Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের বিশ্লেষণ

পূর্ব ময়মনসিংহ বা বর্তমান নেত্রকোনা জেলার প্রাচীন রাষ্ট্র ও সমাজজীবন

Advertisement

ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার

ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ০১:১৫ পিএম

পূর্ব ময়মনসিংহ বা বর্তমান নেত্রকোনা জেলার প্রাচীন রাষ্ট্র ও সমাজজীবন

অসংখ্য নদী, জলাভূমি ও ঘন জঙ্গলে ভরা এই অঞ্চল বর্ষাকালে আরও দুর্গম হয়ে উঠত। সংগৃহীত ছবি

Advertisement

পূর্ব ময়মনসিংহ, যা বর্তমান নেত্রকোনা অঞ্চলসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাচীনকাল থেকেই একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। প্রখ্যাত সাহিত্য-ইতিহাসবিদ দীনেশ চন্দ্র সেন তার গবেষণায় এই অঞ্চলের ইতিহাস, সমাজব্যবস্থা ও সংস্কৃতির এক অনন্য চিত্র তুলে ধরেছেন। যা আমাদের কাছে আজও অত্যন্ত মূল্যবান।

খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে পূর্ব ময়মনসিংহ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গুপ্ত শাসনের দুর্বলতা দেখা দিলে এই অঞ্চল স্বাধীন হয়ে পড়ে এবং পরে প্রাগজ্যোতিষপুর-এর অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সময়ে কামরূপ রাজ্যের প্রভাব বিস্তার লাভ করে এবং অঞ্চলটি হিন্দুধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।

সপ্তম শতাব্দীতে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং এই অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। তিনি স্থানীয় মানুষের নৈতিকতা, শিক্ষা এবং সংস্কৃতির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তার বিবরণ থেকে বোঝা যায়, তখনকার সমাজ ছিল জ্ঞানচর্চা ও নৈতিকতার দিক থেকে উন্নত।

পরবর্তীতে প্রাগজ্যোতিষপুরের পতনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব ময়মনসিংহে একাধিক ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্যের উত্থান ঘটে। রাজবংশীয়, কোচ ও হাজং সম্প্রদায়ের নেতারা এই রাজ্যগুলো শাসন করতেন। ১২৮০ সালে সোমেশ্বর সিংহ সুষঙ্গ-দুর্গাপুর অঞ্চল দখল করেন। ১৪৯১ সালে শেরপুর অঞ্চলে মজলিশ হুমায়ুন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৫৮০ সালের দিকে ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়ী অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বিস্তার করে দেওয়ান বংশের সূচনা করেন।

এভাবে কালিয়াজুড়ি, মদনপুর, বোকাইনগরসহ বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট রাজ্য গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে মুসলিম শাসনের অধীনে চলে যায় বা করদ রাজ্যে পরিণত হয়।

ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, সেনবংশীয় রাজারা পশ্চিম ময়মনসিংহ দখল করতে পারলেও পূর্ব ময়মনসিংহকে সম্পূর্ণভাবে দখল করতে পারেননি। এর প্রধান কারণ ছিল ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য—অসংখ্য নদী, বিল, জলাভূমি ও ঘন জঙ্গলে ভরা এই অঞ্চল বর্ষাকালে আরও দুর্গম হয়ে উঠত। ফলে এটি দীর্ঘদিন ধরে বহিরাগত শক্তির প্রভাব থেকে অনেকটাই স্বাধীন ছিল।

ধর্মীয় দিক থেকেও পূর্ব ময়মনসিংহ ছিল ব্যতিক্রম। এখানে যে হিন্দুধর্ম প্রচলিত ছিল, তা ছিল উদার ও সহনশীল। এতে বৌদ্ধধর্মের কর্মবাদ এবং হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের এক সুন্দর মিশ্রণ দেখা যায়। কামরূপে যখন তান্ত্রিক প্রভাব বাড়তে থাকে, তখন পূর্ব ময়মনসিংহ সেই ধারার বাইরে থেকে যায় এবং প্রাচীন উদার ধর্মীয় আদর্শ বজায় রাখে।

এখানে বল্লাল সেনের কঠোর কৌলিন্য প্রথা, আচারবিধির কড়াকড়ি বা জাতিভেদের কঠিন নিয়ম তেমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রঘুনন্দনের প্রবর্তিত সামাজিক নিয়মও এই অঞ্চলে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ফলে সমাজে ছিল অনেক বেশি স্বাধীনতা ও মানবিকতা।

সমাজজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল—জাতিভেদের কঠোরতা কম ছিল। অনুলোম-প্রতিলোম বিবাহ প্রচলিত ছিল এবং নারীরা অনেক ক্ষেত্রে নিজের পছন্দমতো জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতে পারতেন। প্রেমভিত্তিক গন্ধর্ব বিবাহও তখন বিদ্যমান ছিল, যা আজকের সমাজে প্রায় বিলুপ্ত।

ড. দীনেশ চন্দ্র সেন তার পল্লীগাথার বিশ্লেষণে এমন উদাহরণও তুলে ধরেছেন। যেখানে নিম্নবর্ণের ঘরে বড় হওয়া শিশুকেও পরে সমাজে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে। এমনকি নিম্নবর্ণের মাতাকেও সম্মান প্রদর্শনের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে—যা বর্তমান সমাজের কঠোর শ্রেণিবিভাজনের সঙ্গে তুলনা করলে বিস্ময়কর মনে হয়।

পল্লীগাথাগুলোতে নারীদের চরিত্র বিশেষভাবে উজ্জ্বল। তারা অনেক সময় সামাজিক নিয়ম ভেঙেছেন। কিন্তু নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ কখনো হারাননি। তারা স্বামীভক্ত, বুদ্ধিমতি, ধৈর্যশীল এবং বিপদে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। এই গাথাগুলোতে নারীর শক্তি, একনিষ্ঠতা এবং মানবিকতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে।

সবশেষে বলা যায়, ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের আলোচনায় পূর্ব ময়মনসিংহের প্রাচীন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার যে চিত্র পাওয়া যায়। তা একদিকে যেমন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, অন্যদিকে তেমনি আমাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ। এই সমাজ ছিল স্বাধীনচেতা, উদার এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ—যা আজকের সময়েও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয়।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

এইচএসসিতে ময়মনসিংহ বোর্ডের ১৯ প্রতিষ্ঠানে পাশ করেনি কেউ

এইচএসসিতে ময়মনসিংহ বোর্ডের ১৯ প্রতিষ্ঠানে পাশ করেনি কেউ

জুমার খুতবায় শেখ হাসিনাকে ‘স্বৈরাচার’ বলায় খতিবকে অব্যাহতি

জুমার খুতবায় শেখ হাসিনাকে ‘স্বৈরাচার’ বলায় খতিবকে অব্যাহতি

স্বামীকে জামিন করানোর আশ্বাসে গৃহবধূকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ যুবদল নেতার বিরুদ্ধে

স্বামীকে জামিন করানোর আশ্বাসে গৃহবধূকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ যুবদল নেতার বিরুদ্ধে

ইয়াবাসহ ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার

ইয়াবাসহ ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার

নিজেকে বিএনপির সমর্থক দাবি করলেন সেই সাথী

নিজেকে বিএনপির সমর্থক দাবি করলেন সেই সাথী

ফিশারিতে বিষ দিয়ে ১২ লাখ টাকার মাছ মেরে ফেলার অভিযোগ

ফিশারিতে বিষ দিয়ে ১২ লাখ টাকার মাছ মেরে ফেলার অভিযোগ

আরও পড়ুন

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু যুগের অবসান নাকি নতুন যুদ্ধ?

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু যুগের অবসান নাকি নতুন যুদ্ধ?

কারিগরি শিক্ষার ভিত শক্ত করতে কারিগরি শিক্ষা ক্যাডারদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ জরুরি

কারিগরি শিক্ষার ভিত শক্ত করতে কারিগরি শিক্ষা ক্যাডারদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ জরুরি

অদৃশ্য ঝুঁকির মুখে স্বাস্থ্য ও গবেষণা: বায়োসেফটি এখনো কেন প্রান্তিক?

অদৃশ্য ঝুঁকির মুখে স্বাস্থ্য ও গবেষণা: বায়োসেফটি এখনো কেন প্রান্তিক?

অন্যমত বিনিয়োগের খরা কাটানোর পদক্ষেপ জরুরি

বিনিয়োগের খরা কাটানোর পদক্ষেপ জরুরি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম