প্রশ্ন যখন সরকারের ‘অস্তিত্ব’
Advertisement
সাকিব আনোয়ার
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত কয়েক দিন ধরে দেশে যা ঘটছে, তাতে অনেকে বিদ্রুপ করে বলছেন-দেশে কি সরকার আছে? একের পর এক হামলা, ভাঙচুর, দখল আর প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি ধীরে ধীরে সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতাও একইভাবে সংক্রমিত হচ্ছে। একটা বিপুল জনসমর্থনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রতি জনগণের এই আস্থার সংকট রীতিমতো দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন সামনে আনছে। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে সমাধান কোথায়!
শেখ হাসিনার শাসনামলে একটা কথা বলা যেত-‘এটা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার নয়। তারা গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করেছে। গায়ের জোরে দখল, ভাঙচুর, চাঁদাবাজি তাই জনগণ মেনে নিয়েছিল।’ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব, ভাঙচুর, হামলা ছিল পতিত স্বৈরাচারকে লক্ষ করে। হঠাৎ করে রাষ্ট্রের শাসনকাঠামো থেকে নিয়মশৃঙ্খলা, আইন-শব্দগুলোই হারিয়ে গিয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরে এলে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামো পুনরুদ্ধার হবে। কিন্তু জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষা ভুল প্রমাণ হতে এত কম সময় লাগবে, সেটা সম্ভবত আমরা কেউই ভাবতে পারিনি।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এসব হামলা, ভাঙচুর, ভীতি প্রদর্শন, দখল এবং চাদাবাজির সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতা, এমনকি সংরক্ষিত এবং নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামও সামনে আসছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগও এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসব অভিযোগ গায়ের জোরে উড়িয়ে দেওয়াও সম্ভব না। যদিও সেই চেষ্টাও হচ্ছে। আরও বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, এসব অভিযোগ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হচ্ছে। সরকারি দলও অভিযোগগুলো আমলে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
গত ২-৩ দিনের ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের নেতা, এমপিদের নাম জড়িয়েছে। মিরপুরের রাড্ডা হাসপাতালের ১০ কাঠা জায়গা দখলের চেষ্টা হয়েছে প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর চোখের সামনে। যদিও হামলা, ভাঙচুর, পুরো একটি হাসপাতাল ভবন গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়ার পুরো সময় তারা চোখ বন্ধ রেখেছিল। এমনকি দখলদারদের সাইনবোর্ড তিন দিন টাঙানো ছিল। গরিবের চিকিৎসাকেন্দ্র বলে পরিচিত এই হাসপাতাল দখলের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সংরক্ষিত নারী আসনের এক সংসদ-সদস্যের নাম দেশের মূলধারার প্রায় সব গণমাধ্যমে উঠে এলেও সেই ব্যাপারে সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের কোনো বিকার নেই।
ক্ষমতায় আসার আট মাস না পেরোতেই বড় প্রশ্নের মুখে বিএনপি। নির্বাচনের আগে দখল ও চাঁদাবাজির যে আশঙ্কার কথা প্রতিপক্ষ প্রচারে এনেছিল, ক্ষমতায় এসে বিএনপি যেন নিজেরাই সেই নির্বাচনি বাগ্যুদ্ধ সত্য প্রমাণ করতে মাঠে নেমে পড়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রচারণা ছিল, ক্ষমতায় এলে বিএনপি আবারও চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারি এবং নৈরাজ্য শুরু করবে। ক্ষমতায় এসে সরকারি দল নিজেরাই বিরোধীদের সেই দাবিকে সত্য প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছে। মনে হচ্ছে বিএনপি নিজেদের ‘দখলদার ও চাঁদাবাজ’ প্রমাণ করতে এবং সরকার নিজেদের অযোগ্য প্রমাণ করতে ব্যস্ত।
রাড্ডার ঘটনার পর ধারাবাহিকভাবে আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে। আদাবরে একটি ভবন দখলের চেষ্টা, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট, চাঁদা দাবি এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় শতাধিক লোক নিয়ে জমি দখলের খবর সামনে এসেছে। ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। রাড্ডা হাসপাতাল, আদাবর, মোহাম্মদপুর ও ইসিবিতে হামলার ঘটনায় যে পুলিশকে নিষ্ক্রিয় ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যর্থ মনে হয়েছে, সেই পুলিশকেই জাসদ কার্যালয়ে ভিন্ন ভূমিকায় দেখা গেছে। বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা সেখানে থাকা ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে অভিযোগ তোলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে শত শত মানুষকে আটক করে পরিচয় যাচাই করেছে, গ্রেফতার করেছে। জাসদ অফিসের ঘটনায় পুলিশ কার্যত বিএনপি ও যুবদলের প্রক্সি বাহিনী হিসাবে কাজ করেছে। আগে যেভাবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী-ক্যাডাররা পুলিশের সহযোগিতায় যাচ্ছেতাই করার সাহস পেত, এখনো ঠিক একইভাবে পুলিশ বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের তাঁবেদারি করছে।
কেউ কেউ মনে করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর পরবর্তী নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারেও বর্তমান ক্ষমতাসীনরা অনেক আত্মবিশ্বাসী। এর একটি বড় কারণ দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের অনুপস্থিতি, যারা প্রায় ৩৫ বছর বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল। আরেকটি কারণ হলো, প্রধান বিরোধী দল হিসাবে সংসদে জামায়াতে ইসলামীর ব্যর্থতা। কিন্তু একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না যে, বাংলাদেশের জনগণ প্রয়োজনের মুহূর্তে বিকল্প খুঁজে নিয়েছে। বিএনপির জন্মও হয়েছিল জনগণের বিকল্প খুঁজে বের করার তাড়না থেকেই। এ কারণেই আওয়ামী লীগ, জাসদের মধ্য থেকে বিএনপি নামে নতুন দলের জন্ম হয়েছে। জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি এবং আকাঙ্ক্ষাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো কারও জন্যই ভালো কিছু বয়ে আনেনি।
সাকিব আনোয়ার : রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
