Logo
Logo
×
   

Advertisement

দৃষ্টিপাত

ধ্বংস, দখল ও পুনর্গঠন: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণ

Advertisement

Icon

মাহমুদুর রহমান সুমন

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম

ধ্বংস, দখল ও পুনর্গঠন: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণ

Advertisement

এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং পরবর্তী পুনর্গঠন প্রচেষ্টার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। 

পূর্ববর্তী সময়ে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, আর্থিক খাতে অস্বচ্ছতা এবং বাজারে রাজনৈতিক প্রভাব অর্থনীতিতে বৈষম্য ও আস্থার সংকট তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে নতুন নেতৃত্ব কৃষি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করে।

বিশ্লেষণটি দেখায় যে, টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কেবল প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং প্রতিষ্ঠান, নীতি এবং জনগণের আস্থার উপর নির্ভর করে।

১. ভূমিকা

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। একটি রাষ্ট্রে নীতি নির্ধারণ যদি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। 

বিপরীতে, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ যদি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল হয়, তবে অর্থনীতি ধীরে ধীরে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। উন্নয়নের প্রচলিত সূচক—যেমন অবকাঠামো, প্রবৃদ্ধি বা রপ্তানি—গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো একা যথেষ্ট নয়। টেকসই অর্থনীতির জন্য দরকার স্থিতিশীলতা, ন্যায্যতা এবং সর্বোপরি জনগণের আস্থা।

২. প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও অর্থনৈতিক বৈষম্য

পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থায় অর্থনৈতিক কাঠামো অনেকাংশে পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক হয়ে ওঠে। বাজার অর্থনীতি আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে বাজারে প্রবেশ ও টিকে থাকার সুযোগ রাজনৈতিক সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে Political Patronage Economy বলা যায়।

বিরোধী মতের ব্যবসায়ীরা নানা প্রশাসনিক ও আর্থিক চাপে পড়েন। ঋণপ্রাপ্তি, লাইসেন্স নবায়ন, কর ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক অনুমোদনের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এর ফলে ব্যবসার ক্ষেত্রে দক্ষতা, উদ্ভাবন বা প্রতিযোগিতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ব্যাংকিং খাতেও এর প্রভাব পড়ে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ বিতরণ, ঋণখেলাপির বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা আর্থিক খাতে আস্থার সংকট তৈরি করে। একইভাবে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও অস্বচ্ছতা রাজস্ব ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করে। উন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও তার অর্থনৈতিক দক্ষতা ও সামাজিক সুফল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

৩. অর্থনৈতিক সংকটের রূপ

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও নীতিগত অসামঞ্জস্যের ফলে অর্থনীতি একাধিক সংকটে পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং বিনিয়োগে ধীরগতি অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই সংকট কেবল আর্থিক ছিল না; এটি ছিল কাঠামোগত ও রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক সংকট।

অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা সমভাবে বিতরণ হয়নি। ফলে একটি বৈষম্যমূলক উন্নয়ন কাঠামো তৈরি হয়, যেখানে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী লাভবান হলেও সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের চাপ অনুভব করে।

এই প্রেক্ষাপটে পুনরুদ্ধারের জন্য তিনটি শর্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: স্বচ্ছতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি। Trust Deficit বা আস্থার ঘাটতি দূর না হলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কোনোটিই টেকসই হয় না।

৪. নতুন নেতৃত্ব ও নীতিগত রূপান্তর

পরবর্তী সময়ে নতুন নেতৃত্বের অধীনে অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের একটি এজেন্ডা গ্রহণ করা হয়। এই এজেন্ডার লক্ষ্য ছিল অর্থনীতিকে পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক কাঠামো থেকে মানবসম্পদভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়া।

ডিগ্রি পর্যন্ত নারী শিক্ষাকে অবৈতনিক করার উদ্যোগ মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে নারী শিক্ষার হার, শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এবং পারিবারিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে পারে। 

পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গঠনে সহায়ক হতে পারে।

৫. কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন

খাল খনন কর্মসূচি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা হ্রাস, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনতে পারে। পানি ব্যবস্থাপনাকে উন্নয়নের অংশে পরিণত করা কৃষি উৎপাদনশীলতার জন্য অপরিহার্য।

কৃষি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি সহায়তা দেওয়া গেলে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কমে এবং উৎপাদন ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। একইভাবে ফ্যামিলি কার্ড নিম্নআয়ের পরিবারকে খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা দিতে পারে। এসব কর্মসূচি শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমও।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি Green Economic Transition-এর অংশ হিসেবে পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সহনশীলতা বাড়াতে সহায়ক।

কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন অর্থনৈতিক রূপান্তরের আরেকটি প্রধান স্তম্ভ। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। তাই প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান, দক্ষ শ্রমিক, ডাক্তার ও নার্স তৈরি করে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা সম্ভব। এটি রেমিট্যান্স প্রবাহকে শক্তিশালী করে এবং অর্থনীতির বৈদেশিক মুদ্রা ভিত্তিকে স্থিতিশীল করতে পারে।

৬. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

অর্থনৈতিক পুনর্গঠন সহজ নয়। পুরনো প্রশাসনিক সংস্কৃতি দ্রুত পরিবর্তন হয় না। রাজনৈতিক মেরুকরণ নীতির ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনীতির চাপ—জ্বালানি মূল্য, সুদের হার ও বৈদেশিক বাজারের অস্থিরতা—বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এ কারণে দুর্নীতি দমন, ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার, ডিজিটাল গভর্নেন্স এবং নিরাপদ প্রবাস নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈধ ও স্বচ্ছ অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুললে শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষিত হয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও স্থিতিশীল হয়।

৭. আলোচনা ও উপসংহার

এই বিশ্লেষণ দেখায় যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ শুধু আর্থিক নয়; এর কেন্দ্রে ছিল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও আস্থার সংকট। পুনরুদ্ধারের জন্য তাই কেবল বাজেট, ঋণ বা প্রবৃদ্ধি নয়, বরং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, ন্যায়ভিত্তিক বাজার এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন অপরিহার্য।

অর্থনীতি কেবল সংখ্যার সমষ্টি নয়; এটি একটি রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেম। ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠন সম্ভব, যদি নীতিতে স্বচ্ছতা থাকে, প্রতিষ্ঠান কার্যকর হয়, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায় এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। 

শেষ পর্যন্ত, অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করা যায় নীতির মাধ্যমে; কিন্তু তা টেকসই হয় আস্থা, শিক্ষা ও দক্ষতার ভিত্তিতে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ অর্থনৈতিক সম্পাদক 

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম