পেঙ্গুইনের খাদ্যাভ্যাসে বিরাট পরিবর্তন, দেখা যাচ্ছে মহাকাশ থেকে
Advertisement
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অ্যান্টার্কটিকার জলবায়ু পরিবর্তন শুধু বরফের স্তর বা তাপমাত্রাকেই বদলে দিচ্ছে না বরং এর প্রভাব পড়ছে সেখানকার প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাসেও। আর এই পরিবর্তনের এক অভিনব চিত্র উঠে আসছে মহাকাশ থেকে তোলা উপগ্রহচিত্রে।
পেঙ্গুইনের বিষ্ঠা বা গুয়ানোর রঙ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারছেন, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টার্কটিকার সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল কীভাবে বদলে যাচ্ছে এবং সেই পরিবর্তন পেঙ্গুইনদের খাদ্যাভ্যাস ও বেঁচে থাকার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে।
অ্যাডেলী পেঙ্গুইন অ্যান্টার্কটিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিকারি প্রাণী। খাদ্যের জন্য তারা পুরোপুরি দক্ষিণ মহাসাগরের ওপর নির্ভরশীল, যদিও প্রজনন ও বাসা বাঁধার জন্য তারা মহাদেশের পাথুরে উপকূল ও উঁচু ভূমি ব্যবহার করে। একটি পেঙ্গুইন কলোনিতে কখনও কখনও লক্ষ লক্ষ পাখি একসঙ্গে বসবাস করে। ফলে সেখানে বিপুল পরিমাণ গুয়ানো এতটাই বেশি জমা হয় যে, উপগ্রহ থেকেও এসব কলোনি সহজেই শনাক্ত করা যায়।
গুয়ানোর রঙেই লুকিয়ে আছে খাবারের তথ্য
গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো পেঙ্গুইন কলোনির আশপাশে যখন সামুদ্রিক বরফের পরিমাণ বেশি থাকে, তখন অ্যাডেলী পেঙ্গুইনরা তুলনামূলকভাবে বেশি মাছ খায়। অন্যদিকে, সামুদ্রিক বরফ কমে গেলে তাদের খাদ্যতালিকায় ক্রিলের পরিমাণ বেড়ে যায়।
ক্রিল দেখতে অনেকটা ছোট চিংড়ির মতো। এর শক্ত বাইরের আবরণ বা এক্সোস্কেলেটন গোলাপি রঙের এবং পেঙ্গুইনের পরিপাকতন্ত্র সেটিকে পুরোপুরি হজম করতে পারে না। ফলে ক্রিল বেশি খেলে পেঙ্গুইনের গুয়ানোর রঙেও গোলাপি আভা দেখা যায়। এই রঙই বিজ্ঞানীদের জন্য হয়ে ওঠে পেঙ্গুইনের খাদ্যাভ্যাস বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
অ্যান্টার্কটিকায় গবেষণার সময় একটি জাহাজে তৈরি করা ছোট ও অস্থায়ী পরীক্ষাগারেই এসব নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। এরপর পরিবেশগত রসায়নের বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে গুয়ানোর উপাদান পরীক্ষা করা হয়। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট রঙের গুয়ানোর সঙ্গে পেঙ্গুইনের খাদ্যতালিকায় ক্রিল ও মাছের অনুপাতের সম্পর্ক নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
পেঙ্গুইনের গুয়ানো থেকে সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলের খাবার
এই পদ্ধতির গুরুত্ব শুধু পেঙ্গুইনের খাদ্যাভ্যাস বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর মাধ্যমে দক্ষিণ মহাসাগরের এমন কিছু পরিবর্তনেরও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, যা সাধারণত সমুদ্রের গভীরে ঘটে এবং সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন।
প্রায় ৪,০০০ উপগ্রহচিত্রের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অ্যান্টার্কটিকার বিভিন্ন অঞ্চলের পেঙ্গুইনদের খাদ্যাভ্যাস এক নয়। শুধু অঞ্চলভেদেই নয়, বছরের বিভিন্ন সময় এবং এক বছর থেকে অন্য বছরেও তাদের খাদ্যতালিকায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে।
সামুদ্রিক বরফ, খাদ্যশৃঙ্খল ও পেঙ্গুইনের ভবিষ্যত
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে তা হলো জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে অ্যান্টার্কটিকার খাদ্যশৃঙ্খলকে ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে অ্যান্টার্কটিকার চারপাশে সামুদ্রিক বরফের পরিমাণ দ্রুত কমেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার সামুদ্রিক বরফের পরিমাণ রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়েও নেমে গেছে।
সামুদ্রিক বরফের এই পরিবর্তনের সঙ্গে মাছের প্রাপ্যতারও সম্পর্ক রয়েছে যা অ্যাডেলী পেঙ্গুইনের জন্য উদ্বেগের কারণ। ক্রিলের তুলনায় মাছ খেলে পেঙ্গুইনের ছানারা সাধারণত বেশি ওজন নিয়ে বেড়ে ওঠে। বেশি ওজনের ছানাদের পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বেশি।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, যেসব অঞ্চলে পেঙ্গুইনরা সময়ের সঙ্গে কম মাছ খেতে শুরু করেছে, সেসব এলাকায় গত কয়েক দশকে তাদের মোট সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বিপরীতে, যেসব কলোনির পেঙ্গুইনরা তুলনামূলকভাবে বেশি মাছ খায়, সেসব কলোনির সংখ্যা স্থিতিশীল থাকার কিংবা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
উপগ্রহচিত্রের এই নতুন বিশ্লেষণ বিজ্ঞানীদের জন্য একটি শক্তিশালী জানালা খুলে দিয়েছে। যার মাধ্যমে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তন এবং তার সঙ্গে পেঙ্গুইনের জীবনের সম্পর্ককে আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হচ্ছে।
