নীতিহীনতাই আমাদের অর্থনীতির প্রধান সমস্যা
ড. রাজীব চক্রবর্তী
প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত মার্চ ও এপ্রিলে ভালো রেমিট্যান্স দেশে আসায় ‘মুদ্রা বাজারে স্বস্তির নিশ্বাস’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। তখন ডলারের দাম ৭-৮ টাকা কমে গিয়ে ১১০-১১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। ব্যাংকগুলোতেও ডলারের মজুত ছিল। ফলে ডলারের চাহিদায় লাগাম পরায় দাম কমে গিয়ে দেশীয় মুদ্রা ‘টাকা’ কিছুটা তেজী হয়েছিল। কিন্তু সেই সুখ মনে হয় বেশিদিন সইল না। হঠাৎ সুদের হার নির্ধারণ পদ্ধতি ‘স্মার্ট’ বাদ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন আরেকটি পদ্ধতি ‘ক্রলিং পেগ’ নিয়ে এলো। আর যায় কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে ডলারের দাম ৭-৮ টাকা বেড়ে গিয়ে এখন এক লাফে ১১৭-১১৮ টাকা। এরও আগে, গত বছর সুদের হার নির্ধারণ পদ্ধতি ৯-৬ তুলে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ব্যাংক মার্জারের প্রক্রিয়া শুরু করেও পিছিয়ে দেওয়া হলো। কেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বারবার নীতি পরিবর্তন?
বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের মধ্যবর্তী ১১৭ টাকা দর ঠিক করে দিয়ে এর উপরে বা নিচে কোনো সীমা এখনো নির্ধারণ করে দেয়নি। হঠাৎ সুদহার নির্ণয় পদ্ধতির পরিবর্তনকে, যাকে বাজারভিত্তিক বলা হচ্ছে, অনেক অর্থনীতিবিদ সাধুবাদ জানিয়েছেন। আসলে বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। পায়ে শিকল পরিয়ে এতদিন যে ডলারের দাম ধরে রাখা হয়েছিল, তা বরং অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব নিয়ে এসেছে। বিগত কয়েক বছরে টাকা ২৫ শতাংশের উপরে তার মান খুইয়েছে, যা আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির গতি আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। কেন টাকার মানকে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্গে আগেই সমন্বয় করা হয়নি?
বৈশ্বিক সংস্থাগুলো পূর্বাভাস দিয়েছে, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হতে পারে। ডলারের সংকট কাটানোর জন্য সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণ করেছে। পণ্যের কাঁচামালের জন্য ঋণপত্র খুলতে বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া দুষ্কর হচ্ছে, যা ব্যক্তি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে সামগ্রিকভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু সরকারি বিনিয়োগ দিয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায় না। যদিও এতদিন সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে অর্থনীতির গতিকে সচল রাখার চেষ্টা করেছে। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে প্রথম ১১ মাসের সরকারের বাজেট ব্যয়ের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপাতে হয়েছিল, যা এখন আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঋণ পাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে, যা অর্থনীতির গতিশীলতাকে শ্লথ করে দিচ্ছে।
কৃষি খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভর্তুকি দিতে গিয়ে সারের আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকারকে উচ্চ সুদের বন্ড দিয়ে ঋণ নিতে হয়েছে। কারণ কৃষককে ভর্তুকি দিয়ে না বাঁচালে, কৃষক না বাঁচলে মূল্যস্ফীতি আরও কঠিন রূপ ধারণ করবে। এত কিছুর পরও খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছুঁয়েছে। কৃষিনির্ভর দেশে চাল ছাড়া অন্যান্য তরিতরকারি, শাকসবজির দাম লাগামছাড়া। প্রয়োজনীয় সরবরাহ থাকার পরও কেন বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, এ প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
দেশের একশ্রেণির কর ফাঁকি দেওয়া ভোক্তা বিদ্যুৎ না থাকলেই ‘সব শেষ’ বলে রব তোলে। তাই অনুৎপাদনশীল খাতেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। ফলে কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করে বৈদেশিক মুদ্রার আহরণ ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি তেল বাবদ বিশাল অঙ্কের আমদানি দায় মেটাতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ বাড়ছে। তাই রিজার্ভ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি উৎস এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এখন সময়ের দাবি। দেরিতে হলেও সরকার নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করেছে। সস্তা এলএনজির ওপর নির্ভরতা (যার দাম রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বেড়ে যায়) বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সংকট প্রকট করেছে।
দেশের অর্থনীতির সংকট প্রকাশ্য হয় ২০২৩ সালে, যে সময় আইএমএফের কাছে যেতে হয়েছে ঋণের জন্য। দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা তখনই বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়েছে। যেখানে ২০২২ সালেও জিডিপি ছিল ৬ শতাংশের উপরে, রিজার্ভের পরিমাণ ২০২১ সালে ৪৬ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল, কী এমন হলো যে অল্প সময়ের ব্যবধানে রিজার্ভের পতন ঘটতে শুরু করল?
বস্তুত, রিজার্ভের পরিমাণ মজবুত না থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় যেমন মেটানো যায় না, তেমনি দেশীয় মুদ্রায় বিনিময় হারও স্থির থাকে না। ওঠানামা করে। অথচ ডলারের বিনিময় হার বিগত কয়েক দশক ধরে ৮০-৯০ টাকায় ঘুরছিল। করোনা-পরবর্তী অর্থনীতির ধাক্কা পর্যন্ত বাংলাদেশ ভালোভাবেই সামলেছে। তাহলে কেন এমন হলো? কীসের অভাব ছিল?
অভাব ছিল সুশাসনের। অভাব ছিল নিয়মনীতির। এছাড়া ছিল সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার দায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাজনিত ঘাটতি, বিশেষ করে ব্যাংক খাতে।
দেশের আর্থিক খাতগুলোর মধ্যে ব্যাংক খাত এখনো অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে আছে। কেননা দেশের পুঁজিবাজার এখনো সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। অথচ আঞ্চলিক পর্যায়ে সৌদি আরবের শেয়ারবাজারে যেখানে তেমন উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ছিল না, সেখানে দেশটির শেয়ারবাজার বিগত ১০ বছরের ব্যবধানে ৫০ বছরের অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে মত দিয়েছে দুবাইভিত্তিক ইস্ট ক্যাপিট্যাল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যাংক জে পি মরগ্যান মনে করে, রক্ষণশীল সৌদি আরবে তেলবহির্ভূত আর্থিক খাত যেমন-শিক্ষা, পর্যটন খাত বিদেশি কোম্পানি দ্বারা আকৃষ্ট হচ্ছে। তাদের বন্ড মার্কেট বাড়ছে। অথচ অপেক্ষাকৃত বেশি উদার অর্থনীতি থাকার পরও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আসছে না। কেন এদেশে শেয়ারবাজার এখনো আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারেনি?
বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি পোশাকশিল্প রপ্তানি ও প্রবাসী আয় মোটামুটি ইতিবাচক ধারায় ছিল। এতেও এখন টান পড়েছে। গত ঈদুল ফিতরের সময় ভালো রেমিট্যান্স এলেও এর একটি অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলে আসেনি। ফলে রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে যুক্ত হয়নি। ডলারের বিভিন্ন দরের কারণে প্রবাসীদের হুণ্ডির মাধ্যমে পাঠানো ডলার টাকায় রূপান্তরিত হয়ে দেশে ঢুকেছে।
বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আরও তীব্র হয়, যখন সরকারকে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১৬৩ কোটি ডলার আমদানি দেনা মেটাতে হয়েছে চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের জন্য, যা চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির (১.২৯ বিলিয়ন ডলার) চেয়ে বেশি। কারণ রমজান ও ঈদের কারণে পণ্য আমদানি বেড়েছে। আকুর অন্তর্ভুক্ত এ পেমেন্ট ব্যবস্থার অধীনে থাকা দেশগুলো (ভারত, চীন, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, নেপাল, ইরান, ভুটান, পাকিস্তান) থেকে বাংলাদেশ মূলত রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি করে থাকে। যার ফলে প্রতি ২ মাস পরপর আকুর পেমেন্টের পর রিজার্ভে চাপ পড়ে। এ অবস্থায় আমদানি কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পণ্য জোগানের তাগাদা বাড়াতে হবে। তার জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। কোন কোন ধরনের অতি প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা হচ্ছে, তার তালিকা করে দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেওয়ার মাধ্যমে দেশেই পণ্যের উৎপাদন ও প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। যদিও এতে পরাক্রমশালী আমদানি সিন্ডিকেট গোষ্ঠীর স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে। এ গোষ্ঠী কি দেশের চেয়েও শক্তিশালী?
বৈদেশিক খাতের পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের নিম্নগামী প্রভাব রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আয়ের বড় উৎস রাজস্ব খাতকে আরও চাপে ফেলে দিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, এখনো বাংলাদেশের কর-জিডিপির পরিমাণ ২ ডিজিটের নিচে (১০ শতাংশের নিচে), যা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বলেছে, রাজস্ব আদায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা বাড়লে কর-জিডিপি অনুপাত দুই শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হবে। এ বাড়তি রাজস্ব আয় সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দশমিক ২ শতাংশ বাড়াবে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তথ্যমতে, দেশে ধনী ও উচ্চ মধ্যবিত্তের মধ্যে ৮৭ শতাংশ আয়কর দেন না। অথচ বিপরীতে দেশে উচ্চ শুল্ক আরোপের সংস্কৃতি আছে। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। ফলে কর আদায় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না। কিন্তু কেন?
কয়েকদিন আগে গণভবনে ২০২৪-২০২৫ সালের বাজেট প্রস্তুতির সারসংক্ষেপ উপস্থাপন বিষয়ে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নিজের এলাকার সক্ষম লোকের অনেকে আছেন কর জালের বাইরে।
ফলে রাজস্ব আয়ের অর্থ দিয়ে বেতন ভাতা, সুদসহ বিভিন্ন দায়দেনা, পেনশন ভর্তুকি পরিশোধ করতেই সরকারের অর্থ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। রাস্তাঘাট, সেতু, দালান নির্মাণ ছাড়াও অতি প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নকাজ নেতিয়ে পড়ছে, বরাদ্দ ঘাটতির অভাবে। জানা দরকার, এ উন্নয়ন বাজেটই ভবিষ্যৎ আয় বাড়ানোর পথ দেখাবে। আর এসব প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান সূত্র।
ড. রাজীব চক্রবর্তী : গবেষক ও লেখক
