নিউইয়র্কের চিঠি
আমেরিকাকে মহান করতে দিদারুলের মৃত্যু
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিউইয়র্ক পুলিশের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলাম (৩৬) নিজের জীবন দিয়ে অভিবাসী কমিউনিটির বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদ্বেষমূলক কটূক্তি ও মিথ্যাচারের কড়া জবাব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জননিরাপত্তা রক্ষা করতে গিয়ে সন্ত্রাসীর প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে সাহসী বাংলাদেশি দিদারুলের আত্মদানের দৃষ্টান্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশি অভিবাসী নয়, সব অভিবাসী কমিউনিটির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। তিনি বীরের মতো জীবন দিয়েছেন। নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ, ফায়ার ডিপার্টমেন্টসহ সিটির অন্যান্য ইউনিফর্মধারী সংস্থার সদস্যরা তাকে নজিরবিহীন আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা ও বীরোচিত বিদায় জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী কমিউনিটির গুরুত্ব ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও প্রকাশ্যে কেবল ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের টার্গেট করে তাদের ব্যাপক ধরপাকড় ও বিতাড়ন শুরু করেছেন, কিন্তু বাস্তবে তার টার্গেট বৈধ-অবৈধ সব অভিবাসী। কারণ বিগত দিনগুলোতে তার অভিবাসী বিতাড়ন অভিযানে গ্রিনকার্ডধারী, এমনকি অনেক ন্যাচারালাইজ্ড আমেরিকান সিটিজেন আটক হয়েছেন এবং তাদেরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসী কমিউনিটিতে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বহুবার উচ্চারণ করেছেন, তারা আমাদের জাতির রক্ত কলুষিত করছে; তারা সমগ্র পৃথিবী থেকে কারাগার ও পাগলা গারদ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসছে। তার কণ্ঠে জার্মানির নাৎসি নেতা হিটলারের প্রতিধ্বনি। হিটলার যেমন তার গ্রন্থ ‘মেইন ক্যাম্ফ’-এ অভিবাসী ও জাতিবর্ণের মিশ্রণের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘‘অতীতের সব মহান সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেছে, মূলত সৃজনশীল জাতি শুধু ‘রক্ত কলুষিত’ হওয়ার কারণে।” প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাৎসি হিটলারের চেয়ে আরও এক ধাপ অগ্রসর হয়ে বলছেন, “অভিবাসীরা ভয়ংকর অপরাধী, ওরা অবৈধভাবে ভোট প্রদান করছে, আমাদের পালিত পশুপাখি খেয়ে ফেলছে, আমাদের জরুরি তহবিলের অর্থ শোষণ করছে এবং আমাদের চাকরি চুরি করছে। তাছাড়া আমরা এখন আমাদের দেশে প্রচুর বাজে ‘জিন’ (বংশধারা) পাচ্ছি।” এর চেয়ে জাতিবিদ্বেষমূলক বক্তব্য আর কী হতে পারে!
গত ২৮ জুলাই নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটনের এক বহুতল ভবনে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে বহু নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষা করার লড়াইয়ে জীবন দিয়ে বাংলাদেশি আমেরিকান প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করেছেন অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে জননিরাপত্তা রক্ষায় কতটা আত্মনিবেদিত হতে পারে এবং বিদ্বেষ উসকে দেওয়া আমেরিকার শীর্ষ রক্ষণশীল ও কট্টর নেতা ট্রাম্পের বক্তব্য কতটা ভ্রান্ত, ফাঁকা বুলি ও অন্তঃসারশূন্য। সন্দেহ নেই, অভিবাসীরা উন্নত জীবনের জন্য ‘আমেরিকান ড্রিম’ বাস্তবায়নে আসে; কিন্তু বাস্তবে তাদের অধিকাংশই নিজ নিজ মেধা, যোগ্যতা ও শ্রমে আমেরিকাকে আরও বিকশিত করার ক্ষেত্রে প্রভূত অবদান রাখে এবং আমেরিকাকে নিজের দেশ হিসাবেই বরণ করে নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রায় অর্ধেকই বসবাস করেন দেশটির সবচেয়ে জনবহুল সিটি নিউইয়র্কে। এ সিটির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিভাগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের বিচরণ প্রায় অবাধ হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য হিসাবে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শাহানা হানিফ। তিনি সিটি কাউন্সিলে প্রথম নির্বাচিত বাংলাদেশি কাউন্সিলরম্যান। তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আরও বাংলাদেশি তরুণ-তরুণী আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য অনুপ্রেরণা পেয়েছে এবং নির্বাচনি দৌড়ে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। গত জুনে সিটির মেয়র পদে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত জোহরান মামদানির বিজয় লাভে বাংলাদেশি ভোটাররাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি) যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো বড় সিটির, এমনকি অনেক অঙ্গরাজ্যের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে বৃহত্তম। বর্তমানে এনওয়াইপিডির সক্রিয় জনশক্তি ৩৫ হাজারের বেশি। বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সহ-প্রতিষ্ঠাতা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শামসুল হক, যিনি ২১ বছর পুলিশে চাকরি করার পর সম্প্রতি অবসর গ্রহণ করেছেন, তার মতে, বর্তমানে নিউইয়র্ক পুলিশে ৯০০ থেকে ১০০০ পুলিশ অফিসার কর্মরত রয়েছেন। তাদের মধ্যে চারশর অধিক ‘বাপা’র সদস্য। এছাড়া এনওয়াইপিডির সহযোগী সংস্থা ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট অফিসার ও স্কুল সেফটি অফিসারসহ আরও দেড় সহস াধিক ইউনিফর্মধারী বাংলাদেশি নারী-পুরুষ আমেরিকান পুলিশে কর্মরত রয়েছেন। নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসনের অধীনে যেসব সংস্থা ও বিভাগ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে পুলিশ বিভাগ অন্যতম এবং সব ঝুঁকি সত্ত্বেও পুলিশের চাকরি আকর্ষণীয়। যেসব বাংলাদেশি আমেরিকান ইতোমধ্যে পুলিশ বিভাগে কর্মরত, তাদের অনুসরণ করে শিক্ষিত বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীরা ক্রমেই পুলিশে যোগদানে আগ্রহী হয়ে উঠছে। পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলামের স্থাপন করা দৃষ্টান্তে তারা আরও বেশি সংখ্যায় এনওয়াইপিডির পুলিশ অফিসার হিসাবে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত হবে বলে আশা করেন সাবেক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শামসুল হক।
যুক্তরাষ্ট্রে এবং বিশেষ করে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা দ্রুত বর্ধনশীল। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করার প্রথম দিন থেকে তথাকথিত অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার পর বহু বাংলাদেশি অভিবাসী, যাদের যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থাকার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল না, তারা দেশের অবনতিশীল পরিস্থিতির কারণে হোক, অর্থনৈতিক কারণে অথবা উন্নত জীবনের আশায় হোক, অনেক বাধাবিপত্তি ডিঙিয়ে এসেছেন। তাদের অনেকের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি রয়েছে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর যে কোনো নিু-আয়ের কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন নামমাত্র মজুরিতে। বেশির ভাগ নবাগতের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটে। বৈধতা লাভ করলেই তাদের জীবনের অমানিশা কেটে যেতে শুরু করে এবং তারা নিজেদের মতো করে চাকরি বাছাই করে নিতে পারেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা তাদের সুখস্বপ্নকে খান খান করে দিয়েছে। তাদের ধরে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে অনেককে কাজকর্ম ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যেতে হয়েছে। কারণ অবৈধ অভিবাসীদের কাজে নিয়োগ করার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোয় হানা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইস) এজেন্টরা বহু অভিবাসীকে গ্রেফতার করে যার যার দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। গ্রেফতার এড়াতে যারা আত্মগোপনে রয়েছেন, তাদের পক্ষে কত দীর্ঘ সময় এভাবে কাটানো সম্ভব!
অবৈধ অভিবাসী বিতাড়নে ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন বিভাগের মুখ্য টার্গেট বাংলাদেশিরা নয়। তাদের আসল টার্গেট আমেরিকার দক্ষিণ সীমান্তের দারিদ্র্যপীড়িত, দুর্বল অর্থনীতির বড় দেশ মেক্সিকো এবং মেক্সিকোর সীমান্ত ডিঙিয়ে বন্যার তোড়ের মতো যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশকারী সেন্ট্রাল আমেরিকান দেশগুলো থেকে আগত লাখ লাখ অভিবাসী। সেজন্য ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের আটক ও বহিষ্কার অভিযানে বাংলাদেশি অভিবাসীদের আতঙ্কিত হওয়ার তেমন কারণ নেই। কিন্তু সামান্যসংখ্যককে বহিষ্কার করা হলে তা সংশ্লিষ্টদের জীবনে বড় বিপর্যয়। কিন্তু সন্ত্রাসীর গুলিতে পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলামের নিহত হওয়ার ঘটনায় তারা তাদের নিজেদের ভাগ্যের অনিশ্চয়তার মাঝেও গর্বিত যে তাদেরই এক ভাই, বন্ধু তাদেরই মতো আমেরিকান স্বপ্ন নিয়ে এদেশে এসেছিলেন। তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সম্মানজনক অবস্থানে এবং জীবন দিয়ে তার মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষা করেছেন এবং গৃহীত দেশকে আপন করে নিয়ে সেদেশের জন্য জীবন কুরবানি দিয়েছেন। সুযোগ পেলে একদিন তারাও হয়তো এমন অবদান রাখতে সক্ষম হবেন।
অভিবাসনবিরোধী কট্টর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পুলিশ অফিসার দিদারুল ইসলামের জীবনদানকে অস্বীকার করতে পারেননি। ঘটনার সময় তিনি স্কটল্যান্ড সফরে ছিলেন। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ’-এ দেওয়া এক পোস্টে নিহত বাংলাদেশি পুলিশ অফিসারের নাম উল্লেখ না করেই সদয় মন্তব্য করে একজন অভিবাসীর কর্তব্যনিষ্ঠার স্বীকৃতি দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বয়ং নিউইয়র্ক সিটির বাসিন্দা। তিনি লিখেছেন, “এনওয়াইপিডির অফিসারসহ যে চারজন তাদের জীবন দিয়েছেন, আমার হৃদয় তাদের পরিবারের সঙ্গে রয়েছে। ঈশ্বর নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগকে আশীর্বাদধন্য করুন এবং ঈশ্বর নিউইয়র্ককে আশীর্বাদধন্য করুন!”
মৃত্যুতে দিদারুল তার সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। জীবদ্দশায় তিনি বীরসুলভ কর্তব্য পালন করেছেন। তার পুলিশি কর্তব্যের বাইরে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করেছেন ছোট দুই শিশুসন্তান লালনে এবং আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর সেবায়। অবশিষ্ট সময় বাংলাদেশি অভিবাসী কমিউনিটির স্বার্থে ব্যয় করেছেন, যাতে তারাও তার সঙ্গে যোগ দিয়ে আমেরিকা তাদের যা দিতে পারে তা গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে নিজেদের, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এবং আমেরিকার ভবিষ্যৎ গড়তে অবদান রাখতে পারেন। তিনি সিটির অন্যতম বাংলাদেশি অধ্যুষিত ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার এলাকায় বাস করতেন, যেখানে তিনি সবার পরিচিত প্রিয়মুখ ছিলেন। সবাই তাকে তৃণমূল পর্যায়ের আপন মানুষ ভাবতেই স্বচ্ছন্দবোধ করত। পুলিশের চাকরির বাইরে তিনি পার্ট-টাইম চাকরি করে যা আয় করতেন, তা থেকে হাজার হাজার ডলার দান করেছেন তার নেইবারহুডে নতুন একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার জন্য। নিউইয়র্ক সিটির পুলিশ বিভাগের মতো অত্যাবশ্যকীয় সেবায় নিয়োজিত থেকেও তিনি কমিউনিটি অন্তঃপ্রাণ হিসাবে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা অনন্য।
আমেরিকার রক্ষণশীলরা রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসীন হলেই ভুলে যান, আমেরিকা মূলত অভিবাসীদের দেশ। অভিবাসন ছাড়া আমেরিকা আজকের পর্যায়ে আসেনি, অভিবাসন ছাড়া আমেরিকা সামনে অগ্রসর হতে পারবে না। বাস্তবতা হচ্ছে, আমেরিকান অভিজ্ঞতার হৃদয় ও আত্মা মানেই অভিবাসন এবং অভিবাসনই আমেরিকা। অভিবাসীরা আমেরিকান রক্তকে যে কলুষিত করছে না, বরং জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তাজা রক্ত-সঞ্চালন করে আমেরিকাকে মহান করছে, দিদারুল ইসলাম এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নিজেকে ও বাংলাদেশিদের মহান করে চিরবিদায় নিয়েছেন। আল্লাহ তাকে পরকালীন শান্তি দান করুন।
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক ও অনুবাদক
