Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল শেখাই, কিন্তু টাকার হিসাব শেখাই না

Advertisement

আনিসুর বুলবুল

আনিসুর বুলবুল

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ১০:৫৩ এএম

ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল শেখাই, কিন্তু টাকার হিসাব শেখাই না

Advertisement

রহিম সাহেব প্রথম চাকরি পাওয়ার পর যা করেছিলেন, তা আমাদের চারপাশের অনেক মানুষের গল্পের সঙ্গে মিলে যাবে। মাসের শুরুতে বেতন হাতে এলে মনে হতো, এই টাকায় সবই সম্ভব। কিন্তু মাসের মাঝামাঝি এসে সেই টাকা কোথায় মিলিয়ে যেত, তা তিনি নিজেও ঠিক বুঝতে পারতেন না। সংসার চলত ঠিকই, কিন্তু জমা হতো না কিছুই। পাঁচ বছর পর যখন দেখলেন, সামান্য একটি জরুরি পরিস্থিতিও তাকে ধার করতে বাধ্য করছে, তখন তার মনে হলো, কোথাও একটা বড় ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু ভুলটা শুধু তার একার ছিল না।

আমাদের দেশে একজন শিক্ষার্থী বহু বছর স্কুলে পড়ে ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল শেখে, নদীর নাম মুখস্থ করে, উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ বোঝে। কিন্তু বাস্তব জীবনে টাকা ব্যবস্থাপনা, ব্যাংক হিসাব, সুদ, ঋণ, সঞ্চয়, বীমা বা বিনিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে তার শেখা এখনও খুব সীমিত ও বিচ্ছিন্ন। সাম্প্রতিক পাঠ্যক্রমে কিছু ব্যবহারিক বিষয় যুক্ত হলেও তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে আর্থিক অজ্ঞতা ব্যক্তিগত বিপদ থেকে ধীরে ধীরে সামাজিক সমস্যায় রূপ নিচ্ছে।

অর্থের ব্যবহার মানুষের জীবনের সঙ্গে এত নিবিড়ভাবে জড়িত যে এর বাইরে একটি দিনও কাটানো সম্ভব নয়। চাল কিনতে হয়, ভাড়া দিতে হয়, সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে হয়, অসুখে ওষুধ লাগে। এর পরেও যদি কিছু থাকে, সেটি দিয়ে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা গড়তে হয়। এই পুরো চক্রটি বুঝে পরিচালনা করার যে বোধ ও দক্ষতা দরকার, তার নাম আর্থিক সাক্ষরতা। অথচ এই জ্ঞানটিকে আমরা দীর্ঘদিন পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রীয় দক্ষতা হিসেবে গুরুত্ব দিইনি।

এর পরিণতি আমাদের চারপাশেই দেখা যায়। শহরে কিছু তরুণ ক্রেডিট কার্ড হাতে পেয়ে এমনভাবে ব্যয় করে, যা পরে পরিশোধ করতে গিয়ে বছরের পর বছর চাপ তৈরি করে। তারা অনেক সময় বোঝে না, নির্ধারিত সময়ে বকেয়া না মেটালে সুদ, জরিমানা ও নানা চার্জ মিলিয়ে ঋণের বোঝা দ্রুত বেড়ে যায়। গ্রামে কৃষক প্রায়ই মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেন সুদের প্রকৃত হিসাব না জেনেই, শুধু বিশ্বাসের ওপর ভর করে। বছর শেষে ফসল বিক্রি করেও অনেক সময় সুদ মেটে না, আসল তো দূরের কথা। মধ্যবিত্ত পরিবার মাসিক কিস্তিতে ফ্রিজ, টেলিভিশন বা মোবাইল কেনে। সহজ কিস্তির আড়ালে প্রকৃত খরচ কত দাঁড়াচ্ছে, সেটি হিসাব করে দেখার অভ্যাস সবার নেই।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এই জ্ঞান কি মানুষ নিজে থেকেই অর্জন করে নেয় না? কিছুটা নেয়, ঠিকই। কিন্তু অনেক সময় সেটি হয় দেরিতে এবং ক্ষতির পর। ভুল থেকে শেখা জীবনের একটি পথ, কিন্তু টাকার ব্যাপারে ভুল মানেই বড় ধরনের চাপ। একবার ঋণের ফাঁদে পড়লে, একবার সঞ্চয় না করার অভ্যাস গেঁড়ে বসলে, একবার ভুল জায়গায় বিনিয়োগ করলে, তা সামলে উঠতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সম্পর্কে টানাপোড়েন আসে, মানসিক চাপ বাড়ে। এই কষ্টের অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো, যদি কিশোর বয়সেই সহজ ও ব্যবহারিক আর্থিক শিক্ষা দেওয়া যেত।

পৃথিবীর অনেক দেশ এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ইংল্যান্ডে মাধ্যমিক পর্যায়ে আর্থিক শিক্ষা নাগরিক শিক্ষা ও গণিতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আরও অনেক দেশে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বাজেট করা, সঞ্চয় করা, দায়িত্বশীলভাবে খরচ করা এবং ঋণের ঝুঁকি বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। তবে শুধু পাঠ্যক্রমে বিষয়টি রাখলেই যথেষ্ট নয়। সেটি কতটা বাস্তবভাবে শেখানো হচ্ছে, শিক্ষকরা কতটা প্রস্তুত, শিক্ষার্থীরা দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে তা কতটা মিলিয়ে নিতে পারছে, এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়লেও আর্থিক সাক্ষরতার জায়গাটি এখনও দুর্বল। এখানে ব্যাংক হিসাব থাকা মানেই আর্থিকভাবে সচেতন হওয়া নয়। মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করা মানেই সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ঋণ বা বীমা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা নয়। অনেক মানুষ টাকা পাঠাতে পারেন, কিন্তু মাসিক বাজেট করতে পারেন না। কিস্তিতে পণ্য কিনতে পারেন, কিন্তু মোট খরচ কত দাঁড়াবে তা হিসাব করেন না। ঋণ নিতে পারেন, কিন্তু সুদ ও পরিশোধের চাপ কতটা হতে পারে, সেটি আগেভাগে বুঝে ওঠেন না।

স্কুলের পাঠ্যবইয়ে এই বিষয়টি যুক্ত করা আসলে কঠিন কিছু নয়। জটিল অর্থনীতির তত্ত্ব শেখানোর দরকার নেই। দরকার কিছু সহজ, ব্যবহারিক পাঠ। একটি ব্যাংক হিসাব কীভাবে খোলা হয়, সাধারণ সুদ ও চক্রবৃদ্ধি সুদের পার্থক্য কোথায়, পরিবারের জন্য মাসিক বাজেট কীভাবে তৈরি করা যায়, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য কী, ঋণ নেওয়ার আগে কোন বিষয়গুলো ভাবতে হয়, বীমা কেন দরকার, প্রতারণামূলক বিনিয়োগের ফাঁদ কীভাবে চেনা যায়, এসব জানা একজন তরুণকে অনেক বড় ভুল থেকে বাঁচাতে পারে।

পরিবর্তন শুধু পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ রাখলেই হবে না। পরিবারেও টাকার বিষয়ে স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর আলোচনা দরকার। মা-বাবা বাজারে গেলে সন্তানকে দামের তুলনা করতে শেখাতে পারেন। ঈদের সেলামি বা জন্মদিনের উপহার থেকে কিছু অংশ জমিয়ে রাখার অভ্যাস তৈরি করা যায়। স্কুলে ছোট ছোট প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাল্পনিক বাজেট বানাতে বলা যায়। মাসে একবার তারা লিখতে পারে, আয় থাকলে কীভাবে খরচ করত, কীভাবে সঞ্চয় করত। এই অনুশীলনগুলো দেখতে ছোট, কিন্তু ভবিষ্যৎ জীবনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

রহিম সাহেবের গল্পে ফিরে আসি। তিনি শেষমেশ একদিন কয়েকটি বই ও প্রবন্ধ পড়ে বুঝতে পারলেন, সমস্যাটা কোথায়। তিনি একটি ছোট নোটবুকে প্রতি মাসের আয়-ব্যয় লিখতে শুরু করলেন। প্রথম মাসেই চমকে গেলেন। কত অপ্রয়োজনীয় খরচ প্রতিদিন হয়ে যাচ্ছে, অথচ চোখে পড়েনি কখনো। আস্তে আস্তে সেই ফাঁকগুলো বন্ধ হলো। দুই বছরের মাথায় তার একটি ছোট সঞ্চয় দাঁড়াল। প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষা কি তার আরও অনেক আগে পাওয়া উচিত ছিল না?

টাকার হিসাব জানা মানে কৃপণ হওয়া নয়। টাকাকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানানোও নয়। বরং এটি নিজের জীবনকে নিজে পরিচালনা করার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা একজন মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে, পরিবারকে নিরাপদ রাখে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যেও ভূমিকা রাখে। তবু এই পাঠটি আমরা এখনও শিশুদের যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শেখাচ্ছি না, এটা ভাবলে সত্যিই অবাক হতে হয়।

সময় এসেছে স্বীকার করার যে ত্রিভুজের ক্ষেত্রফলের পাশাপাশি সংসারের বাজেটও পাঠ্যবইয়ে জায়গা পাওয়ার যোগ্য। কারণ জীবন শুধু পরীক্ষার খাতা দিয়ে চলে না, চলে সিদ্ধান্ত দিয়ে। আর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার মূল্য দিতে হয় শুধু একজন মানুষকে নয়, পুরো পরিবারকে।

আনিসুর বুলবুল: লেখক ও সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

কিরিলের ল্যাপটপ চুরি বনাম আমাদের ভাবমূর্তি

কিরিলের ল্যাপটপ চুরি বনাম আমাদের ভাবমূর্তি

কওমি মাদ্রাসার জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা

কওমি মাদ্রাসার জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা

অন্যমত দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

র-মোসাদ আঁতাত : বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করণীয়

র-মোসাদ আঁতাত : বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করণীয়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম