ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দিয়ে বাংলাদেশ কী পেল
Advertisement
মহিউদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুগে যুগে শক্তির কেন্দ্র বদলেছে। কখনো রোমের প্রাসাদে, কখনো লন্ডনের কুয়াশায়, কখনো ওয়াশিংটনের নীল আকাশে। পৃথিবীর মানচিত্রও তো স্থির নয়। তার নদী যেমন পথ বদলায়, তেমনি বদলায় শক্তির স্রোতও। সেই স্রোতের নতুন বাঁকেই জন্ম নিয়েছে ব্রিকস (BRICS), এক বহুজাতিক সমবেত সংগীত, যেখানে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎকে নতুন করে রচনা করতে চায়।
এই জোটের নাম পাঁচটি সদস্য রাষ্ট্রের ইংরেজি আদ্যক্ষর দিয়ে তৈরি-ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না, সাউথ আফ্রিকা। পাঁচটি দেশের পাঁচটি ভিন্ন সুর, পাঁচটি ভিন্ন রং, পাঁচটি ভিন্ন ইতিহাস। একেকটি দেশের পেছনে আছে সংগ্রাম, আছে উত্থান-পতনের কাহিনি, আছে মানুষের ঘাম ও স্বপ্নের দীর্ঘ পথচলা। সেই পথচলার মিলনবিন্দুতে দাঁড়িয়ে ব্রিকস যেন এক নতুন দিগন্তের আহ্বান।
লাতিন আমেরিকার সবুজ অরণ্য, কফির সুবাস, ফুটবলের উচ্ছ্বাস-ব্রাজিল যেন প্রাণের দেশ। তার অর্থনীতি কৃষি, শিল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদের শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। ব্রিকসে ব্রাজিল হলো দক্ষিণের উর্বর মাটির প্রতীক। রাশিয়া বরফে ঢাকা বিস্তীর্ণ ভূমি, শক্তিশালী জ্বালানি সম্পদ, দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস-রাশিয়া হলো শক্তির প্রতীক। তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ব্রিকসকে দেয় এক গভীর কৌশলগত মাত্রা। ভারত প্রাচীন সভ্যতার আলো, গণতন্ত্রের দীর্ঘ পথচলা, প্রযুক্তির দ্রুত উত্থান-ভারত হলো মানবশক্তির প্রতীক। তার জনসংখ্যা, তার বাজার, তার উদ্ভাবন ব্রিকসকে দেয় এক বিশাল সম্ভাবনা। চীন বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনশীল শক্তি, দ্রুত উন্নয়ন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্র-চীন হলো আধুনিক অর্থনীতির প্রতীক। তার উপস্থিতি ব্রিকসকে দেয় এক মহাশক্তির পরিসর। দক্ষিণ আফ্রিকার আছে দীর্ঘদিনের ইতিহাস, সংগ্রাম, বৈচিত্র্য-দক্ষিণ আফ্রিকা হলো গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর। তার যোগদান ব্রিকসকে করে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক। এই পাঁচ সুর মিলেই তৈরি হয় এক সমবেত সংগীত-যেখানে প্রতিটি দেশের স্বর আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য এক।
দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর অর্থনৈতিক আকাশে পশ্চিমা শক্তির নক্ষত্রই সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল। তাদের ব্যাংক, তাদের মুদ্রা, তাদের নীতি-সবকিছুই যেন এক অদৃশ্য জাল বুনে রেখেছিল বিশ্বের ওপর। কিন্তু সময়ের স্রোত থেমে থাকে না। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। তাদের জনসংখ্যা, তাদের বাজার, তাদের শ্রম-সব মিলিয়ে তারা আজ এক বিশাল শক্তি। ব্রিকস সেই শক্তিরই সংগঠিত রূপ। এ যেন গ্লোবাল সাউথের দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে উঠে আসা এক নতুন কণ্ঠস্বর।
ব্রিকসের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি অর্থনীতির ক্ষেত্রে। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ এ জোটের দেশগুলোতে বাস করে। তাদের সম্মিলিত জাতীয় আয় বা জিডিপি আজ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেয়।
এই জোটের লক্ষ্য শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়-বরং অর্থনীতির ব্যাকরণই বদলে দেওয়া। যেখানে ডলার একচ্ছত্র রাজত্ব করে এসেছে, সেখানে ব্রিকস চায় বহু মুদ্রার বিশ্বব্যবস্থা। তাদের ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ যেন এক নতুন নদী-যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো পশ্চিমা শর্তের কঠিন পাথরে ধাক্কা না খেয়ে নিজেদের স্বপ্নের নৌকা ভাসাতে পারে।
ব্রিকস শুধু অর্থনৈতিক জোট নয়; এটি রাজনৈতিকও। বিশ্বের সংঘাত, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা-সবকিছুর মাঝে তারা সংলাপের পথ খোঁজে। তারা চায় এক মাল্টিপোলার বিশ্ব, যেখানে কোনো একক শক্তি নয়, বরং বহু শক্তির সমবেত সুরে পৃথিবী এগিয়ে যাবে।
দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো বিশ্বমঞ্চে প্রান্তিক হয়ে ছিল। তাদের সম্পদ ছিল, শ্রম ছিল, স্বপ্ন ছিল-কিন্তু কণ্ঠস্বর ছিল ক্ষীণ। ব্রিকস সেই কণ্ঠস্বরকে জোরালো করে তুলেছে। এ যেন বহুদিনের নীরবতার পর এক সমবেত গান-যেখানে প্রতিটি দেশ বলে ওঠে : আমরাও আছি, আমরাও পারি, আমরাও বিশ্বকে গড়তে চাই।
ব্রিকসের পথ সহজ নয়। রাজনৈতিক মতভেদ আছে, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা আছে, ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন আছে। তবু ইতিহাস বলে-যে স্বপ্ন মানুষের, যে স্বপ্ন সময়ের, তাকে থামানো যায় না। ব্রিকস সেই স্বপ্নেরই নাম। এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন-যেখানে শক্তির কেন্দ্র বদলায়, কিন্তু মানুষের আশা বদলায় না। যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো আর প্রান্তিক নয়, বরং ভবিষ্যতের নির্মাতা।
ব্রিকস কোনো একক দেশের নয়-এটি বহু দেশের সম্মিলিত যাত্রা। যাত্রা সেই পৃথিবীর দিকে, যেখানে সমতা থাকবে, সহযোগিতা থাকবে, এবং থাকবে মানুষের স্বপ্নের অবাধ উড়ান। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন-‘মানুষের ওপর মানুষের অধিকার নয়, মানুষের ওপর মানুষের কর্তব্যই শেষ কথা। ব্রিকস সেই কর্তব্যেরই এক আধুনিক রূপ-এক নতুন মানবিক বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহসী পদক্ষেপ।
বিশ্বরাজনীতির আকাশে যখন নতুন নক্ষত্রের জন্ম হয়, তখন ছোট দেশগুলোর সিদ্ধান্তও যেন একেকটি কবিতার মতো-অন্তর্গত সুরে ভরা, দ্বিধা-দোলাচলে আচ্ছন্ন, কিন্তু ভবিষ্যতের দিকে তাকানো। ব্রিকসের সম্প্রসারণ সেই নক্ষত্রেরই মতো-উদীয়মান শক্তির সমবেত আলো। সেই আলোয় বাংলাদেশ যোগ দিল না। যোগ না দেওয়ার এ সিদ্ধান্ত যেন নদীর ধারে দাঁড়িয়ে দূরের বজ্রালোক দেখা-আলোও আছে, আশঙ্কাও আছে। বাংলাদেশের এ অনুপস্থিতি-লাভও বয়ে আনে, ক্ষতিও। কিন্তু লাভ-ক্ষতির হিসাব শুধু সংখ্যায় নয়; তা সময়ের স্রোতে, ভূ-রাজনীতির ঢেউয়ে, এবং জাতির ভবিষ্যৎ স্বপ্নে লুকিয়ে থাকে।
বাংলাদেশের যোগ দেওয়া-না দেওয়া নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে। বাংলাদেশের নেতা দাওয়াত পেয়েছিলেন আরেকটি আঞ্চলিক সংস্থা ‘বিমসটেকে’র সভাপতি হিসাবে। দাওয়াতটি ছিল ব্রিকস নামের একটি জোটের সম্মেলনে, কোনো দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে নয়। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়। তবে বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে আদৌ আগ্রহী কিনা, সেটি নির্ভর করে ব্রিকসে বাংলাদেশে তার স্বার্থ কতটুকু খুঁজে পাবে তার ওপর। সম্মেলন হয়েছে ব্রিকসের অন্যতম সদস্য দেশ ভারতে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। এ সম্মেলনে যোগ দিলে ভারতের কাছে দাসখত লিখে দেওয়া হবে আর না গেলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব শিখরে উঠে যাবে, এ ধরনের একটা মাতম জন-আলোচনায় এবং গণমাধ্যমে লক্ষ করা গেছে। ব্যাপারটা ‘ইগো’র নয়, প্রয়োজনের, স্বার্থের। যে কারণেই হোক, বাংলাদেশ এ সম্মেলনে যোগ দেয়নি।
ক্ষতির দিক হলো, একটি সুযোগ হাতছাড়া হলো। গ্লোবাল সাউথের সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশ অনুপস্থিতি থকল। আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সেখানে নিজেদের স্বরকে জোরালো করছে। বাংলাদেশ সেই সমবেত সুরে যোগ দিল না। যেন এক গানের আসরে আমন্ত্রণ পেয়েও দূর থেকে শোনা। এ অনুপস্থিতি বাংলাদেশের কণ্ঠকে কিছুটা ক্ষীণ করে দেয় আন্তর্জাতিক আলোচনায়।
ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক নতুন নদী। ঋণের শর্ত কম, রাজনৈতিক চাপ কম, এবং সহযোগিতার পরিসর বড়। বাংলাদেশ সেই নদীর তীরে দাঁড়ালেও পানিতে নামল না। এ যেন বৃষ্টির দিনে জানালা খুলে রাখা-বাতাস পাওয়া গেল, কিন্তু ভিজে নেওয়া হলো না।
বিশ্বব্যবস্থায় ডলারনির্ভরতা কমানোর যে প্রচেষ্টা ব্রিকস করছে, বাংলাদেশ সেই প্রচেষ্টার অংশ হলো না। যদিও বাংলাদেশ ডলারের চাপে বহুবার সংকটে পড়েছে, তবু বিকল্প মুদ্রার পথটি এখনো দূরের আলোই রয়ে গেল।
চীন ও ভারতের মতো এশিয়ার দুই মহাশক্তি ব্রিকসের কেন্দ্র। বাংলাদেশ তাদের দুজনের সঙ্গেই রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘনিষ্ঠ। এ জোটে যোগ না দেওয়া মানে দুই বন্ধুর আড্ডায় তৃতীয়জনের নীরবতা।
লাভ কী হলো? বাংলাদেশ পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখল। ব্রিকসে যোগ দেওয়া মানে এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো পশ্চিমা বাজার, রেমিট্যান্স এবং উন্নয়ন সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। ব্রিকসে যোগ দিলে সেই সম্পর্কের ওপর ছায়া পড়তে পারত। যোগ না দেওয়া মানে-বাংলাদেশ নিজের কূটনৈতিক নৌকাকে মাঝ নদীতে স্থির রাখল, কোনো এক তীরের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকল না।
ব্রিকস শুধু নাম নয়; এটি দায়িত্বও। অর্থনৈতিক কাঠামো, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য নীতি-সবকিছুতে প্রস্তুতি লাগে। বাংলাদেশ এখনো সেই প্রস্তুতির পথে হাঁটছে। যোগ না দেওয়া মানে-অপ্রস্তুত অবস্থায় বড় মঞ্চে ওঠার ঝুঁকি এড়ানো।
ভারত ব্রিকসের সদস্য, চীনও সদস্য। বাংলাদেশ তাদের দুজনেরই ঘনিষ্ঠ। কিন্তু দুজনের সম্পর্ক সবসময় মসৃণ নয়। বাংলাদেশ যোগ দিলে এক পক্ষের কাছে তা সুবিধাজনক মনে হলেও অন্য পক্ষের কাছে তা কৌশলগত সংকেত হয়ে উঠতে পারত। যোগ না দেওয়া মানে-বাংলাদেশ নিজের আঞ্চলিক কূটনীতিকে নিরপেক্ষ রাখল।
ব্রিকস এখনো পরিবর্তনের পথে-নতুন সদস্য যোগ হচ্ছে, নীতি বদলাচ্ছে, কাঠামো বিস্তৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ সময় নিয়ে দেখছে-কোন পথে এই নদী বয়ে যায়। এটি এক ধরনের কৌশলগত ধৈর্য-যেমন কৃষক বীজ বোনার আগে আকাশের দিকে তাকায়।
ব্রিকসে যোগ না দেওয়া কোনো ভয় নয়, কোনো দ্বিধা নয়-এটি সময়ের স্রোতকে দেখে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। যেন নদীর ধারে দাঁড়িয়ে নৌকা ভাসানোর আগে পানির গভীরতা মেপে নেওয়া। লাভ আছে, ক্ষতিও আছে-কিন্তু সিদ্ধান্তটি এক ধরনের সতর্কতা, এক ধরনের কৌশলগত নীরবতা, এক ধরনের অপেক্ষা।
বাংলাদেশ ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিল না। তবে এটি কোনো বন্ধ দরজা নয়; বরং অর্ধেক খোলা জানালা। সেখান দিয়ে আলোও আসে, বাতাসও আসে, আর সময় হলে দরজাও খোলা যায়।
মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক
