Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা

Advertisement

Icon

মোদাসসের হোসেন খান

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা

Advertisement

বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। ক্ষমতায় আসার আগে তিনি মেধা, যোগ্যতা, সততা, সুশাসন ও জবাবদিহির ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার অঙ্গীকার করেছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে তারেক রহমানের সরকার অঙ্গীকার পূরণ করার মতো আস্থা সৃষ্টি করতে পেরেছে। তবে সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, পদায়ন ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে নিয়োগ যথাযথ হয়েছে কিনা কিংবা তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা, অতীত ভূমিকা ও নিরপেক্ষতা যথার্থভাবে যাচাই করা হয়েছে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধা ও যোগ্যতা প্রধান বিবেচ্য কিনা সে প্রশ্ন যাতে উঠতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

নিয়োগে গুরুত্ব দিতে হবে মেধাকেই : কোনো ব্যক্তির দীর্ঘ বিদেশবাস নিজে অযোগ্যতা বা দেশপ্রেমের ঘাটতির প্রমাণ নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগের ক্ষেত্রে তার দক্ষতা, সততা, সাহস, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জনগণের আস্থা অবশ্যই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ কোনো ব্যক্তিগত আস্থা, কৃতজ্ঞতা বা আনুগত্যের পুরস্কার হতে পারে না। কারণ এসব পদ জনগণের আমানত। যদি জনমনে এমন ধারণা জন্মায়, যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য বেশি মূল্য পাচ্ছে, তবে তা সরকারের ভাবমূর্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতাকেও দুর্বল করে।

জনগণের কথা কি সরকারপ্রধানের কাছে পৌঁছাচ্ছে? : জনমনে আজ আরেকটি বড় প্রশ্ন-প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে এমন কোনো প্রভাববলয় রয়েছে কিনা, যা জনগণের প্রকৃত ক্ষোভ, প্রত্যাশা ও বাস্তব পরিস্থিতিকে তার কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করছে? প্রতিবেশী ভারতসহ কোনো বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে যদি জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তবে তা কার্যকর সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই দূর করতে হবে। দেশে ফেরার আগে তারেক রহমান বলেছিলেন-‘দেশে আসার বিষয়টি শুধু আমার ওপর নির্ভর করে না।’ বক্তব্যটি সে সময়ের বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেওয়া হয়েছিল। তবু আজ কেউ যদি প্রশ্ন করেন-রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও কি তার স্বাধীন সিদ্ধান্তের পথে কোনো অদৃশ্য বাধা রয়েছে-সেই প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই দিতে হবে।

ভালো উদ্যোগ আছে, কিন্তু সেটিই যথেষ্ট নয় : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদিচ্ছা সম্পর্কে বহু মানুষের এখনো আস্থা রয়েছে। তার মার্জিত আচরণ, সংযত ভাষা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার প্রশংসিত হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান, ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা এবং চীন ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগও ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু শুধু সুন্দর বাচনভঙ্গি, মার্জিত আচরণ কিংবা কয়েকটি জনপ্রিয় নির্বাহী সিদ্ধান্ত দিয়ে সমস্যা-জর্জরিত বাংলাদেশকে কল্যাণকর রাষ্ট্রে রূপান্তর করা যায় না। সুশাসনের প্রকৃত পরীক্ষা তখনই, যখন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধেও আইন সমানভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে সততা ও যোগ্যতা পুরস্কৃত হয়।

১৯৭১ ও ২০২৪-এর আত্মত্যাগের মূল শিক্ষা : ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও উভয়ের অন্তরে ছিল মানুষের অধিকার, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। এ দেশের মানুষ বারবার রক্ত দিয়েছে, যাতে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, পরিবার, দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তিতে পরিণত না হয়। তাই দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতাবানদের দায়মুক্তি যদি আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মে পরিণত হয়, তবে অতীতের আত্মত্যাগের মূল শিক্ষাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

নিজের দল থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু হোক : প্রধানমন্ত্রী, ব্যক্তিগত আনুগত্য ও দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠুন। নিজ দলের কেউ দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারি বা ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধেও একই কঠোরতা দেখান। আইনের চোখে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের অপরাধীর মধ্যে পার্থক্য থাকা উচিত নয়। দলের ভেতরে ও বাইরে সৎ, যোগ্য, সাহসী ও দেশপ্রেমিক মানুষের অভাব নেই। তাদের সামনে আনুন। তোষামোদকারী, সুযোগসন্ধানী ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদের প্রভাববলয় থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন।

দেশের মানুষের ভাগ্য নির্ধারণের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র স্থান মহান সংসদের আপনার দলের বেশিরভাগ সদস্যদের যখন ঋণখেলাপি বলে অভিযুক্ত হয় এবং তাদের শিক্ষাগত্য যোগ্যতা যখন উচ্চমাধ্যমিক স্তরের নিচে বলে জানা যায়, তখন তাদের ওপর জনগণের আস্থা জায়গাটি নড়বড় হয়ে পড়ে। আপনার পিতা, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বহুল উদ্ধৃত বাণী-‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।’ এই নীতিকে শুধু স্লোগান নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব ভিত্তিতে পরিণত করুন।

কাকিস্টোক্রেসি নয়, মেরিটোক্রেসি চাই : বাংলাদেশের প্রয়োজন অযোগ্যদের শাসন-Kakistocracy নয়; প্রয়োজন Meritocracy-মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার শাসন। প্রয়োজন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব-Oligarchy নয়; প্রয়োজন প্রকৃত Democracy, অর্থাৎ জনগণের শাসন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদেরই দায়িত্ব দিন, যারা সৎ, দক্ষ, সাহসী এবং দেশের স্বার্থকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে সক্ষম। সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় না বসালে ভালো নীতিও ব্যর্থ হয়।

সময় থাকতে দেওয়ালের লিখন পড়ুন : একজন সরকারপ্রধানের সফলতার কৃতিত্ব যেমন তার, ব্যর্থতার দায়ও শেষ পর্যন্ত তাকেই বহন করতে হয়। মন্ত্রী, উপদেষ্টা কিংবা আমলার ব্যর্থতার আড়ালে একজন প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন নিজেকে আড়াল করতে পারেন না। ইতিহাস সরকারপ্রধানকেই তার সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিচার করে। তাই সময় থাকতে জনগণের ভাষা বুঝুন, তাদের ক্ষোভকে গুরুত্ব দিন এবং দেওয়ালের লিখন পড়ুন। বাংলাদেশের হাতে ভুল মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সময় আর নেই।

শেষ আবেদন-সঠিক স্থানে সঠিক মানুষ : প্রধানমন্ত্রী, সঠিক স্থানে সঠিক মানুষকে সঠিক দায়িত্ব দিন। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে আপসহীন হোন। মেধা, যোগ্যতা, সততা ও দেশপ্রেমকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান ভিত্তি করুন। আপনার পিতা-মাতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং জনগণের কাছে দেওয়া আপনার অঙ্গীকারকে বাস্তব রূপ দিন। এ দেশের মানুষ বারবার রক্ত দিয়েছে। আর যেন তাদের রক্ত দিতে না হয়। তারা অলৌকিক কিছু চায় না-চায় একটি স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত, মেধানির্ভর এবং সত্যিকার অর্থে জনগণের বাংলাদেশ।

লে. কর্নেল মোদাসসের হোসেন খান (অব.) বীর প্রতীক : বীর মুক্তিযোদ্ধা; সামরিক, নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম