সাক্ষাৎকার
নেপালের দুর্যোগের শিক্ষা থেকে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে: মেজর (অব.) এ কে এম শাকিল নেওয়াজ
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মেজর (অব.) এ কে এম শাকিল নেওয়াজ একজন অগ্নি, দুর্যোগ ও সংকট ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক পরামর্শক ও প্রশিক্ষক এবং বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক পরিচালক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইউসিএসআই ও বিইউপি-এ খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি নেপালের আকস্মিক বন্যার পর উদ্ধার কর্মকাণ্ড এবং দেশের ভূমিকম্প দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নগর সুরক্ষা বিষয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ
যুগান্তর : ২০১৫ সালে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং সাম্প্রতিক নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী ট্র্যাজেডি-দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটের দুর্যোগ হলেও এগুলো থেকে প্রধানত কী বার্তা পাওয়া যায়?
মেজর (অব.) এ কে এম শাকিল নেওয়াজ : দুর্যোগ যখন আঘাত হানে, তখন শুধু ভবন, সেতু কিংবা সড়ক ভেঙে পড়ে না-মুহূর্তের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যায় কাগজে লেখা পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তব, প্রশিক্ষণ কতটুকু কার্যকর এবং রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের ভিত কতটা শক্ত। ২০১৫ সালের ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প এবং ২০২৬ সালের সীমান্ত এলাকার ভয়াবহ ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষপ্রবাহ ও আকস্মিক বন্যা-দুটি ভিন্ন প্রকৃতির দুর্যোগ হলেও এগুলোর মধ্যে একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। তা হলো, অন্যের সহায়তা গ্রহণের আগে একটি রাষ্ট্রকে নিজের সক্ষমতা, প্রয়োজন ও সীমাবদ্ধতা জানতে হয়। নেপালের ভূমিকম্পে প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত, ২১ হাজারের বেশি আহত এবং বিপুলসংখ্যক পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে এবারের ঘটনাটি ছিল উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের বরফ-পাথরধস, হিমবাহজাত ধ্বংসাবশেষপ্রবাহ এবং আকস্মিক বন্যার সম্মিলিত রূপ। এ দুটি ঘটনা প্রমাণ করে, দুর্যোগকালে আবেগ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সমন্বয় ও নিজস্ব সক্ষমতাই আসল ভূমিকা পালন করে।
যুগান্তর : ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক উদ্ধারকারী দল নেপালে গিয়েছিল। এতগুলো উদ্ধারকারী দলের উপস্থিতি কতটা কার্যকর হয়েছিল?
মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ : জাতিসংঘের সমন্বয়ে ৩১টি দেশের ৭৬টি নিবন্ধিত ইউএসএআর দলসহ শতাধিক আন্তর্জাতিক দল নেপালে পৌঁছেছিল। কিন্তু বিপুলসংখ্যক দল পৌঁছানো মানেই যে বিপুলসংখ্যক জীবন রক্ষা পাবে, এমন সরল সমীকরণ বাস্তবে কাজ করে না। দলগুলোর সক্ষমতা সমান ছিল না; অনেকে হালকা উদ্ধারে দক্ষ হলেও ভারী রিইনফোর্সড কংক্রিট ভেঙে গভীর ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ উদ্ধারের জন্য যে হেভি ইউএসএআর এবং ডিপ-কলাপস রেসকিউ সক্ষমতা প্রয়োজন, তা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
একটি বহুতল কংক্রিট ভবন ধসে পড়লে কংক্রিট কাটা, দেওয়াল ও মেঝে ছিদ্র করা, ভারী ধ্বংসাবশেষ উত্তোলন, শোরিং, টানেল তৈরি এবং সেন্সর বা ক্যামেরা ব্যবহারের মতো বিশেষায়িত দক্ষতার প্রয়োজন হয়। নেপালে সমন্বয়হীনতা, অসম্পূর্ণ তথ্য, ভাষাগত সমস্যা এবং বিমানবন্দর ও যোগাযোগে অতিরিক্ত চাপের কারণে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। প্রথম ৭২ ঘণ্টা বা ‘গোল্ডেন আওয়ার্সে’ আন্তর্জাতিক দলগুলোর ফ্লাইট, ইমিগ্রেশন ও নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সারতেই সময় চলে যায়। তাই প্রথম উদ্ধারকারী কোনো বিদেশি বিশেষজ্ঞ নন; প্রথম উদ্ধারকারী প্রায় সব সময়ই একজন প্রতিবেশী।
যুগান্তর : ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটে বড় ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশ কী পরিস্থিতিতে পড়বে?
মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ : ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটে বড় ভূমিকম্প হলে একই সঙ্গে হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সরু ও বাধাগ্রস্ত সড়ক, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ভবন, খোলা জায়গার অভাব, গ্যাস ও বিদ্যুৎ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড, হাসপাতালের ক্ষতি এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা উদ্ধার অভিযানকে ভয়াবহভাবে ব্যাহত করবে। বিমানবন্দর, বন্দর, সেতু কিংবা প্রধান মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিদেশি দল ও ভারী সরঞ্জাম আসার আগেই জীবিত উদ্ধারের সবচেয়ে মূল্যবান সময় পেরিয়ে যেতে পারে। তাই বিদেশি উদ্ধারকারী দলের ওপর নির্ভরতাকে বাংলাদেশের জাতীয় পরিকল্পনার প্রধান ভিত্তি বানানোর কোনো সুযোগ নেই।
যুগান্তর : বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতি ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত?
মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ : নেপালের শিক্ষা হলো, সহায়তার দরজা কখন খুলতে হবে, কাকে প্রবেশ করতে দিতে হবে এবং কাজ শেষ হলে কখন সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানাতে হবে-সেই সক্ষমতা অর্জন করা। বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত-‘যে আসতে চায় তাকে গ্রহণ’ নয়; বরং ‘জাতীয়ভাবে যে বিশেষ সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে, শুধু সেটিই চাওয়া’। আমাদের মূল করণীয়গুলো হলো : ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের হেভি ইউএসএআর দল গঠন করা, যারা অন্তত ৭২ ঘণ্টা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কাজ করতে পারবে। কে-৯, রোপ রেসকিউ, কারিগরি সরঞ্জাম ও চিকিৎসাব্যবস্থাকে একক কমান্ডে আনা। একটি স্থায়ী ন্যাশনাল ইউএআর কোঅর্ডিনেশন সেল, জাতীয় ডিভিআই ব্যবস্থা এবং কাস্টমস-ইমিগ্রেশনের জন্য রিসিপশন অ্যান্ড ডিপার্টচার সেন্টার তৈরি রাখা। প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রশিক্ষিত কমিউনিটি লাইট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দল গঠন করা, যেন স্থানীয় বাসিন্দারা প্রাথমিক ঘণ্টায় প্রথম উদ্ধারকারী হিসাবে কাজ করতে পারেন।
যুগান্তর : ভূমিকম্পের প্রকৃতি এবং ঢাকার জন্য এর ঝুঁকির মাত্রা ঠিক কতটা উদ্বেগজনক বলে মনে করেন?
মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ : ভূমিকম্প দরজায় কড়া নেড়ে আসে না। আগুনের মতো তার ধোঁয়া দেখা যায় না, আবার বন্যার মতো পানি বাড়ার পূর্বাভাসও মেলে না। অথচ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের কম্পনেই একটি শহরের বহু বছরের উন্নয়ন, হাজারো পরিবারের স্বপ্ন এবং একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়তে পারে। সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক সতর্ক করেছেন-বড় ভূমিকম্পে ঢাকার বহু এলাকায় উদ্ধারকারী দলের পৌঁছানো কঠিন হবে; কোথাও কোথাও উদ্ধার অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। তার এ বক্তব্যকে একটি সংস্থার সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তি হিসাবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে আমাদের নগরসভ্যতার স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন-যেখানে রোগ বহু পুরোনো, কিন্তু চিকিৎসা এখনো খণ্ডিত।
যুগান্তর : ভূমিকম্পের পরপরই ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ঠিক কী ধরনের বাস্তব সংকটের মুখোমুখি হতে হবে?
মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ : ঢাকার দুর্যোগঝুঁকির সবচেয়ে নির্মম দিক হলো বিপদ শুধু ভবনধসে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বড় ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া ভবন, বন্ধ সড়ক, বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত গ্যাসলাইন, অগ্নিকাণ্ড, পানির সংকট, আতঙ্কিত জনতা এবং হাসপাতালের ওপর অস্বাভাবিক চাপ-সবকিছু একই সময়ে ঘটতে পারে। সাধারণ অবস্থায় যে পথ অতিক্রম করতে ১০ মিনিট লাগার কথা, যানজটে সেখানে ফায়ার সার্ভিসের এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যেতে পারে। ভূমিকম্পের পর সেই রাস্তা ধ্বংসস্তূপ, পরিত্যক্ত গাড়ি কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত উড়ালসড়কের কারণে আদৌ চলাচলযোগ্য থাকবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
যুগান্তর : ফায়ার সার্ভিস ঢাকার ৪১টি কেন্দ্র ও সারা দেশের ১০০টি স্টেশনে উদ্ধার সরঞ্জাম তৈরি রেখেছে। এটি কতটা কার্যকর হবে বলে মনে করেন?
মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ : উদ্যোগগুলো সময়োপযোগী। তবে ঢাকার প্রবেশপথ, সেতু ও মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাইরের দল কীভাবে পৌঁছাবে? একই সময়ে শত শত বা হাজারো স্থানে সাহায্যের প্রয়োজন হলে ৪১টি সরঞ্জাম কেন্দ্র কি সচল থাকবে? সেখানে কি প্রশিক্ষিত জনবল, বিকল্প বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং পরিবহণের ব্যবস্থা থাকবে? দুর্যোগ প্রস্তুতিতে সরঞ্জাম কেনা তুলনামূলক সহজ; কঠিন হলো সরঞ্জামের চারপাশে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একটি কাটার, ক্যামেরা, ড্রোন বা উদ্ধারযন্ত্র নিজে জীবন বাঁচায় না। জীবন বাঁচায় প্রশিক্ষিত মানুষ, দ্রুত সিদ্ধান্ত, নিরাপদ প্রবেশপথ, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ এবং সমন্বিত নেতৃত্ব।
যুগান্তর : আমাদের দেশে একটা প্রবণতা দেখা যায়-যে কোনো দুর্যোগে ফায়ার সার্ভিসকেই সব দায়িত্ব নিতে হয়। ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এটি কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ : আমাদের মধ্যে একটি বিপজ্জনক ধারণা রয়েছে-আগুন লাগলে, ভবন ধসলে বা রাসায়নিক দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিস; এমনকি ভূমিকম্পে পুরো মহানগর বিপর্যস্ত হলেও যেন ফায়ার সার্ভিসই সব সামলে নেবে। ফায়ার সার্ভিস নিঃসন্দেহে উদ্ধার অভিযানের অগ্রবর্তী ও অপরিহার্য শক্তি। কিন্তু বড় ভূমিকম্পে তাদের স্টেশনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কর্মীরা হতাহত হতে পারেন, গাড়ি বের করার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, পানির উৎস অকার্যকর হতে পারে এবং যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কেবল ফায়ার সার্ভিসের ওপর দায়িত্ব চাপানো উত্তাল সমুদ্রে একটি লাইফবোট দিয়ে পুরো জাহাজের যাত্রীদের বাঁচানোর চেষ্টা করার মতো। ধ্বংসস্তূপে শুধু ফায়ার সার্ভিস নয়, নামতে হবে গোটা রাষ্ট্রকে।
যুগান্তর : সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য আধা সামরিক বাহিনীর ভূমিকাকে জরুরি কাঠামোতে কীভাবে যুক্ত করা সম্ভব?
মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ : বড় ভূমিকম্পে বেসামরিক সক্ষমতা দ্রুত অতিক্রান্ত হয়ে যেতে পারে। তখন সশস্ত্র বাহিনীর প্রকৌশল, চিকিৎসা, পরিবহণ, যোগাযোগ, বিমান সহায়তা, ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ জনবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। কিন্তু ‘প্রয়োজনে সেনাবাহিনী আসবে’-এমন অস্পষ্ট ধারণা কোনো অভিযান পরিকল্পনা নয়। কোন ইউনিট কোন অঞ্চলে দায়িত্ব নেবে, ভারী প্রকৌশল সরঞ্জাম কোথায় থাকবে, হেলিকপ্টার ওঠানামার স্থান কোথায়, মাঠ হাসপাতাল কত সময়ে চালু হবে এবং সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় কীভাবে হবে-এসব আগেই পরিকল্পিত ও মহড়ায় পরীক্ষিত হতে হবে। পুলিশকে জননিরাপত্তা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ, বিজিবিকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষা ও সহায়কারী উদ্ধার এবং আনসার-ভিডিপিকে স্থানীয় জনবল সংগঠন, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা, ত্রাণশৃঙ্খলা ও প্রাথমিক সহায়তার জন্য প্রস্তুত করা যায়। প্রতিটি বাহিনীর স্বতন্ত্র শক্তিকে এক অভিযানের ছাতার নিচে যুক্ত করাই হবে রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা।
যুগান্তর : ভবনগুলোর বর্তমান অবস্থা ও বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ : উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি; কিন্তু মানুষকে ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়তে না দেওয়া আরও জরুরি। দুর্বল ভবনগুলো একেকটি নীরব সময়বোমা-ভূমিকম্প কেবল বিস্ফোরণের বোতামটি চাপবে। হাসপাতাল, বিদ্যালয়, ফায়ার স্টেশন, সেতু, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র এবং পানি-গ্যাস অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঝুঁকিভিত্তিক মূল্যায়ন ও শক্তিশালীকরণ শুরু করতে হবে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডকে শুধু নকশায় অনুমোদনের সিল হিসাবে দেখলে চলবে না। মাটি পরীক্ষা থেকে নকশা, নির্মাণসামগ্রী, প্রকৌশল তদারকি, ব্যবহার পরিবর্তন ও রক্ষণাবেক্ষণ-প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। উদ্ধারযন্ত্র কেনা ফুটো নৌকায় পাম্প বসানোর মতোই অর্থহীন, যদি দুর্বল ভবনগুলো এভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়।
যুগান্তর : আমাদের এসব প্রস্তুতির সঠিক পরীক্ষা কীভাবে নেওয়া সম্ভব?
মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ : প্রস্তুতির পরীক্ষা কাগজে নয়, মাঠে হতে হবে। প্রয়োজন একটি পূর্ণমাত্রার জাতীয় ভূমিকম্প মহড়া-যেখানে একই সঙ্গে সড়ক বন্ধ, বিদ্যুৎবিচ্ছিন্নতা, মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যর্থতা, একাধিক অগ্নিকাণ্ড, হাসপাতালের অতিরিক্ত রোগী, জনতার আতঙ্ক এবং পরাঘাতের পরিস্থিতি অনুশীলন করা হবে। মহড়া শেষে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে : কোন দল কত সময়ে পৌঁছাল, কোথায় কমান্ড ব্যর্থ হলো, কোন যন্ত্র কাজ করল না এবং কোন হাসপাতাল রোগী নিতে পারল না। ভুল গোপন করলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি সাময়িকভাবে রক্ষা পায়; ভুল শনাক্ত করে সংশোধন করলে রক্ষা পায় মানুষের জীবন। ভূমিকম্পের সবচেয়ে নির্মম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কয়েক সেকেন্ডে বহু বছরের অবহেলার হিসাব মিলিয়ে দেয়। কম্পনের পর কমিটি করা যাবে, তদন্ত ঘোষণা করা যাবে; কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় ও জীবন ফিরিয়ে আনা যাবে না।
যুগান্তর : সবশেষে এ বিষয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে কী বার্তা দিতে চান?
মেজর শাকিল নেওয়াজ (অব.) : ধ্বংসস্তূপ থেকে একজন মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা বীরত্ব। কিন্তু এমন নগর ও রাষ্ট্র নির্মাণ করা, যেখানে অবহেলার কারণে মানুষকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়তে হবে না-সেটিই সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। মাটি কবে কাঁপবে, আমরা জানি না। কিন্তু মাটি কাঁপলে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকবে, নাকি তার প্রতিষ্ঠানগুলোও ধসে পড়বে-সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আজই। ভূমিকম্পের পরে উদ্ধার নয়-বিপর্যয়ের আগেই জীবন বাঁচাতে হবে।
যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ : ধন্যবাদ।

