Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বদলে গেছে রাজনৈতিক দৃশ্যপট

Advertisement

Icon

মোবায়েদুর রহমান

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বদলে গেছে রাজনৈতিক দৃশ্যপট

Advertisement

গত ৫ আগস্ট মঙ্গলবার বাংলাদেশের জন্য ছিল একটি ঐতিহাসিক দিন। এমনিতেই ৫ আগস্ট বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। কারণ, এ দিনেই এশিয়ার নিকৃষ্টতম স্বৈরাচার শেখ হাসিনার চোরতন্ত্রকে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ ধাওয়া দিয়ে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে। সেই দিবসের একবছর পূর্তি উপলক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতিকে দুটি অনন্য উপহার দিয়েছেন। একটি হলো, আগামী সংসদ নির্বাচনের সময়সীমা। আর একটি হলো, জুলাই প্রোক্লেমেশন বা জুলাই ঘোষণাপত্র।

নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা ঐতিহাসিক। কারণ সঠিকভাবে বলতে গেলে বিগত তিনটি নির্বাচন অর্থাৎ ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল ভুয়া এবং প্রহসনমূলক। এ বিষয়টি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। যখন জুলাই বিপ্লবের আগে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য বিএনপি ও জামায়াতসহ আওয়ামীবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করছিল তখন ড. আসিফ নজরুল বলেন, মানুষ আসলে সুষ্ঠু নির্বাচন কেমন, সেটা ভুলেই গেছেন। কারণ তারা দেখেছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন সংসদ-সদস্যের নির্বাচন। তারা দেখেছে, দিনের ভোট রাতেই সম্পন্ন হয়। তারা দেখেছে, ‘আমি আর ডামির’ নির্বাচন।

পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন ছিলেন খুবই অজনপ্রিয়। কারণ ’৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বের হওয়া ছাত্র-জনতার মিছিলের ওপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। সেই থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। এহেন অজনপ্রিয় নুরুল আমিনের আমলেও নির্বাচন হয়েছিল সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। ক্ষমতাসীন নুরুল আমিনের দল মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়েছিল।

সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো, ১৯৭০ সালে যে নির্বাচন হয়, যে নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সারা পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, সেই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল সামরিক শাসনের অধীনে। সামরিক আইনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন সুষ্ঠুতা ও নিরপেক্ষতার বিচারে ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ নির্বাচন। অথচ শেখ হাসিনার আমলের তিনটি নির্বাচন ছিল সবচেয়ে কলঙ্কময়। দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ শেখ হাসিনার তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। তিনটি নির্বাচন, অর্থাৎ ১৫ বছর পর বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষ এবার সর্বপ্রথম ভোট দেবে। তাই আমি বলছি, ড. ইউনূসের নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ব্যাপার।

ড. ইউনূসের সরকারের দ্বিতীয় উপহারটিও দেশবাসী পেয়েছে একইদিন। তার দ্বিতীয় উপহারটি ছিল জুলাই ঘোষণাপত্র। জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী এজন্য যে, ইতঃপূর্বেও বাংলাদেশে একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়েছিল। সেটি ছিল ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে যেটি পরে মুজিবনগর হিসাবে খ্যাত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে যারা পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হন, তাদের যৌথ সমাবেশে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম ঘোষণাপত্র পঠিত হয়। পাঠ করেন তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য, পরবর্তীকালে শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসূফ আলী। ওই ঘোষণাপত্রের নাম ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ৫৪ বছর পর ড. ইউনূস পাঠ করলেন আর একটি ঘোষণাপত্র। সেই হিসাবে এটি হলো দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র। সম্ভবত এ কারণেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিপ্লব সমাপ্ত হলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বলে, এটি হলো আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। সম্ভবত সেজন্যই নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি দাবি করছে, তারা দ্বিতীয় রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। সেজন্য তারা পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে গণপরিষদের নির্বাচন চায়।

২.

১৯৭০ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ওই সব সদস্যই গণপরিষদ সদস্য হিসাবে বিবেচিত হন, তারাই বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন করেন। এটিই ’৭২ সালের সংবিধান নামে পরিচিত। এনসিপিও ওই লাইন অনুসরণ করে দাবি করে যে ’৭২-এর সংবিধান হলো মুজিববাদী সংবিধান।

গত ৫ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই বহুপ্রতীক্ষিত নির্বাচনের সময়সীমা এবং জুলাই ঘোষণাপত্র উপহার দিলেন। কিন্তু পরদিন জনগণ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল, এই দুটি উপহার দেওয়ার পরপরই দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। এতদিন যারা ইউনূস সরকারের সমালোচনা করছিলেন সেই বিএনপি, গণতন্ত্র মঞ্চ প্রভৃতি দল ও জোট ড. ইউনূসের নির্বাচনি সময়সীমা ঘোষণা ও জুলাই ঘোষণাপত্রকে অভিনন্দিত করেছে। অন্যদের কথা বাদ দিলেও বিএনপির পক্ষে ড. ইউনূসের এ দুই ঘোষণাকে অভিনন্দিত করাটাই স্বাভাবিক।

কারণ জুলাই বিপ্লব যেদিন সমাপ্ত হয় সেদিন থেকে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের মাত্র একদিন পর বিএনপি ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে জনসভা করে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি তোলে। সেই থেকে বিগত একবছর ধরে বিএনপির রাজনীতিতে আর কোনো কথা শোনা যায়নি। তাদের প্রতিটি বক্তৃতা-বিবৃতিতে ছিল একটিই দাবি। সেটি হলো, অবিলম্বে নির্বাচন অনুষ্ঠান। অন্যদিকে ড. ইউনূসও প্রথম থেকেই বলে আসছিলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে তিনি নির্বাচন দেবেন। গত জুন মাসে ড. ইউনূসের লন্ডন সফরের সময় বিএনপির অস্থায়ী প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে তার একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে বিএনপিও সময়সীমা বাড়িয়ে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে আনেন। আর ড. ইউনূসও জুন মাস থেকে পিছিয়ে এসে ফেব্রুয়ারিতে স্থির হন। এখন সেই ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অর্থাৎ পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই নির্বাচন হবে বলে তিনি ঘোষণা করেছেন।

বিএনপির একমাত্র অগ্রাধিকার ছিল নির্বাচন। আর জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন প্রভৃতি ইসলামী ঘরানার দলের অগ্রাধিকার ছিল শেখ হাসিনাসহ স্বৈরাচারের সহযোগীদের বিচার, জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী জনগণের অভিপ্রায় মোতাবেক সংস্কার এবং অতঃপর নির্বাচন। এখন বিএনপি ড. ইউনূসের এ দুই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলামী ঘরানার ওই দলগুলো এ দুই ঘোষণার সমালোচনা করেছে।

৩.

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ-সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, গত ৫ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা যে ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন তাতে গণমানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। এটি একটি অপূর্ণাঙ্গ বিবৃতি। ঘোষণাপত্রে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের কথা বলা হলেও ১৯৪৭-এর আজাদিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এতে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা হত্যাকাণ্ড, ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডে উল্লেখ নেই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আলেম-ওলামা, মাদ্রাসাশিক্ষক ও ছাত্র, প্রবাসী ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ভূমিকার উল্লেখ নেই; যা ইতিহাসের প্রতি অবিচার ও অবহেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের টার্নিং পয়েন্ট ছিল ৯ দফা যা এক দফায় রূপান্তরিত হয়েছিল; সে বিষয়টিও ঘোষণাপত্রে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কখন, কীভাবে তা কার্যকর করা হবে তা উল্লেখ না করে ঘোষণাকে গুরুত্বহীন করা হয়েছে। পরবর্তী সরকারের হাতে বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়ায় হাজার হাজার মানুষের আত্মত্যাগ, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত জুলাই চেতনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের প্রধান চরমোনাইয়ের পীর সাহেব সৈয়দ রেজাউল করিম বলেন, প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কারকে পরবর্তী জাতীয় সংসদের ওপরে ন্যস্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে। একইসঙ্গে ধারা ২৭-এ জুলাই অভ্যুত্থানের রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতিকে ‘উপযুক্ত’ শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে আপেক্ষিক করে পরবর্তী সরকারের ওপরে ন্যস্ত করে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পিআর নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই নির্বাচনের মাস নির্ধারণ করা জনদাবির প্রতি স্পষ্টত উপেক্ষা করা।

নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি বলেছে, সরকার যে সময়সীমার মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন করতে চায়, তাতে আপত্তি নেই। নির্বাচন আয়োজনের আগে গণহত্যাকারীদের বিচার, রাষ্ট্র কাঠামোর গুণগত পরিবর্তন, নির্বাচনের আগে বিচারকাজ দৃশ্যমান, প্রশাসনের নিরপেক্ষতাসহ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার পাঠ করা জুলাই ঘোষণাপত্র, ঘোষণার আয়োজন এবং একটিমাত্র দলের সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা সবকিছুই প্রমাণ করে, ইসলামপন্থিদের মতামত, আত্মত্যাগ ও সাংগঠনিক ভূমিকাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। এটি শুধু দুঃখজনক নয়, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি চরম অবহেলার শামিল।’

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের আনুষ্ঠানিকভাবে পঠিত জুলাই ঘোষণাপত্রে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরের নৃশংস গণহত্যার বিচারের কোনো প্রতিশ্রুতির উল্লেখ না থাকায় হতাশা ও বিস্ময় ব্যক্ত করেছেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা সাজেদুর রহমান।

ইসলামী ঘরানার দলগুলো নির্বাচনের সময়সীমা এবং জুলাই ঘোষণাপত্রের সমালোচনা করলেও তারা কেউই নির্বাচন বর্জনের কথা বলেননি। এখান থেকে ধরে নেওয়া যায়, তারা সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। তাই আগামী দিনে নির্বাচনি রাজনীতি কোন পথে অগ্রসর হয় সেটি দেখার জন্য দেশবাসী অপেক্ষা করছে।

মোবায়েদুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক

[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

জাতিসংঘের করিডর যেন এক নাট্যশালা

জাতিসংঘের করিডর যেন এক নাট্যশালা

শিক্ষকের নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট

শিক্ষকের নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট

সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন : বাস্তবতায় পৌঁছানোর পথ

সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন : বাস্তবতায় পৌঁছানোর পথ

হালফিল বয়ান সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম