Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা

Advertisement

Icon

মেজর জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা

Advertisement

বঙ্গোপসাগর একসময় প্রধানত ভারত মহাসাগরের একটি ভৌগোলিক সম্প্রসারণ হিসাবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সমুদ্রাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সমুদ্রতলের সম্পদ, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং সমুদ্র অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনার কারণে এর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য বঙ্গোপসাগর শুধু দক্ষিণের ভৌগোলিক সীমানা নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার, কৌশলগত সীমান্ত এবং জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যত তীব্র হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রতি সামুদ্রিক হুমকিও তত বহুমাত্রিক, জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে।

ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গোপসাগর ছিল নৌবাণিজ্য, সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবসায়ী, নাবিক ও ধর্মপ্রচারকরা বাংলা, শ্রীলংকা, আরব উপদ্বীপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনে যাতায়াত করতেন। তাম্রলিপ্ত, সোনারগাঁ, সপ্তগ্রাম ও চট্টগ্রামের মতো বন্দর বাংলাকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। মধ্যযুগের শুরু থেকেই আরব বণিকরা বাংলার উপকূলে নিয়মিত আসতেন। পরবর্তীকালে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি ও ব্রিটিশরা এ অঞ্চলের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিযোগিতায় নামে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান দেখিয়ে দেয়, সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কীভাবে রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যে রূপ নিতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মায় জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির অভিযানে বঙ্গোপসাগর বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব লাভ করে। চট্টগ্রামসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন বন্দর সামরিক রসদ সরবরাহে ব্যবহৃত হয়। বার্মা অভিযান সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ, বিমানশক্তি এবং স্থলযুদ্ধের পারস্পরিক সম্পর্ককে স্পষ্ট করে তোলে। ১৯৭১ সালে ভারতীয় নৌবাহিনী নৌ-অবরোধ আরোপ করলে বঙ্গোপসাগর আবারও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস এন্টারপ্রাইজকে কেন্দ্র করে সপ্তম নৌবহরের টাস্কফোর্স ৭৪-এর আগমন এবং ভারত মহাসাগরে সোভিয়েত নৌবাহিনীর তৎপরতা দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সংঘাত বৃহৎ শক্তিগুলোকেও বঙ্গোপসাগরে টেনে আনতে পারে। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে যে সামুদ্রিক ভূরাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই, এটি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক শিক্ষা।

বঙ্গোপসাগর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। এটি ভারত মহাসাগরকে মালাক্কা প্রণালির সঙ্গে যুক্ত করেছে, যে পথ দিয়ে এশিয়ার জ্বালানি আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বঙ্গোপসাগরসংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় রয়েছে বিশাল জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান বাজার এবং মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। স্থলবেষ্টিত নেপাল ও ভুটানও বঙ্গোপসাগরের বন্দরগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে একটি পরিবহণ, জ্বালানি ও সরবরাহকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার বিরাট সুযোগ দিয়েছে।

ভারত তার পূর্ব উপকূলের নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর উন্নয়ন এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গোপসাগরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। মালাক্কা প্রণালির প্রবেশপথের কাছাকাছি অবস্থিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। ভারত মহাসাগরের নৌপথের ওপর জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নির্ভরতা এবং মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ বন্দর ও তেল-গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বিকল্প যোগাযোগ স্থাপনের আকাক্সক্ষা থেকে বঙ্গোপসাগরে চীনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরকে তার বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসাবে দেখে এবং অবাধ নৌচলাচল, নিরাপদ সমুদ্রপথ ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দেয়। জাপান ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশে যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোরও সামুদ্রিক বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক শান্তির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িত।

বিভিন্ন শক্তির এ সম্মিলিত আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। একইসঙ্গে এটি কৌশলগত চাপও তৈরি করছে। বন্দর, জ্বালানি টার্মিনাল ও পরিবহণ করিডরের বাণিজ্যিক ব্যবহারের পাশাপাশি সামরিক গুরুত্বও থাকতে পারে। বন্দর ব্যবহারের সুযোগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অবকাঠামো অর্থায়ন, নজরদারি ব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর চাপের মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সংঘাতের হাতিয়ারে পরিণত না হয়ে সবার সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা।

২০১২ সালে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনবিষয়ক ট্রাইব্যুনালের রায়ের মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায়ের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সাফল্য। এসব রায়ের ফলে বাংলাদেশের আঞ্চলিক সমুদ্র, একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মহীসোপানের অধিকার স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশের অর্জিত বা নির্ধারিত সমুদ্রাঞ্চলের বহুল ব্যবহৃত পরিমাণ প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার। মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধের রায়টি বিশেষভাবে ঐতিহাসিক, কারণ এটিই ছিল আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনবিষয়ক ট্রাইব্যুনালের নিষ্পত্তি করা প্রথম সমুদ্রসীমা মামলা। এ নিষ্পত্তির ফলে অবতল উপকূলরেখার কারণে বাংলাদেশের সমুদ্রপ্রবেশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দূর হয় এবং মৎস্য, তেল-গ্যাস, সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পর্যটন ও সমুদ্রতলের সম্পদ অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

কিন্তু আইনগতভাবে সমুদ্রাঞ্চলের অধিকার লাভ করা এবং সেখানে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। অবৈধ, অনিবন্ধিত ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক হুমকি। বিদেশি মাছ ধরার জাহাজ বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে মাছের মজুত হ্রাস এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অতিরিক্ত মাছ আহরণ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এবং দুর্বল নজরদারিও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধ আরও একটি গুরুতর ঝুঁকি। বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন জলপথ মিয়ানমার থেকে মেথামফেটামিন বা ইয়াবা, অস্ত্র, মানুষ ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্য পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে। রোহিঙ্গাসহ অসহায় জনগোষ্ঠীকে সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র বিপজ্জনক সমুদ্রপথে পাচার করছে। বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চলের তুলনায় জলদস্যুতা কম হলেও বাংলাদেশের মাছ ধরার নৌকা, উপকূলীয় জাহাজ এবং বন্দরের প্রবেশপথে চলাচলকারী নৌযানের বিরুদ্ধে দস্যুতা ও সশস্ত্র ডাকাতির আশঙ্কা এখনো রয়েছে।

বাংলাদেশকে প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি ‘গ্রে-জোন’ হুমকির জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। অনুমতি ছাড়া সামুদ্রিক জরিপ, গোয়েন্দা জাহাজের তৎপরতা, সাবমেরিনের চলাচল, মাছ ধরার ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর চাপ, অফশোর স্থাপনায় হস্তক্ষেপ এবং সরাসরি যুদ্ধের সীমার নিচে থেকে সমুদ্রসীমা লঙ্ঘন এর অন্তর্ভুক্ত। সমুদ্র-মাইন, চালকবিহীন নৌযান ও ডুবোযান, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাইবার আক্রমণ সামুদ্রিক যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিয়েছে। বন্দর পরিচালনা, শুল্ক, নৌচলাচল অথবা জ্বালানি টার্মিনালের কম্পিউটার ব্যবস্থায় একটি বড় সাইবার আক্রমণ কোনো গুলি না ছুড়েই বাংলাদেশের বাণিজ্য বিপর্যস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতা এ ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের সিংহভাগ কনটেইনার ও সমুদ্রবাণিজ্য পরিচালনা করে। ফলে বন্দর এবং এর প্রবেশপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। মোংলা, পায়রা, মাতারবাড়ী, অফশোর জ্বালানি স্থাপনা, সাবমেরিন যোগাযোগ কেব্ল এবং উপকূলীয় শিল্পাঞ্চলও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অবরোধ, নাশকতা, জাহাজডুবি, নৌ চ্যানেল বন্ধ কিংবা বড় ধরনের সাইবার হামলা জ্বালানি, খাদ্য, সার ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত করতে পারে। তাই বন্দর ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তাকে শুধু বাণিজ্যিক বা আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসাবে নয়, জাতীয় প্রতিরক্ষার অংশ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনও একটি মারাত্মক সামুদ্রিক নিরাপত্তা হুমকি। বাংলাদেশের উপকূল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে। ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়, ২০০৭ সালের সিডর এবং ২০২০ সালের আম্ফান বঙ্গোপসাগরের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা দেখিয়েছে। জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ভূমি, পানি ও কর্মসংস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে। বন্দর, নৌঘাঁটি ও উপকূলীয় রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় প্রতিক্রিয়া সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়বে। তেল নিঃসরণ, প্লাস্টিক দূষণ, জাহাজভাঙা শিল্পের বর্জ্য এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত অবক্ষয়ও অর্থনৈতিক ও মানবনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।

বাংলাদেশের তাই প্রতিরক্ষা, কূটনীতি, অর্থনীতি, আইন প্রয়োগ ও পরিবেশ সুরক্ষার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক কৌশল প্রয়োজন। নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডকে প্রয়োজনীয় যুদ্ধজাহাজ, সামুদ্রিক টহল বিমান, হেলিকপ্টার, চালকবিহীন ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, স্যাটেলাইট নজরদারি, নিরাপদ যোগাযোগ ও গোয়েন্দা সক্ষমতায় সজ্জিত করতে হবে। রাডার, অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম, স্যাটেলাইট চিত্র, মৎস্যবিষয়ক তথ্য এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিবেদন সমন্বিত করে সার্বক্ষণিক সমুদ্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সাবমেরিন শনাক্তকরণ, মাইন প্রতিরোধ, আকাশ প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং বন্দর ও অফশোর স্থাপনার সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, বিমানবাহিনী, বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস, পুলিশ, মৎস্য অধিদপ্তর ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা এবং দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন থাকতে হবে। সমুদ্রসীমা, মৎস্যসম্পদ, দূষণ ও অফশোর অবকাঠামো-সংক্রান্ত আইন শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামুদ্রিক অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিয়মিত মহড়া, অনুসন্ধান ও উদ্ধার সহযোগিতা এবং তথ্যবিনিময় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে বৃহৎ শক্তির সামরিক প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থাকতে হবে। নীতি হওয়া উচিত-সবার সঙ্গে সহযোগিতা, কিন্তু কারও কাছে অধীনতা নয়। বিমসটেক, ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, পাচার প্রতিরোধ ও নৌচলাচলের নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। একইসঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য নৌ ও কোস্ট গার্ড সক্ষমতা বজায় রাখতে হবে, কারণ জাতীয় অধিকার পর্যবেক্ষণ ও রক্ষার সামর্থ্য থাকলেই কূটনীতি সবচেয়ে কার্যকর হয়।

বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ সামুদ্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু একই সমুদ্র বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক অপরাধ, সম্পদ নিয়ে বিরোধ, প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও বহন করছে। তাই সচেতনতা, প্রস্তুতি, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জাতীয় সমুদ্রনীতি গড়ে তুলতে হবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করবে দেশটি তার সামুদ্রিক অঞ্চলকে কতটা দূরদর্শিতার সঙ্গে বুঝতে, পরিচালনা ও সুরক্ষিত করতে পারে, তার ওপর।

মেজর জেনারেল (অব.) এইচআরএম রোকন উদ্দিন : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম