Logo
Logo
×
   

Advertisement

বাতায়ন

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায় ও উপমহাদেশের রক্তাক্ত বিভাজন

Advertisement

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায় ও উপমহাদেশের রক্তাক্ত বিভাজন

Advertisement

কিছু ইতিহাস পড়েই শেষ করা যায় না, অনুভবও করতে হয়। ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান-ভারত সৃষ্টি তেমনই এক ইতিহাস। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ ছিল এমন এক ইতিহাস, যেখানে স্বাধীনতার আনন্দের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল অগণিত মানুষের কান্না, রক্ত, হারিয়ে যাওয়া শৈশব এবং ভিটেমাটিছাড়া জীবনের আর্তনাদ। এমনটা কি অনিবার্য ছিল? নাকি এটা ছিল ব্রিটিশদের ব্যর্থতা, নীতিহীনতা আর মিথ্যাচার এবং ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাকে আড়াল করার একটি গভীর ফাঁদ? স্ট্যানলি উলপার্টের ‘শেমফুল ফ্লাইট : দ্য লাস্ট ইয়ার্স অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থটি উপমহাদেশের সেই ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ, তীক্ষ্ণ এবং বিতর্কিত অধ্যায়কে সামনে নিয়ে আসে। সাধারণভাবে পাকিস্তান-ভারত সৃষ্টিকে ব্রিটিশদের ‘স্বাধীনতা প্রদান’ বা ‘শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর’ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে এটি ছিল এক তড়িঘড়ি, অপরিণামদর্শী এবং রক্তক্ষয়ী বিভাজন। ওই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ছিল আসলে লর্ড লুইস মাউন্টব্যাটেনের পক্ষপাতদুষ্ট নীতি, ব্রিটিশ প্রশাসনের চরম অব্যবস্থা, কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক চালবাজি। উলপার্ট সেটাই সামনে এনেছেন।

বইটি ব্রিটিশ ভারতের শেষ পর্যায়, বিশেষ করে ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ সালের ঘটনাপ্রবাহ এবং সেই প্রক্রিয়ায় ব্রিটিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ হাজির করে। উলপার্ট এ গ্রন্থে শুধু ইতিহাস বর্ণনা করেন না; তিনি ইতিহাসের নৈতিক দায়, রাজনৈতিক ব্যর্থতা, ঔপনিবেশিক ক্ষমতার অপসারণ এবং দেশবিভাগের মানবিক ট্র্যাজেডিকে একত্রে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেন। তার মূল বক্তব্য স্পষ্ট : ব্রিটিশরা ভারত থেকে বিদায় নিয়েছিল দ্রুত, অবিবেচক ও দায়িত্বহীনভাবে; আর সেই ‘পলায়ন’ লাখ লাখ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।

গ্রন্থটির শিরোনামই এক গভীর অভিযোগ বহন করে। ‘Shameful Flight’ বা ‘লজ্জাজনক পলায়ন’ শুধু ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যিক গৌরবহীন প্রস্থানকে বোঝায় না, বরং সেই প্রস্থানের সময় তাদের অব্যবস্থা, তাড়াহুড়া এবং নৈতিক অবক্ষয়কেও নির্দেশ করে। উলপার্টের মতে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অবশ্যই এক ঐতিহাসিক বিজয়, কিন্তু সেই স্বাধীনতার পথে ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্ব ছিল বিশৃঙ্খল, আত্মকেন্দ্রিক এবং মানবিক দায়বোধহীন।

উলপার্টের প্রধান যুক্তি হলো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভারত শাসন করেছে প্রায় দুইশ বছর ধরে, কিন্তু যখন বিদায়ের মুহূর্ত এলো, তখন তারা একটি শান্তিপূর্ণ, সুবিন্যস্ত ও ন্যায্য ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো রাষ্ট্রনায়কসুলভ দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। বরং তারা এমন এক অস্থির ও বিপজ্জনক উত্তরণ ঘটায়, যা দেশবিভাগকে প্রায় অনিবার্য গৃহযুদ্ধের রূপ দেয়। লেখকের মতে, ব্রিটিশরা নিজেদের সাম্রাজ্যিক স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষার চিন্তায় এতটাই ব্যস্ত ছিল যে, ভারতীয় সমাজের জটিল বাস্তবতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাকে তারা যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।

এ গ্রন্থে উলপার্ট দেশবিভাগকে শুধু কংগ্রেস-মুসলিম লীগ বিরোধ বা সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ফল হিসাবে দেখেন না। তিনি দেখান, ব্রিটিশ নীতি, বিশেষত শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের নেতৃত্ব বিভাজনকে আরও ত্বরান্বিত করে এবং সংকটকে আরও ঘনীভূত করে। কাজেই গ্রন্থটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি দেশবিভাগকে একরৈখিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসাবে দেখার পরিবর্তে এক বহুমাত্রিক, জটিল এবং নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত প্রক্রিয়া হিসাবে উপস্থাপন করে।

আবার কংগ্রেস নেতা নেহরুর প্রতি মাউন্টব্যাটেনের অন্ধ বিশ্বাস, ঘনিষ্ঠতা, নেহরুর পরামর্শ ও মতামতকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসাবে গ্রহণ, জিন্নাহর প্রতি বৈরী মনোভাব প্রকাশের কাজটিও উলপার্ট করেছেন।

স্ট্যানলি উলপার্ট একজন জনপ্রিয় ইতিহাসবেত্তা এবং তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নাটকীয়তা ও স্পষ্ট অবস্থান। তিনি নিরপেক্ষ ভঙ্গিতে দূর থেকে ইতিহাসের বর্ণনা করেন না; বরং ইতিহাসের ভেতরের নৈতিক উত্তেজনা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং মানবিক মূল্যকে সামনে আনেন। শেমফুল ফ্লাইটে তার ভাষা প্রাঞ্জল, সরল এবং একই সঙ্গে আবেগময়। এটি এমনভাবে লেখা, যাতে সাধারণ পাঠকও গ্রন্থটির জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুধাবন করতে পারেন।

তবে এ শক্তির মধ্যেই কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। উলপার্টের অবস্থান এতটাই দৃঢ় যে, অনেক সময় তার বিশ্লেষণকে কিছুটা একমুখী মনে হতে পারে। তিনি ব্রিটিশ প্রশাসনের ব্যর্থতাকে এতটাই জোরালোভাবে তুলে ধরেন যে, ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিজেদের মধ্যে বিভাজন, কৌশলগত ভুল এবং দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তাকে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনায় আনেন। যদিও এটি বইটির প্রধান যুক্তিকে দুর্বল করে না, তবু ভারসাম্যপূর্ণ ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিতে এটি একটি বিবেচ্য বিষয়।

গ্রন্থটির একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন। উলপার্ট তার মাধ্যমে দেখান, কীভাবে একজন আত্মবিশ্বাসী, আধুনিক ও কূটনৈতিকভাবে সজ্জিত মনে হওয়া প্রশাসকও ইতিহাসের জটিল মুহূর্তে ভয়াবহ ভুল করতে পারেন। মাউন্টব্যাটেন ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শেষ প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল ১৯৪৮ সালের জুনে ক্ষমতা হস্তান্তর, কিন্তু পরে তা ১৯৪৭ সালের আগস্টে এগিয়ে আনা হয়। এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রশাসনিক প্রস্তুতির সময় সংকুচিত হয়ে যায় ভয়াবহভাবে।

উলপার্ট দেখান, এ তাড়াহুড়া শুধু রাজনৈতিক ভুল ছিল না; এটি ছিল মানবিক বিপর্যয়ের রেসিপি। সীমান্ত নির্ধারণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সম্পত্তি বণ্টন, প্রশাসনিক কাঠামো স্থানান্তর-এসবই অসম্পূর্ণ ছিল। ফলাফল ছিল রক্তপাত, উদ্বাস্তু স্রোত, ঘরছাড়া পরিবার এবং এক অচিন্তনীয় মানবিক বিপর্যয়। মাউন্টব্যাটেন ব্যক্তিগতভাবে হয়তো সৎ এবং কার্যকর মানুষ ছিলেন, কিন্তু লেখকের মতে, তিনি একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট দূরদর্শিতা দেখাতে পারেননি।

বইতে সিরিল র‌্যাডক্লিফের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত। সীমান্ত আঁকার দায়িত্ব তার হাতে দেওয়া হয়, অথচ তিনি ভারতের ভূগোল, সমাজ, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞ ছিলেন। এত বড় একটি ভূখণ্ডের সীমান্ত নির্ধারণ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করা হয়, তাও যথেষ্ট তথ্য, জনমত বা স্থানীয় পরামর্শ ছাড়া। উলপার্টের মতে, এটি ছিল ঔপনিবেশিক অদূরদর্শিতার চূড়ান্ত উদাহরণ।

র‌্যাডক্লিফ লাইন শুধু একটি রাজনৈতিক সীমানা ছিল না; এটি ছিল মানুষের জীবনে ছুরি চালানোর মতো একটি রেখা। গ্রাম, শহর, পরিবার, কৃষিজমি, নদী, ধর্মীয় সম্প্রীতির জায়গা-সবকিছুকে হঠাৎ দুভাগে ভাগ করা হয়। উলপার্ট এ প্রক্রিয়াকে দেখান এক নিষ্ঠুর প্রশাসনিক নাটক হিসাবে, যেখানে মানচিত্র আঁকার কয়েকটি কলমের আঁচড়ে লাখো মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয়।

উলপার্ট শুধু ব্রিটিশদেরই দায়ী করেন না; তিনি ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্বকেও গুরুত্ব দেন। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, আলাদা রাষ্ট্র নিয়ে মতভেদ এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির অমীমাংসিত প্রশ্ন দেশবিভাগের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলমানদের জন্য পৃথক রাজনৈতিক সত্তা দাবি করেন; কংগ্রেস একটি সংহত ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারত চায়। এ বিরোধ ক্রমেই তীব্র হয়।

তবে উলপার্টের বড় অভিযোগ হলো, ব্রিটিশরা এ বিরোধ মেটানোর বদলে অনেক ক্ষেত্রে তা আরও জটিল করেছে। তারা ‘ভাগ করে শাসন করার’ নীতির মাধ্যমে উপমহাদেশ শাসন করেছে, আর বিদায়ের সময়ও সেই দ্বন্দ্বকে সমাধান করার মতো আন্তরিকতা বা প্রস্তুতি দেখাতে পারেনি। ব্রিটিশ প্রশাসন নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্যের মোহে এমন এক উত্তরণ ঘটায়, যা কার্যত সংকটকে বিস্ফোরিত করে।

সাম্প্র্রদায়িক সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয়

‘শেমফুল ফ্লাইট’ গ্রন্থটির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশ দেশবিভাগ-পরবর্তী সহিংসতার বিবরণ। লাখো মানুষ ঘরছাড়া হয়, শরণার্থী হয়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, আক্রান্ত হয় হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও প্রতিশোধের তরঙ্গে। উলপার্ট এ সহিংসতাকে শুধু রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা হিসাবে দেখেন না; তিনি একে উপমহাদেশের মানবিক বিপর্যয় হিসাবে তুলে ধরেন।

বইয়ের এ অংশ পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। কারণ, উলপার্ট দেশবিভাগকে কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক ঘটনা হিসাবে সীমাবদ্ধ রাখেন না। তিনি দেখান, একটি ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কীভাবে অসংখ্য ব্যক্তিগত জীবনের ওপর নির্মম আঘাত হয়ে নেমে আসে। ট্রেনভর্তি লাশ, পুড়ে যাওয়া গ্রাম, রক্তমাখা রাস্তা, উদ্বাস্তু শিবির, হারিয়ে যাওয়া স্বজন-এসব বর্ণনা বইটিকে শুধু ইতিহাসগ্রন্থ নয়, বরং মানবিক সাক্ষ্যে পরিণত করে।

এ গ্রন্থের অন্যতম বড় অবদান হলো দেশবিভাগের ইতিহাসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নৈতিক দায়কে জোরালোভাবে সামনে আনা। অনেক ইতিহাসবেত্তা দেশবিভাগকে অপরিহার্য, প্রায় অনিবার্য এক ফল হিসাবে দেখেছেন। উলপার্ট এ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তার মতে, দেশবিভাগ অনিবার্য ছিল না; বরং এটি ছিল রাজনৈতিক ব্যর্থতা, ঔপনিবেশিক অবসানজনিত অব্যবস্থা এবং ভুল সিদ্ধান্তের ফল।

এ দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসচর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি পাঠককে শেখায়, ইতিহাস শুধু ‘ঘটে গেছে’ বলেই তা অবশ্যম্ভাবী ছিল না। বহু বিকল্প পথ থাকতে পারত, কিন্তু দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাবে সেগুলো অনুসরণ করা হয়নি। ফলে ‘শেমফুল ফ্লাইট’ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে শুধু তথ্যভিত্তিক নয়, নৈতিকভাবে জাগ্রত এক গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে।

যদিও গ্রন্থটি শক্তিশালী, তবু কিছু সমালোচনা করা যায়। প্রথমত, উলপার্টের বয়ান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিকেন্দ্রিক। সাধারণ মানুষ, নারীরা, কৃষক, শ্রমজীবী, গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী-তাদের অভিজ্ঞতা গ্রন্থটিতে তুলনামূলকভাবে কম এসেছে। দেশবিভাগের মানবিক বিপর্যয় বিশ্লেষণে এসব কণ্ঠস্বর আরও জায়গা পেলে গ্রন্থটি আরও পূর্ণাঙ্গ হতো।

দ্বিতীয়ত, গ্রন্থটি ব্রিটিশদের দায়কে এত জোরালোভাবে উপস্থাপন করে যে, কখনো কখনো ভারতীয় নেতাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ, ক্ষমতার লড়াই এবং বাস্তব রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যথাযথ আলোচনার সুযোগ পায় না। সমন্বিত বিশ্লেষণে এ উপাদানগুলো যুক্ত হলে গ্রন্থটির ভারসাম্য আরও বাড়ত।

তৃতীয়ত, উলপার্টের ভাষ্য কিছু ক্ষেত্রে আবেগনির্ভর বলে মনে হতে পারে। এটি গ্রন্থটির সাহিত্যিক শক্তি হলেও কঠোর একাডেমিক নিরপেক্ষতার দৃষ্টিতে কিছু পাঠকের কাছে সীমাবদ্ধতা হিসাবে প্রতীয়মান হতে পারে। তবে এ কথাও সত্য, দেশবিভাগের মতো গভীর মানবিক সংকটে আবেগহীন ইতিহাস অনেক সময় ঘটনাটির বাস্তব গভীরতা ধরতে ব্যর্থ হয়।

বাংলাদেশের পাঠকের জন্য ‘শেমফুল ফ্লাইট’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৯৪৭-এর দেশবিভাগ পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দেশবিভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের অংশ হয়। পরে সেই সূত্র ধরেই ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ-সবকিছুর শিকড় এক অর্থে এ দেশবিভাগের মধ্যেই নিহিত।

উলপার্টের গ্রন্থ তাই বাংলাদেশের পাঠকের কাছে শুধু ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস নয়, বরং নিজের ইতিহাস বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দেশবিভাগের সিদ্ধান্ত শুধু মানচিত্র বদলায়নি; তা বদলে দিয়েছে মানুষ, পরিচয়, অভিবাসন, নাগরিকত্ব এবং রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি।

সব মিলিয়ে, স্ট্যানলি উলপার্টের ‘শেমফুল ফ্লাইট’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তীক্ষ্ণ এবং বেদনাময় ইতিহাসগ্রন্থ। এটি ব্রিটিশ ভারতের শেষ বছরগুলোর এমন এক বিবরণ, যেখানে নীতিহীনতা, তাড়াহুড়া এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। উলপার্ট দেখান, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শুধু উপমহাদেশ শাসনেই নয়, বিদায়ের নীতিতেও ব্যর্থ হয়েছিল। তার মতে, ভারতের স্বাধীনতা যতই গৌরবময় হোক, সেই স্বাধীনতার পথ ছিল লজ্জাজনকভাবে পরিচালিত।

গ্রন্থটি পাঠককে শুধু অতীত জানায় না; বরং ক্ষমতা, উপনিবেশ, বিভাজন এবং নৈতিক দায় সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এর শক্তিশালী ভাষা, মানবিক সংবেদন, এবং ঐতিহাসিক অন্তর্দৃষ্টি একে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে পরিণত করেছে। যারা দেশবিভাগ, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ, অথবা আধুনিক ভারত-উপমহাদেশের রাজনৈতিক জন্ম নিয়ে আগ্রহী, তাদের জন্য ‘শেমফুল ফ্লাইট’ অবশ্যপাঠ্য।

মোহাম্মদ হাসান শরীফ : সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম