Logo
Logo
×
   

Advertisement

বাতায়ন

সক্ষমতা, চ্যালেঞ্জ ও বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা

Advertisement

Icon

মেজর জেনারেল (অব.) এইচ আর এম রোকন উদ্দিন

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

‘কারও সঙ্গে যুদ্ধ হবে না, তাই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নেরও প্রয়োজন নেই’-এ ধরনের বক্তব্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচায়ক। যুদ্ধ কাম্য নয় এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অবশ্যই শান্তি ও সহযোগিতা। কিন্তু কোনো দেশ শুধু নিজের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে নিরাপদ থাকতে পারে না। যুদ্ধ হবে কি না, সেটি একা বাংলাদেশ নির্ধারণ করে না; আঞ্চলিক সংঘাত, সীমান্ত পরিস্থিতি, আকাশসীমা লঙ্ঘন, সমুদ্রসম্পদ, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার আক্রমণ, ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মতো হুমকিও নিরাপত্তার পরিবেশ নির্ধারণ করে। আধুনিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান উদ্দেশ্য যুদ্ধ করা নয়; বরং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে আগ্রাসন থেকে বিরত রাখা, সংকটকালে সরকারকে কূটনৈতিক বিকল্প দেওয়া এবং প্রয়োজনে দেশের স্বাধীনতা ও জনগণকে রক্ষা করা। প্রতিরক্ষা বাহিনীকে অপ্রয়োজনীয় বলার পেছনে সবার উদ্দেশ্য এক নয়। কেউ বিষয়টি না বুঝে মন্তব্য করেন, কেউ উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা ব্যয়কে পরস্পরবিরোধী মনে করেন, আবার কেউ বিদেশি রাজনৈতিক ও প্রচারণামূলক বয়ান পুনরাবৃত্তি করেন। প্রতিরক্ষা ব্যয় অবশ্যই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করে অবাধে বাড়ানো উচিত নয়; একইভাবে উন্নয়নের অজুহাতে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অবহেলা করাও বিপজ্জনক। নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্রের অর্থনীতি, অবকাঠামো, সমুদ্রসম্পদ, বিনিয়োগ এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘ মেয়াদে সুরক্ষিত থাকে না।

২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার চীনের সঙ্গে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার আনুষ্ঠানিক আলোচনার দিকে এগোচ্ছে এবং একটি সরকারি কমিটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বিমানের সংখ্যা, মোট মূল্য এবং সরবরাহের সময়সূচি তখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংবাদমাধ্যমে সর্বোচ্চ ২৪টি জে-১০সিই কেনার কথা বলা হলেও সম্পাদিত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত একে নিশ্চিত সংখ্যা হিসাবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। জে-১০সিই একটি আধুনিক এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট বহুমুখী যুদ্ধবিমান। এটি আকাশ থেকে আকাশে যুদ্ধ, ভূমি ও সামুদ্রিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত এবং নির্দিষ্ট মাত্রায় ইলেকট্রনিক যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারে। এর এইএসএ রাডার একই সঙ্গে একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত ও অনুসরণ করতে সক্ষম। বিমানটি দৃষ্টিসীমার বাইরের লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে পিএল-১৫ই এবং কাছাকাছি যুদ্ধের জন্য পিএল-১০ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে। চীনের প্রকাশিত তথ্যে পিএল-১৫ই-এর সর্বোচ্চ পাল্লা ২০০ কিলোমিটারের বেশি বলা হলেও বাস্তব কার্যকর পাল্লা লক্ষ্যবস্তুর উচ্চতা, গতি, অবস্থান, রাডার ও ডেটালিংকের মান এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

জে-১০সিই সংগ্রহ করা হলে বাংলাদেশের এফ-৭নির্ভর যুদ্ধবিমান বহরের তুলনায় তা বড় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হবে। এফ-৭ মূলত পুরোনো মিগ-২১ নকশা থেকে রূপান্তরিত এবং আধুনিক দৃষ্টিসীমার বাইরের আকাশযুদ্ধ ও নেটওয়ার্কভিত্তিক অভিযানে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জে-১০সিই উন্নত রাডার, দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, আধুনিক ককপিট, ডেটালিংক এবং বহুমুখী আক্রমণক্ষমতা দিতে পারে। আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী বিমানকে বাধা দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা এবং বঙ্গোপসাগরের ওপর কার্যকর নজরদারি ও সীমিত আকাশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে ২০ বা ২৪টি আধুনিক যুদ্ধবিমান কিনলেই বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হয়ে যাবে-এ ধারণা ভুল। যুদ্ধবিমান সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি অংশ মাত্র। কার্যকর প্রতিরক্ষার জন্য দূরপাল্লার ও নিচু উচ্চতার রাডার, নিরাপদ যোগাযোগ, স্বয়ংক্রিয় কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল, ডেটালিংক, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, বিভিন্ন পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, সুরক্ষিত বিমানঘাঁটি, বিকল্প রানওয়ে, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল এবং টেকসই রসদ ব্যবস্থা দরকার। একটি অত্যাধুনিক বিমান যদি সময়মতো লক্ষ্যবস্তুর তথ্য না পায়, যথেষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র না থাকে অথবা শত্রুর প্রথম আঘাতে ঘাঁটি ও রাডার অচল হয়ে যায়, তবে কাগজে থাকা সক্ষমতা বাস্তবে কাজে আসবে না।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এ সমন্বিত কাঠামোর কিছু ভিত্তি তৈরি করেছে। বিমানবাহিনীর হাতে এফএম-৯০ স্বল্পপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা বিমান, ড্রোন ও ক্রজ ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করতে পারে। ২০২৫ সালে বিমান বাহিনীর ৭১ স্কোয়াড্রন এবং বগুড়া রাডার ইউনিটে আধুনিক জিএম-৪০৩এম আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো দীর্ঘপাল্লার নজরদারি ও লক্ষ্য অনুসরণে অগ্রগতি হলেও পুরো দেশের ওপর নিচু উচ্চতাসহ নিরবচ্ছিন্ন ও বহুস্তরীয় কভারেজ নিশ্চিত করতে আরও মোবাইল রাডার, গ্যাপ-ফিলার রাডার, প্যাসিভ সেন্সর এবং সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা প্রয়োজন। বাংলাদেশে জে-১০সিই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের মৌলিক মানবসম্পদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রয়েছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী বহু দশক ধরে চীনা এফ-৬, এফ-৭, এফটি-৭, কে-৮, রুশ মিগ-২৯ ও ইয়াক-১৩০ এবং পশ্চিমা পরিবহণ বিমান পরিচালনা করেছে। ফলে দেশে ফাইটার পাইলট, প্রকৌশলী, অস্ত্রবিশেষজ্ঞ, রাডার অপারেটর ও গ্রাউন্ড ক্রু তৈরির ব্যবস্থা আছে। কিন্তু জে-১০সিই আসার পর বর্তমান জনবল কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়া পূর্ণ সক্ষমতায় বিমানটি পরিচালনা করতে পারবে না।

নির্বাচিত পাইলটদের কনভার্সন ট্রেনিং, উচ্চমানের সিমুলেটর অনুশীলন, এসইএসএ রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, দৃষ্টিসীমার বাইরের ক্ষেপণাস্ত্র এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক যৌথ অভিযান পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রকৌশলীদের ইঞ্জিন, অ্যাভিওনিকস, সফটওয়্যার, অস্ত্র ও গ্রাউন্ড সাপোর্ট ব্যবস্থার ওপর পৃথক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ক্রয়চুক্তিতে তাই শুধু বিমান নয়, পূর্ণ মিশন সিমুলেটর, প্রশিক্ষণ প্যাকেজ, টেস্ট বেঞ্চ, অতিরিক্ত ইঞ্জিন, সফটওয়্যার সহায়তা এবং কয়েক বছরের পর্যাপ্ত খুচরা যন্ত্রাংশ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তা না হলে কয়েক বছরের মধ্যেই বিমানের সার্ভিসেবিলিটি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। বাংলাদেশ ১৯৯৯-২০০০ সালে আটটি মিগ-২৯, ছয়টি এক আসনের মিগ-২৯ এসই এবং দুটি দুই আসনের মিগ-২৯ ইউবি কিনেছিল। এগুলো দীর্ঘদিন দেশের সবচেয়ে সক্ষম যুদ্ধবিমান হলেও বহরটি খুব ছোট। এর দুটি আরডি-৩৩ ইঞ্জিন, রুশ সরবরাহনির্ভর যন্ত্রাংশ এবং নিয়মিত ওভারহল ব্যয়বহুল। ২০২৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আটটি বিমানের জন্য থাকা ২০টি আরডি-৩৩ ইঞ্জিনের মধ্যে তখন মাত্র ছয়টি সচল ছিল। ১২টি ইঞ্জিন মেরামত, ওভারহল ও আয়ুষ্কাল বাড়াতে রাশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় ৩০.৬ মিলিয়ন ডলার বা আনুমানিক ৩৮০ কোটি টাকার চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সরবরাহ সমস্যা এবং বাজেট সীমাবদ্ধতায় এ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছিল।

আটটি মিগ-২৯-এর মধ্যে চারটি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বেলারুশে ওভারহল ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করে। অবশিষ্ট চারটির জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেলারুশের জেএসসি ৫৫৮ এয়ারক্র্যাফট রিপেয়ার প্লান্টের সঙ্গে চুক্তি হয় এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সেগুলো ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্টে ঠিক কয়টি বিমান দৈনিকভাবে যুদ্ধোপযোগী, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি প্রকাশ্য সংখ্যা নেই। কোনো বাহিনীর মোট ইনভেন্টরি এবং নির্দিষ্ট দিনে মিশন পরিচালনায় সক্ষম বিমানের সংখ্যা এক নয়। তাই ‘সব আটটি সচল’ অথবা ‘সবগুলো অচল’-সরকারি হালনাগাদ তথ্য ছাড়া কোনো দাবিই গ্রহণযোগ্য নয়। মিগ-২৯ প্রকল্প থেকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া দরকার। শুধু বিমানের ক্রয়মূল্য দেখলে চলে না; ইঞ্জিন, ওভারহল, খুচরা যন্ত্রাংশ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, উড্ডয়নঘণ্টা, সফটওয়্যার এবং যুদ্ধকালীন মজুতসহ পুরো জীবনচক্রের ব্যয় নিশ্চিত করতে হয়। মাত্র আটটি বিমানের বহর পরিচালনায় প্রতি বিমানের স্থায়ী ব্যয় বেড়ে যায় এবং বিদেশি সরবরাহকারী সমস্যায় পড়লে গোটা স্কোয়াড্রনের প্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জে-১০সিই কেনার ক্ষেত্রে এ ভুলের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। কমপক্ষে দুটি কার্যকর স্কোয়াড্রন গঠনের পরিকল্পনা থাকা উচিত; তবে অর্থনৈতিক সামর্থ্য বিবেচনায় ধাপে ধাপে বিমান সংগ্রহ করে প্রথম ব্যাচের কার্যকারিতা ও রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা যাচাই করা যুক্তিসংগত হবে।

চুক্তির আগে বাংলাদেশের ভূগোল ও সম্ভাব্য হুমকির ভিত্তিতে জে-১০সিই-এর কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন করা দরকার। রাডারের সক্ষমতা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্রের রপ্তানি সংস্করণ, সফটওয়্যার ও ডেটালিংক, ইঞ্জিনের আয়ু, প্রতি উড্ডয়নঘণ্টার ব্যয় এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহের নিশ্চয়তা পরীক্ষা করতে হবে। গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষায় বাংলাদেশি পাইলট ও প্রকৌশলীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। চুক্তিতে নির্দিষ্টসংখ্যক বিমান সব সময় সচল রাখার নিশ্চয়তা, সরবরাহে বিলম্ব হলে জরিমানা এবং দেশে পর্যায়ক্রমে ভারী রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা তৈরির বিধান থাকা উচিত। বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সত্যিকারভাবে শক্তিশালী করতে হালনাগাদ জাতীয় আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করতে হবে। সম্ভাব্য হুমকির মধ্যে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ক্রজ ক্ষেপণাস্ত্র, সশস্ত্র ও বাণিজ্যিক ড্রোন, ইলেকট্রনিক এবং সাইবার আক্রমণ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কোনো একটি সম্ভাব্য দেশের নাম ধরে বাহিনী সাজানোর পরিবর্তে সক্ষমতাভিত্তিক পরিকল্পনা করলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে। স্থায়ী দীর্ঘপাল্লার রাডারের সঙ্গে মোবাইল থ্রিডি ও গ্যাপ-ফিলার রাডার, উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলের সেন্সর, প্যাসিভ ডিটেকশন ব্যবস্থা এবং বেসামরিক রাডারের প্রয়োজনীয় তথ্য যুক্ত করতে হবে। এসব তথ্য একটি সুরক্ষিত যৌথ কমান্ড নেটওয়ার্কে এনে বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান, সেনাবাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট এবং নৌবাহিনীর জাহাজকে একই অপারেশনাল চিত্র দিতে হবে।

এর সঙ্গে স্তরভিত্তিক ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এফএম-৯০ গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ও স্থাপনার শেষ স্তরের প্রতিরক্ষা দিতে পারলেও এর সঙ্গে মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার-নিয়ন্ত্রিত গান এবং সফট-কিল ও হার্ড-কিল অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা যুক্ত করা জরুরি। রাজধানী, বিমানঘাঁটি, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি স্থাপনা, কমান্ড সেন্টার ও গুরুত্বপূর্ণ সেতুকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করতে হবে। বিমানঘাঁটির স্থায়িত্ব বাড়াতে শক্তিশালী শেল্টার, ছদ্মবেশ, ভুয়া লক্ষ্যবস্তু, দ্রুত রানওয়ে মেরামত, বিকল্প রানওয়ে এবং বিমান, জ্বালানি ও অস্ত্র ছড়িয়ে রাখার ব্যবস্থা দরকার। আধুনিক যুদ্ধে প্রতিপক্ষ প্রথমেই রানওয়ে, রাডার ও মাটিতে থাকা বিমান ধ্বংস করার চেষ্টা করে। ফলে আকাশে উন্নত বিমান থাকলেও মাটিতে দুর্বলভাবে রাখা হলে তা কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে পারবে না। অস্ত্র ও রসদের পর্যাপ্ত মজুতও নিশ্চিত করতে হবে। কয়েকটি প্রদর্শনী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আধুনিক স্কোয়াড্রন যুদ্ধক্ষম হয় না। প্রশিক্ষণ ও সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য যথেষ্ট আকাশযুদ্ধের ক্ষেপণাস্ত্র, নির্ভুল আকাশ-থেকে-ভূমি অস্ত্র, অ্যান্টি-শিপ অস্ত্র, ডিকয়, জ্যামিং পড ও অতিরিক্ত ইঞ্জিন দরকার। একইসঙ্গে দেশে বিমান ও ইঞ্জিনের নির্দিষ্ট পর্যায়ের মেরামত, অ্যাভিওনিকস পরীক্ষা, রাডার মডিউল প্রতিস্থাপন এবং প্রশিক্ষণ সিমুলেটর তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিরক্ষা ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও পেশাগত জবাবদিহিতাও জরুরি। সব কারিগরি তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব নয়, কিন্তু সংসদীয় তদারকি, স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা, জীবনচক্র ব্যয়ের হিসাব এবং ক্রয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করা সম্ভব। কমিশননির্ভর ক্রয়, রাজনৈতিক পছন্দ অথবা একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে। আবার বহু দেশের ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্ম কিনলে অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে।

জে-১০সিই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় ও সম্ভাবনাময় সক্ষমতা হতে পারে, বিশেষত পুরোনো এফ-৭ বহরের উত্তরসূরি হিসাবে। যথাযথ অস্ত্র, রাডার, ডেটালিংক, প্রশিক্ষণ, রসদ ও স্তরভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার সঙ্গে যুক্ত হলে এটি বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরোধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। তবে একে কোনো জাদুকরী সমাধান ভাবা যাবে না। বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু নতুন যুদ্ধবিমান নয়; প্রয়োজন একটি সমন্বিত, টেকসই, নেটওয়ার্কভিত্তিক এবং প্রথম আঘাতের পরও কার্যকর থাকতে সক্ষম জাতীয় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। শান্তি রক্ষার নির্ভরযোগ্য উপায় হলো শান্তিপূর্ণ নীতি অনুসরণের পাশাপাশি আগ্রাসনকে ব্যয়বহুল করে তোলার মতো প্রতিরোধক্ষমতা রাখা। আধুনিক বিমানবাহিনী বিলাসিতা নয়, আবার যাচাইহীন অস্ত্র কেনাও দেশপ্রেম নয়। প্রকৃত দেশপ্রেম হলো হুমকি ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন, প্রতিটি টাকার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিদেশি সরবরাহনির্ভর বাহিনীকে ধীরে ধীরে প্রযুক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণে আত্মনির্ভর করে তোলা। বাংলাদেশের আকাশ স্বাধীন রাখতে এ ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি পথের কোনো বিকল্প নেই।

মেজর জেনারেল (অব.) এইচ আর এম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম