদ্র্যের দায় থেকে অব্যাহতি দিচ্ছে।
সুমন জিহাদী : পিএইচডি ফেলো, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, থাইল্যান্ড
