ঐক্যই জাতির রক্ষাকবচ
ড. এস কে আকরাম আলী
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঐক্যই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। ‘ঐক্যে বল, বিভক্তিতে পতন’-এ সত্যকে সর্বজনীন সত্য হিসাবে ধরা হয়। যখন একটি জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তখন কোনো শক্তিই তাদের ক্ষতি করতে পারে না, কিন্তু বিভক্তি একটি জাতিকে ধ্বংস করতে সক্ষম। ১৯৭১ সালে জনগণের ঐক্য বাংলাদেশের জন্মকে সম্ভব করেছিল। আবার স্বাধীনতার পর মানুষের বিভাজনই জাতিকে ভোগান্তির মধ্যে ফেলেছিল। বাংলাদেশের জন্মের পর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল জাতীয় ঐক্যের, অথচ তখনই জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের নেতারা এ সহজ সত্যটি উপলব্ধি করতে পারেননি এবং শুরু থেকেই বিভেদের নীতি অনুসরণ করেছেন। স্বাধীন জাতি হিসাবে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই আমরা সমাজে বিভেদের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি এবং আমাদের শত্রুরা নিজেদের স্বার্থে সেটিকে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছে। জাতীয় জীবনে বিভেদের পরিণতি সম্পূর্ণভাবে জানার পরও আমরা বারবার বিভক্তির শিকার হয়েছি গত কয়েক দশকের স্বাধীনতার পথচলায়।
শুধু জিয়াউর রহমানই প্রকৃতভাবে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সবকিছু করেছিলেন। তার সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কার্যকর হয়েছিল এবং জাতি মোটামুটি ঐক্যবদ্ধ ছিল। এর সুফল জাতি পেয়েছিল, যতদিন না শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসেন। তিনি আবার তার পিতার নীতি অনুসরণ করে সমাজকে বিভক্ত করার সব রকম প্রচেষ্টা নেন। তার পিতার বপন করা বিভেদের বীজ গত পনেরো বছরে দ্রুত বেড়ে ওঠে। সমাজকে মুক্তিযুদ্ধপন্থি ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শিবিরে বিভক্ত করা হয়েছিল, যার ফলে দেশের মানুষের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক ধ্বংস হয়েছে। মানুষ সমাজে সুবিধাভোগী ও বঞ্চিত শ্রেণিতে ভাগ হয়ে পড়েছে।
বঞ্চিত শ্রেণি বিগত শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অকথ্য ভোগান্তি ও ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছিল, তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল ব্যাপক হত্যা ও গুমের মাধ্যমে। তবুও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলগুলো পরিবর্তনের আশা ছাড়েনি। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্ব তাদের শীর্ষ নেতাদের বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নিয়েছিল এবং তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোপনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।
বিএনপির নেতারাও মাঠে সক্রিয় ছিলেন এবং অনুকূল সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন আন্দোলনে ফিরে আসার জন্য। হেফাজতে ইসলাম ও অন্যান্য ইসলামি রাজনৈতিক দলও শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সুযোগ খুঁজছিল। সমাজের বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রেণি এক সংকটময় জীবন কাটাচ্ছিল এবং শাসন পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিল।
একদল ছাত্রনেতা ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের নামে। শেখ হাসিনার অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ সমাজের বিপুল জনগোষ্ঠীও ছাত্রদের নেতৃত্বে গণ-আন্দোলনে যোগ দেয়। আন্দোলন দ্রুত ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে, অল্পসময়ের মধ্যে এটি বিপ্লবে রূপ নেয় এবং অবশেষে শেখ হাসিনা গত বছরের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। জাতি স্বস্তি পায় এবং জীবনে অর্থবহ পরিবর্তনের প্রত্যাশা করে। কিন্তু গত এক বছরে ড. ইউনূস সরকার তেমন কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি।
ড. ইউনূস সরকার ব্যর্থ হতে যাচ্ছে কি না, তা এখন গোটা দেশের আলোচনার বিষয়। এর জন্য দায়ী কারা-সেটাও জাতির কাছে জ্বলন্ত প্রশ্ন। ড. ইউনূস সরকার আন্তরিক প্রমাণিত হলেও সমস্যার সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের দায় এড়াতে পারে না। সরকার ইতোমধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে, কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব অবস্থান আছে নির্বাচন নিয়ে। এতে দেশে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নির্বাচন ইস্যু ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিভেদের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং দেশে ব্যাপক আইনশৃঙ্খলা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট যদি নির্বাচনি ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থান নেয়, তাহলে বর্তমান সরকারের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। জাতি তীব্র রাজনৈতিক সংকট প্রত্যক্ষ করবে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
শত্রুরা এমন পরিবেশের অপেক্ষায় আছে, যাতে তারা বিভিন্ন উপায়ে ও রূপে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করতে পারে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কি তা অনুভব করেছে? এটাই জাতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। এ সংকটময় সময়ে বিএনপি ও জামায়াত জাতিকে বাঁচানোর পবিত্র দায়িত্ব এড়াতে পারে না। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মূলত এ দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির আন্তরিক ও সত্যিকারের বোঝাপড়ার ওপর।
অন্য কিছু নয়, কেবল জাতীয় ঐক্য-এ দুই রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব আমাদের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করতে পারে। আশা করা যায়, বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সুস্থ বুদ্ধির জাগরণ ঘটবে এবং তারা একটি নতুন ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করবে।
প্রফেসর ড. এস কে আকরাম আলী : ইতিহাসবিদ
