Logo
Logo
×
   

Advertisement

বাতায়ন

এআই কীভাবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে

Advertisement

Icon

ড. শাহ জে মিয়া

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এআই কীভাবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে

ফাইল ছবি

Advertisement

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কেবল একটি ধারণা নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালজুড়েই বেশ কয়েকটি এআই সামিটের আয়োজন এবং সেগুলোয় বিপুল বৈশ্বিক উপস্থিতি বিষয়টির গুরুত্ব প্রমাণ করে। উল্লেখযোগ্য ইভেন্টগুলোর মধ্যে ছিল প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘এআই অ্যাকশন সামিট’ (১০-১১ ফেরুয়ারি), জেনেভায় ‘এআই ফর গুড গ্লোবাল সামিট’ (৮-১১ জুলাই), টরন্টোতে ‘দ্য গ্লোবাল এআই সামিট’ (২৭-২৯ অক্টোবর) এবং ফিনল্যান্ডের তুরকুতে অনুষ্ঠিত ‘এআই সামিট’ (১৭ নভেম্বর)। যা হোক, আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে এআই কীভাবে শাসনব্যবস্থা থেকে শুরু করে অর্থনীতি ও জনজীবনের মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে এখন গভীর বিশ্লেষণের সময় এসেছে। এ আলোচনায় আমার মূল বিশ্লেষণের বিষয় হলো গভর্নিং সিস্টেমকে কীভাবে একটি স্মার্ট প্রসেসের মধ্যে নিয়ে যাওয়া যাবে এবং এর একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা। প্রথাগত আইসিটি এবং অর্ধ-ডিজিটাল শাসনব্যবস্থাকে ‘স্মার্ট গভর্নিং সিস্টেমে’ রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সরকারি ফাইল ট্র্যাকিং, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ডেটা বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার করলে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং বছরের পর বছর ফাইল আদান-প্রদান ও সংরক্ষণের জটিলতা কমবে। গভর্ন্যান্সের বিভিন্ন সেক্টর, যেমন পাবলিক হেলথ কেয়ার, ডেমোক্রেটিক সিস্টেমস বা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে এআই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাবলিক হেলথ কেয়ারে সীমিত চিকিৎসক দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীর সেবা নিশ্চিত করতে এআইভিত্তিক ডায়াগনস্টিক সিস্টেম এবং টেলিমেডিসিন সেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে সুপার কম্পিউটিং ব্যবহার করে চোখের পলকে জটিল রোগের জিনোম বিশ্লেষণ এবং ওষুধ উদ্ভাবন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা যাবে। একইভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, জনমত বিশ্লেষণ এবং গুজব প্রতিরোধে এআই অ্যালগরিদম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। জনগণের অধিকার ও নৈতিকতা বজায় রাখার জন্য আমাদের যথাযথ ডেটা নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে।

শাসনব্যবস্থার পাশাপাশি ভৌত অবকাঠামো ও পরিবেশ রক্ষায় এআই-এর ভূমিকা অপরিসীম। আমাদের আলোচনায় রোড সেফটি বা সড়ক নিরাপত্তার এবং স্মার্ট পরিবহণ সেন্সিং ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে, যেখানে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টে এআই ক্যামেরা ও সেন্সর ব্যবহার করে যানজট নিরসন এবং সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে এ বিশাল পরিমাণ ডাটা রিয়েল টাইমে বিশ্লেষণ করে পুরো শহরের যানচলাচল নিমিষেই অপ্টিমাইজ বা যথাযথ উন্নয়ন ঘটাতে, বিশেষ করে আমাদের এ বিগ ডেটার বিশেষায়িত ডিজিটাল জগতে, সুপার কম্পিউটিং এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং অপরিহার্য ভূমিকা রাখতে পারে। কেবল সড়ক ব্যবস্থাপনাই নয়, পরিবেশ রক্ষায়ও এ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং প্রযুক্তি জটিল সব আবহাওয়া মডেল তৈরি করতে সক্ষম, যা আগেভাগে দূষণের বিস্তার বা কার্বন নিঃসরণের সুনির্দিষ্ট প্রভাব বুঝতে সাহায্য করবে। এছাড়া পরিবেশ বা এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট কন্ট্রোল এবং ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে এআই কীভাবে ভূমিকা রাখবে, তা অত্যন্ত জরুরি। এ খাতে যদি আমরা স্মার্ট এআই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে আমাদের জনগোষ্ঠীর কল্যাণ ও সহায়তার জন্য সব পক্ষের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে। একইভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়, ভূমিকম্প এবং বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের পূর্বাভাসে এআই-এর লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো নির্ভুল তথ্য নির্ণয়ে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধারকাজ দ্রুত ও সঠিক স্থানে পরিচালনা করা যাবে।

দেশ পরিচালনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসাবে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। সার্কুলার ইকোনমি বা বৃত্তাকার অর্থনীতি হলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলিত জ্ঞানের ক্ষেত্র, যেখানে উৎপাদন ও ভোগব্যবস্থা, বিদ্যমান উপকরণ এবং পণ্যগুলোকে বর্জ্যে পরিণত না করে যতক্ষণ সম্ভব শেয়ার, লিজ, পুনঃব্যবহার, মেরামত এবং রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে রাখা হয় এবং এ পুরো সম্পদের সাশ্রয়ের প্রক্রিয়াটিকে নিখুঁত ও কার্যকর করতে এআই অভাবনীয় ভূমিকা রাখতে পারে (সূত্র : এলেন ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশন)। এআই বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে যে, এ সার্কুলার ইকোনমি ইমপ্লিমেন্টেশনের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির এবং তথ্য বিশ্লেষণ বা ডেটা এনালিটিক্সের সঠিক ব্যবহার কীভাবে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করবে। রোবোটিক্স এবং এআই সেন্সর ব্যবহার করে বর্জ্য পৃথক্করণ এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় ও লাভজনক করার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। একটি বাস্তব ও কার্যকরী উদাহরণ হতে পারে আমাদের পরিবহণ শিল্পের জন্য বর্জ্যকে জ্বালানিতে রূপান্তর করা। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোয় প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়, এআই-চালিত রোবট নিখুঁতভাবে তা থেকে জ্বালানিযোগ্য উপাদান তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। এরপর আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এ বর্জ্যকে ‘বায়োফুয়েল’ বা ‘সিনথেটিক ফুয়েল’-এ রূপান্তর করা সম্ভব, যা আমাদের গণপরিবহণ এবং পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর শক্তির উৎস হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে। এতে একদিকে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হবে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হলো মানুষের জীবনে রূপান্তর এবং এআই কীভাবে এ সম্পর্কিত লাইফ ট্রান্সফর্মেশন ঘটাবে। বিশেষ করে জনশক্তি রপ্তানি করার যে জায়গাটা আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, সেখানে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞ তৈরি করা এবং এআই এক্সপার্টিজ ডেভেলপ করা এখন সময়ের দাবি। আমাদের বুঝতে হবে, এ দক্ষতাগুলো আজকের এই ডিজিটাল পৃথিবীতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে কী ধরনের নতুন সুযোগ তৈরি করে এবং তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। ফরেন এক্সচেঞ্জ বা বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে আমরা ডিজিটাল কারেন্সির কথা বলছি, যেখানে এআই রিলেটেড জ্ঞান এই স্মার্ট বিজনেস ওয়ার্ল্ডে কন্ট্রিবিউট করতে সাহায্য করবে। আমরা যদি আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকাই, তবে দেখব ভারত অনেক দূরে চলে গেছে, চীনও আমাদের থেকে বেশ এগিয়ে গেছে। তাদের অনেক ধরনের বিশেষজ্ঞ রয়েছে, যারা এআই-তে দক্ষ এবং স্পেশালাইজড। তারা বিভিন্ন ধরনের রোবোটিক প্রসেস অটোমেশন (আরপিএ), রোবোটিক সলিউশন এবং ড্রোনের ফাংশন তৈরি করছে। এগুলোর ব্যবহার নিয়ে আমাদের এখনো অনেক কাজ বাকি আছে। তাই আমাদের লক্ষ্য হতে হবে দক্ষিণ এশিয়ার বুকে একটি ‘রাইজিং বাবল’ হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা। আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? আমাদের সম্ভাবনা রয়েছে, তাই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে।

এ লক্ষ্য অর্জনে আধুনিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত শিক্ষার মাধ্যমে আমরা এমন কিছু ‘পাওয়ারফুল এবং প্রযুক্তিকেন্দ্রিক গ্র্যাজুয়েট’ তৈরি করতে চাই, যারা ভবিষ্যতে এআই গবেষণায় পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবে। প্রয়োজনে আমরা তাদের স্কলারশিপ দিয়ে বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোয় পাঠাব, যাতে তারা অত্যাধুনিক জ্ঞান অর্জন করে দেশের উন্নয়নে তা কাজে লাগাতে পারে। এজন্য আমাদের এমন একটা জনশক্তি তৈরি করতে হবে, যারা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত। ওপেন ট্রেনিং এবং প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে মোটিভেট করতে হবে এবং তাদের পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

একটি স্মার্ট ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা বা ডিজিটাল গভর্নিং সিস্টেম গড়ে তোলার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো। বৈদেশিক বাণিজ্যের গতি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনকে মসৃণ করতে ডিজিটাল কারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার প্রচলন এখন সময়ের দাবি। এজন্য আমাদের এমন একটি নিরাপদ ও অত্যাধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা প্রথাগত ব্যাংকিং জটিলতা কমিয়ে সীমান্তহীন বাণিজ্যকে সহজ করবে। ব্লকচেইন ও এআই-নির্ভর এ ব্যবস্থা বৈদেশিক লেনদেনের খরচ ও সময় কমাবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করবে, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধি বয়ে আনবে।

বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব জায়গায় এআই-এর ব্যবহার এবং এআইসংশ্লিষ্ট যত প্রকার শিক্ষা দরকার, সেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশকে একটি ‘এআই রিলেটেড নেশন’ হিসাবে গড়ে তোলা। একই সঙ্গে গভর্নিংয়ের সার্ভিসগুলো বিশুদ্ধ করা, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং দুর্নীতির জায়গাটাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য এআই-কে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে হবে। সরকারি কেনাকাটা ও অডিটে এআই মনিটরিং চালু করলে মানুষের হস্তক্ষেপ কমবে এবং দুর্নীতি নির্মূল হবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণাও প্রমাণ করে, সঠিক সময়ে এআই গ্রহণ করলে জিডিপি ও কর্মসংস্থানে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি ঘটে। তাই গবেষণা ও বাস্তবায়নের সমন্বয়ে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর জাতি গঠনের মাধ্যমেই আমরা আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারব। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।

ড. শাহ জে মিয়া : প্রফেসর অব বিজনেস এনালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া; বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বহির্বিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম