সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন
Advertisement
মেজর জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রাঞ্চলে অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। এ বিশাল অঞ্চলে রয়েছে মৎস্যসম্পদ, সম্ভাব্য তেল-গ্যাস ও খনিজসম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বাণিজ্যপথ, সাবমেরিন কেবল এবং ব্লুইকোনমি বিকাশের বিপুল সুযোগ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে প্রায় ৬ লাখ ২৯ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হলেও গভীর সমুদ্রের বহু সম্পদ এখনো যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি। এসব জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য শুধু উপকূলীয় টহলনির্ভর বাহিনী যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমুদ্র পর্যবেক্ষণ, প্রতিরোধ, সি-ডিনায়াল এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় সক্ষম একটি ভারসাম্যপূর্ণ নৌবাহিনী।
‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একসময়ের উপকূলকেন্দ্রিক বাহিনী এখন সারফেস ফ্লিট, সাবমেরিন ও নেভাল এভিয়েশনের সমন্বয়ে একটি ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনীতে পরিণত হওয়ার পথে। উন্মুক্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নৌবাহিনীতে সাতটি ফ্রিগেট, ছয়টি গাইডেড-মিসাইল করভেট, পাঁচটি অফশোর প্যাট্রল ভেসেল, চারটি বড় প্যাট্রল ক্রাফট, দুটি সাবমেরিন এবং বিভিন্ন ধরনের মিসাইল বোট, মাইনসুইপার, উভচর ও সহায়ক জাহাজ রয়েছে। কোনো কোনো পুরোনো জাহাজের কার্যকর অবস্থা ও রিফিটের কারণে এ সংখ্যা কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। নৌবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি সাবমেরিন, চারটি ডর্নিয়ার-২২৮ মেরিটাইম প্যাট্রল এয়ারক্রাফট এবং দুটি এডব্লিউ-১০৯ হেলিকপ্টার থাকার কথা উল্লেখ করেছে।
প্রধান যুদ্ধজাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্মিত বিএনএস বঙ্গবন্ধু, চীনা টাইপ-০৫৩ এইচ৩ শ্রেণির দুটি ফ্রিগেট, সাবেক মার্কিন কোস্ট গার্ডের হ্যামিল্টন শ্রেণির দুটি বড় জাহাজ এবং চীনা নকশার পুরোনো ফ্রিগেট। করভেট বহরে রয়েছে চারটি আধুনিক চীনা টাইপ-০৫৬/০৫৬এ শ্রেণির গাইডেড-মিসাইল করভেট এবং দুটি তুলনামূলক ছোট ক্যাসল শ্রেণির জাহাজ। এগুলোর সঙ্গে দুর্জয় শ্রেণির বড় প্যাট্রল ক্রাফট, অফশোর প্যাট্রল ভেসেল, মিসাইল বোট, মাইনসুইপার ও বিভিন্ন সহায়ক জাহাজ কাজ করছে। দুটি মিং শ্রেণির সাবমেরিন-বিএনএস নবযাত্রা ও বিএনএস জয়যাত্রা-বাংলাদেশকে প্রাথমিক আন্ডারওয়াটার যুদ্ধক্ষমতা দিয়েছে। পেকুয়ায় প্রতিষ্ঠিত সাবমেরিন ঘাঁটি ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের অবকাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করেছে।
তবে শুধু জাহাজের সংখ্যা দিয়ে নৌবাহিনীর প্রকৃত শক্তি বিচার করা যায় না। কয়েকটি ফ্রিগেট পুরোনো এবং সাবেক হ্যামিল্টন শ্রেণির জাহাজগুলো মূলত কোস্ট গার্ড কাটার হিসাবে নির্মিত-আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা বা সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধের জন্য নয়। টাইপ-০৫৬এ করভেটগুলো সারফেস ও সাবমেরিনবিরোধী অভিযানে কার্যকর হলেও সীমিত পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা এবং তুলনামূলক কম অপারেশনাল সহনক্ষমতার কারণে দূরসমুদ্রে একটি নৌ-টাস্কফোর্সকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারবে না। দুটি সাবমেরিন প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সীমিত সি-ডিনায়াল অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণের কারণে দুটির একটিও সব সময় যুদ্ধ-প্রস্তুত রাখা কঠিন। একইভাবে চারটি মেরিটাইম প্যাট্রল বিমান ও দুটি হালকা হেলিকপ্টার বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রাঞ্চলে সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য অপ্রতুল।
প্রতিবেশী দেশগুলোর নৌশক্তির বিকাশ বাংলাদেশের আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে। ভারত বিমানবাহী রণতরি, পারমাণবিক ও প্রচলিত সাবমেরিন, ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট, দীর্ঘপাল্লার মেরিটাইম প্যাট্রল বিমান এবং বিভিন্ন ধরনের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা করে। দেশটির বিশাখাপত্তনম শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারগুলো উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা, জাহাজবিধ্বংসী ও সাবমেরিনবিরোধী অস্ত্রে সজ্জিত। ২০২৫ সালের শেষদিকে ভারতে ৫০টির বেশি বড় যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন নির্মাণাধীন ছিল। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সত্ত্বেও মিয়ানমার নিজস্বভাবে ফ্রিগেট নির্মাণ, সাবমেরিন সংযোজন এবং উভচর ও নেভাল এভিয়েশন সক্ষমতা সম্প্রসারণ করছে। বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের সমকক্ষ নৌশক্তি অর্জন সম্ভব বা প্রয়োজনীয় নয়; তবে কোনো শক্তি যাতে বাংলাদেশের ওপর সামুদ্রিক চাপ সৃষ্টি, অবরোধ আরোপ কিংবা সমুদ্রসীমায় অনুপ্রবেশের কথা সহজে চিন্তা করতে না পারে, সেই মাত্রার প্রতিরোধক্ষমতা অবশ্যই অর্জন করতে হবে।
ভবিষ্যৎ হুমকি সরাসরি সামরিক আক্রমণ দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা, বিদেশি সাবমেরিন বা জরিপ জাহাজের অনুপ্রবেশ, বন্দরপ্রবেশ পথে মাইন স্থাপন, বন্দর ও উপকূলীয় স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা, মাছ ধরার নৌযান ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি স্থাপনা হয়রানি, সাবমেরিন কেবল বিচ্ছিন্ন করা কিংবা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব-সবই সম্ভাব্য হুমকির অংশ। এর সঙ্গে রয়েছে অবৈধ মাছ শিকার, জলদস্যুতা, মাদক ও অস্ত্র পাচার, মানব পাচার, সামুদ্রিক সন্ত্রাসবাদ এবং পরিবেশদূষণ। বিআইআইএসএস এসব হুমকির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সক্ষমতার ঘাটতির কথাও উল্লেখ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড় আরও বিধ্বংসী হলে একই সময়ে নৌঘাঁটি রক্ষা এবং ব্যাপক উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা পরিচালনার প্রয়োজন হতে পারে।
সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যাহত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের সমুদ্রপথে পরিবাহিত সাধারণ পণ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারভিত্তিক আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯৮ শতাংশ পরিচালনা করে। ২০২৫ সালে বন্দরটি প্রায় ৩৪ লাখ ৯ হাজার টিইইউ কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮১ লাখ টন পণ্য এবং ৪,২৭৩টি জাহাজ পরিচালনা করেছে। বন্দর বা সমুদ্রপথ কয়েক সপ্তাহের জন্যও অচল হয়ে পড়লে জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সমুদ্রপথ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্ত।
আগামী ১৫ বছরে বাংলাদেশের প্রধান সারফেস কমব্যাট ফোর্স হিসাবে অন্তত আটটি আধুনিক ফ্রিগেট এবং আট থেকে বারোটি করভেট গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। এর মধ্যে কমপক্ষে চারটি ফ্রিগেটকে এরিয়া এয়ার ডিফেন্সে সক্ষম হতে হবে। এসব জাহাজে থ্রি-ডাইমেনশনাল সার্ভিল্যান্স রাডার এবং মাঝারি পাল্লার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইলের জন্য ২৪ থেকে ৩২টি ভার্টিক্যাল লঞ্চিং সেল থাকা উচিত। অন্য ফ্রিগেটগুলো সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধের ওপর বেশি গুরুত্ব দেবে, তবে বিমান ও সারফেস হুমকি মোকাবিলার নিজস্ব ক্ষমতাও থাকবে।
প্রতিটি নতুন ফ্রিগেটে কমপক্ষে আটটি আধুনিক সি-স্কিমিং জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, একটি ৭৬ বা ১২৭ মিলিমিটার প্রধান কামান, রিমোট-অপারেটেড ক্ষুদ্র কামান, ভার্টিক্যাল-লঞ্চ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল এবং ক্লোজ-ইন ওয়েপন সিস্টেম থাকা প্রয়োজন। সঙ্গে ইলেকট্রনিক জ্যামার ও ডিকয়, হালকা টর্পেডো, হাল-মাউন্টেড সোনার এবং সম্ভব হলে ভ্যারিয়েবল-ডেপথ বা টোয়েড-অ্যারে সোনার যুক্ত করতে হবে। দশ টন শ্রেণির সাবমেরিনবিরোধী হেলিকপ্টার পরিচালনার উপযোগী ফ্লাইট ডেক ও হ্যাঙ্গার বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
করভেটগুলো প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টন ওজনের হতে পারে। প্রতিটি জাহাজে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, স্বল্প বা মাঝারি পাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক কামান, ক্লোজ-ইন ডিফেন্স, সোনার ও টর্পেডো থাকা প্রয়োজন। এগুলো ইইজেড টহল, বাণিজ্যিক জাহাজের এসকর্ট এবং উচ্চ হুমকির সময় ফ্রিগেটকে সহায়তা করবে। পাশাপাশি আট থেকে দশটি অফশোর প্যাট্রল ভেসেল মৎস্যসম্পদ রক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, অনুসন্ধান ও উদ্ধার এবং দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্ব পালন করবে। এতে ব্যয়বহুল যুদ্ধজাহাজগুলোকে নিয়মিত টহলের কাজে ব্যবহার করে অপ্রয়োজনীয়ভাবে তাদের কার্যকর আয়ু কমাতে হবে না।
সাবমেরিন বহর পর্যায়ক্রমে চারটিতে উন্নীত করা যুক্তিসংগত। এতে একটি সাবমেরিন টহলে, একটি অভিযানের প্রস্তুতিতে, একটি প্রশিক্ষণে এবং অন্যটি রক্ষণাবেক্ষণে রাখা সম্ভব হবে। নতুন সাবমেরিনে আধুনিক সোনার, হেভিওয়েট টর্পেডো, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক সাপোর্ট ব্যবস্থা ও নিরাপদ যোগাযোগ থাকতে হবে। সামর্থ্য অনুযায়ী এয়ার-ইনডিপেনডেন্ট প্রপালশন বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত সাবমেরিন কেনার আগে দেশীয় রক্ষণাবেক্ষণ, অস্ত্র ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ, সিমুলেটর প্রশিক্ষণ এবং সাবমেরিন উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
নেভাল এভিয়েশনের সম্প্রসারণ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। আরও ছয় থেকে আটটি মেরিটাইম প্যাট্রল বিমান দরকার, যেগুলো সারফেস-সার্চ রাডার, ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর, ইলেকট্রনিক সার্ভিল্যান্স, সোনোবয় এবং সাবমেরিনবিরোধী অস্ত্র বহন করতে পারবে। বারো থেকে ষোলোটি মাঝারি শ্রেণির নৌ-হেলিকপ্টার সংগ্রহ করলে প্রধান ফ্রিগেট ও উপকূলীয় ঘাঁটিগুলো কার্যকর সাবমেরিনবিরোধী নিরাপত্তা দিতে পারবে। দীর্ঘ সময় আকাশে থাকতে সক্ষম ইউএভি এবং জাহাজ থেকে পরিচালনাযোগ্য ভার্টিক্যাল-টেক-অফ ড্রোন নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও ওভার-দ্য-হরাইজন টার্গেটিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বন্দর ও সংকীর্ণ প্রবেশপথে অল্পসংখ্যক নৌ-মাইনও জাহাজ চলাচল অচল করে দিতে পারে। তাই অন্তত চারটি আধুনিক মাইন-কাউন্টারমেজার ভেসেল, মানববিহীন মাইন-হান্টিং বোট, রিমোটলি অপারেটেড আন্ডারওয়াটার ভেহিকল, মাইন সুইপিং ব্যবস্থা এবং দক্ষ বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী দল প্রয়োজন। বন্দরপ্রবেশ পথে আন্ডারওয়াটার সেন্সর, দ্রুতগামী টহলযান এবং ডুবুরি, ক্ষুদ্র সাবমেরিন ও বিস্ফোরকবাহী ড্রোন প্রতিরোধব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে।
সমন্বিত মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস পুরো প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড হওয়া উচিত। উপকূলীয় রাডার, স্যাটেলাইট, এআইএস তথ্য, মেরিটাইম প্যাট্রল বিমান, ইউএভি, মাছ ধরার নৌযান পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন সংস্থার গোয়েন্দা তথ্য একটি যৌথ মেরিটাইম অপারেশনস সেন্টারে একীভূত করতে হবে। জাহাজ, সাবমেরিন, বিমান ও উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটের মধ্যে নিরাপদ ডেটা লিংক থাকা জরুরি। শনাক্তকরণ ও লক্ষ্য নির্ধারণের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও পূর্ণ কার্যকারিতা লাভ করবে না।
উপকূলভিত্তিক মোবাইল অ্যান্টি-শিপ মিসাইল ব্যাটারি তুলনামূলক কম ব্যয়ে শক্তিশালী সি-ডিনায়াল ক্ষমতা দিতে পারে। এগুলো মোবাইল রাডার, ইউএভি ও বিমান থেকে লক্ষ্যসংক্রান্ত তথ্য গ্রহণ করে উপকূল থেকে শত্রু জাহাজকে মোকাবিলা করবে। পাশাপাশি ঘাঁটি, রাডার, অস্ত্রভান্ডার ও কমান্ড সেন্টার রক্ষায় মাঝারি ও স্বল্পপাল্লার ভূমিভিত্তিক বিমান প্রতিরক্ষা, ক্লোজ-ইন ডিফেন্স এবং কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা প্রয়োজন।
একটি যুদ্ধবহর শুধু যুদ্ধজাহাজ দিয়ে টিকে থাকতে পারে না। অন্তত দুটি আধুনিক ফ্লিট রিপ্লেনিশমেন্ট জাহাজ, একটি সাবমেরিন উদ্ধার ও গভীর সমুদ্রের স্যালভেজ জাহাজ, গোলাবারুদ পরিবহণকারী জাহাজ, ফ্লিট টাগ, হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে জাহাজ এবং ভাসমান মেরামত সুবিধা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র, টর্পেডো, মাইন, ডিকয়, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খুচরা যন্ত্রাংশ মজুত রাখতে হবে। নৌঘাঁটি, অস্ত্রভান্ডার, রাডার এবং যোগাযোগ কেন্দ্রগুলো বিকেন্দ্রীভূত, সুরক্ষিত ও আঘাত-সহনশীল করতে হবে।
আধুনিকায়নের সঙ্গে বিদেশি নির্ভরতা কমানোও অপরিহার্য। খুলনা শিপইয়ার্ড বর্তমানে ৯০ মিটার পর্যন্ত জাহাজ নির্মাণে সক্ষম এবং প্রায় ২,০০০ নটিক্যাল মাইল সহনক্ষমতা ও ২৭ নট গতিসম্পন্ন বড় প্যাট্রল ক্রাফট তৈরি করেছে। বিদেশি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এটিকে প্রথমে করভেট এবং পর্যায়ক্রমে ফ্রিগেট নির্মাণে সক্ষম করতে হবে। প্রযুক্তি হস্তান্তর, নকশা ব্যবহারের অধিকার, দেশীয়ভাবে খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং রাডার, সোনার, ইঞ্জিন ও অস্ত্র মেরামতের সক্ষমতা প্রতিটি বড় ক্রয়চুক্তির অপরিহার্য শর্ত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের দূরসমুদ্রে শক্তি প্রদর্শনের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল আক্রমণাত্মক ব্লুওয়াটার নৌবাহিনী প্রয়োজন নেই। দরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ, টেকসই ও আঘাত-সহনশীল বাহিনী-যার থাকবে আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, সাবমেরিন, মেরিটাইম প্যাট্রল বিমান, নৌ-হেলিকপ্টার, ড্রোন, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, মাইন প্রতিরোধব্যবস্থা এবং সমন্বিত নজরদারি নেটওয়ার্ক। এসব প্ল্যাটফর্মের পেছনে থাকতে হবে প্রশিক্ষিত জনবল, পর্যাপ্ত অস্ত্র, কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত যৌথ মহড়া এবং শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প। এমন নৌশক্তি প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি হবে না; বরং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক আগ্রাসন, অবরোধ কিংবা চাপপ্রয়োগকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। শান্তি শুধু সদিচ্ছার ওপর টিকে থাকে না-বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতাই শান্তি, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের সবচেয়ে কার্যকর রক্ষাকবচ।
মেজর জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
