এআই’র হাত ধরে আসছে ভবিষ্যতের কৃষি
Advertisement
ড. আবদুর রহিম
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি এখন এক কঠিন সময় পার করছে। গত ২৬ আগস্ট নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখিয়েছে, জলবায়ু-ঝুঁকি কৃষি ও জীবিকাকে কত দ্রুত বিপন্ন করতে পারে। অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, বন্যা এবং নতুন রোগবালাইয়ের কারণে অনেক অঞ্চলে ফসলের স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিবর্তিত পরিবেশে শুধু উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না, প্রয়োজন এমন ফসলের জাত, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থেকে সন্তোষজনক ফলন দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা এগুলোকে বলছেন জলবায়ু-সহনশীল বা ক্লাইমেট-রেজিলিয়েন্ট ফসল। প্রচলিত উদ্ভিদ প্রজনন পদ্ধতিতে একটি নতুন জাত উদ্ভাবন করতে প্রায়ই ১০ থেকে ১৫ বছর, কখনো আরও বেশি সময় লাগে। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে তার চেয়েও দ্রুত। তাই গবেষকরা এখন জিনোমিকস, ফিনোমিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং (এমএল) এবং দ্রুত প্রজনন (স্পিড ব্রিডিং) প্রযুক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।
উদ্ভিদের জিন থেকে মাঠের আচরণ : প্রতিটি উদ্ভিদের জিনোমে তার বৃদ্ধি, ফলন, রোগ প্রতিরোধ এবং খরা বা তাপমাত্রা সহ্য করার অনেক নির্দেশনা লুকিয়ে থাকে। আধুনিক জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা খুব দ্রুত বিপুলসংখ্যক জিন ও জিনগত পার্থক্য শনাক্ত করতে পারছেন। কিন্তু কোনো উদ্ভিদের মধ্যে একটি বিশেষ জিন থাকলেই মাঠে সেটি প্রত্যাশিত বৈশিষ্ট্য দেখাবে, বিষয়টি এত সরল নয়। মাটি, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, রোগজীবাণু ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জিনের পারস্পরিক সম্পর্কও উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। অন্যদিকে, ড্রোন, স্যাটেলাইট, ক্যামেরা ও বিভিন্ন সেন্সরের মাধ্যমে মাঠে হাজার হাজার গাছের উচ্চতা, পাতার রং, বৃদ্ধি, পানির ব্যবহার, রোগের লক্ষণ এবং ফলনের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। উদ্ভিদের দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য এসব বৈশিষ্ট্যের ব্যাপক বিশ্লেষণকে বলা হয় ফিনোমিকস। জিনোমিকস আমাদের জানায় উদ্ভিদের জিনে কী আছে, আর ফিনোমিকস দেখায় বাস্তব পরিবেশে সেই উদ্ভিদ কেমন আচরণ করছে। এ দুই ধরনের তথ্যের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপনই আধুনিক ফসল প্রজননের বড় চ্যালেঞ্জ।
এআই হবে উদ্ভিদ প্রজননবিদের সহকারী : এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব। একজন গবেষকের পক্ষে লাখ লাখ জিনগত তথ্য, মাঠের ছবি, আবহাওয়া, মাটি এবং ফলনের উপাত্ত একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রায় অসম্ভব। এআই ও এমএল এসব তথ্য থেকে এমন কিছু সম্পর্ক ও ধরন খুঁজে বের করতে পারে, যা প্রচলিত বিশ্লেষণে সহজে ধরা পড়ে না। উদাহরণস্বরূপ, কোনো প্রজনন কর্মসূচির হাজার হাজার গাছের মধ্যে কোন গাছটি ভবিষ্যতে খরা সহ্য করে বেশি ফলন দিতে পারে, এআই তার সম্ভাবনা আগেই হিসাব করতে পারে। এতে সব গাছকে পূর্ণ জীবনকাল পর্যন্ত মাঠে পরীক্ষা করার প্রয়োজন কমে আসে। ফলে সময়, জমি ও গবেষণা ব্যয় সাশ্রয় হয় এবং উপযুক্ত গাছ নির্বাচন আরও নিখুঁত ও সঠিক হতে পারে। তবে এআইকে গবেষকের বিকল্প হিসাবে দেখা কখনোই ঠিক হবে না। বরং এটি প্রজননবিদের একটি শক্তিশালী সহায়ক ব্যবস্থা। গবেষকের জীববৈজ্ঞানিক জ্ঞান, মাঠের অভিজ্ঞতা এবং এআই-এর বিশ্লেষণী ক্ষমতা একত্রে ব্যবহার করতে পারলেই সর্বোত্তম ফল পাওয়া যাবে। গবেষকরা তাই এমন ব্যাখ্যাযোগ্য এআই ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট গাছ বা জিন নির্বাচন করার পেছনে এআই-এর যুক্তি বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন।
জিনোমিকস ও স্পিড ব্রিডিং : আধুনিক উদ্ভিদ প্রজননে শুধু এআই নয়, মার্কার-সহায়ক নির্বাচন, জিনোমিক সিলেকশন, জিন সম্পাদনা এবং স্পিড ব্রিডিং একসঙ্গে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্পিড ব্রিডিংয়ে নিয়ন্ত্রিত আলো, তাপমাত্রা ও পরিচর্যার মাধ্যমে উদ্ভিদের জীবনচক্র ছোট করা হয়। ফলে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় বছরে বেশি প্রজন্ম উৎপাদন করা সম্ভব। সাম্প্র্রতিক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জিনোমিক প্রযুক্তির সঙ্গে স্পিড ব্রিডিং যুক্ত করলে প্রজননচক্র প্রায় আড়াই থেকে পাঁচগুণ দ্রুত করা সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা : বাংলাদেশে খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা এবং উচ্চ তাপমাত্রা কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ধান, গম, ভুট্টা, ডাল ও শাকসবজির স্থানীয় জাত এবং দেশীয় জার্মপ্লাজমে প্রতিকূলতা সহনশীল অনেক মূল্যবান জিন থাকতে পারে। এসব জিনগত সম্পদের সঠিক সংরক্ষণ, জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং মাঠপর্যায়ের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা গেলে বাংলাদেশের উপযোগী নতুন জাত উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়বে। তবে শুধু কম্পিউটার বা উন্নত পরীক্ষাগার স্থাপন করলেই কাক্সিক্ষত ফল আসবে না। প্রয়োজন মানসম্মত মাঠের তথ্য, স্থানীয় জার্মপ্লাজমের সুরক্ষা, উন্মুক্ত ও সমন্বিত ডেটাবেজ, দক্ষ উদ্ভিদ প্রজননবিদ, জিনতত্ত্ববিদ, বায়োইনফরমেটিশিয়ান ও কম্পিউটার বিজ্ঞানীর সম্মিলিত উদ্যোগ। একই সঙ্গে এআই-এর পূর্বাভাস অবশ্যই একাধিক পরিবেশ ও মৌসুমে মাঠ পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। ভবিষ্যতের ফসল প্রজনন তাই শুধু দুটি গাছের মধ্যে সংকরায়ণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জিনোমের তথ্য, মাঠের ডাটা ও ছবি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং এআই-এর বিশ্লেষণ একত্রে নির্ধারণ করবে কোন গাছটি ভবিষ্যতের প্রতিকূল পরিবেশে সবচেয়ে ভালো টিকে থাকতে পারবে। উদ্ভিদ প্রজননে এআই-এর প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো এটি বিপুল সংখ্যক নির্ভুল ডেটার ওপর নির্ভরশীল, যা সংগ্রহ করা কঠিন এবং প্রাথমিকভাবে ব্যয়বহুল। এছাড়া, পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্যের জটিল সম্পর্ক ‘Genotype×Environment interaction’ (G×E) পরিমাপ করতে যে পরিমাণ দক্ষতা দরকার তা এখনো গড়ে উঠেনি। কিন্তু আসার বাণী হলো, বর্তমানে বাংলাদেশে এআই ল্যাব তৈরি হচ্ছে এবং এ বিষয়গুলোতে কাজ করার পরিধি বাড়ছে। এই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ও বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগ সম্ভব হলে কম সময়ে অধিক কার্যকর, পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনের নতুন দুয়ার খুলে যেতে পারে।
ড. আবদুর রহিম : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, কৌলিতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
