Logo
Logo
×
   

দৃষ্টিপাত

দুর্ঘটনার পর আমরা কী করি, আর কী করা উচিত?

আনিসুর বুলবুল

আনিসুর বুলবুল

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১১:৩৮ এএম

দুর্ঘটনার পর আমরা কী করি, আর কী করা উচিত?

প্রতীকী ছবি

একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও। কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য। অথচ সেই কয়েক সেকেন্ডই যেন আমাদের সমাজের একটি বড় বাস্তবতাকে চোখের সামনে তুলে ধরে।

ভিডিওতে দেখা যায়, দুই নির্মাণশ্রমিক রাস্তার পাশে কাজ করছেন। সম্ভবত একটি লম্বা লোহার রড ওপরে তোলার চেষ্টা করছিলেন। আশপাশ দিয়ে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, যানবাহন চলাচল করছে, সবকিছুই স্বাভাবিক। হঠাৎ এক মুহূর্তে বদলে যায় দৃশ্যপট। বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়েন দুজন শ্রমিক। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন আরেকজনের ওপর নেতিয়ে পড়েন, তারপর দুজনই রাস্তার ওপর লুটিয়ে যান।

প্রথমে আশপাশের মানুষ কিছুই বুঝতে পারেন না। কেউ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকেন, কেউ হতভম্ব হয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন। এরপর যখন ধারণা হয় যে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে, তখন সবাই ছুটে আসেন সাহায্য করতে। কিন্তু সাহায্য করার সেই আন্তরিক চেষ্টার মধ্যেই ধরা পড়ে আরেকটি বড় সমস্যা। একজনকে স্যান্ডেল দিয়ে পেটানো হচ্ছে, আরেকজনকে তুলে ঝাঁকানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, মানুষ দুটিকে বাঁচানো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এভাবে কি সত্যিই কাউকে বাঁচানো যায়?

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে এ ধরনের দৃশ্য নতুন নয়। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে যাওয়া, হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়া কিংবা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার মতো ঘটনার পর আশপাশের মানুষের ভিড় দ্রুত জমে যায়। সাহায্য করার ইচ্ছারও কমতি থাকে না। কিন্তু সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে ধারণার অভাবে অনেক সময় সেই সাহায্যই হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ।

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট কোনো ব্যক্তিকে ঝাঁকানো, টেনে-হিঁচড়ে ওঠানো বা শরীরে আঘাত করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো স্বীকৃত পদ্ধতি নয়। বরং এতে মেরুদণ্ড, ঘাড় কিংবা শরীরের ভেতরের আঘাত আরও গুরুতর হতে পারে। বিদ্যুতের আঘাতে আক্রান্ত ব্যক্তির হৃদস্পন্দন বা শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে দ্রুত ও সঠিক ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তির কাছে যাওয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে বিদ্যুতের সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এরপর তার শ্বাসপ্রশ্বাস ও সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষিত ব্যক্তি হৃদযন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস সচল রাখার জরুরি প্রক্রিয়া প্রয়োগ করতে পারেন। একই সঙ্গে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ মানুষ এসব বিষয়ে প্রাথমিক ধারণাও রাখি না।

আসলে সমস্যা মানুষের সদিচ্ছার নয়, সমস্যাটি জ্ঞানের। আমরা স্কুলে গণিত শিখি, ইতিহাস শিখি, বিজ্ঞান শিখি। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে জরুরি দক্ষতাগুলোর একটি, অর্থাৎ দুর্ঘটনার পর কী করতে হবে, তা খুব কম মানুষই শেখার সুযোগ পাই। ফলে বাস্তব পরিস্থিতিতে আমরা অনুমাননির্ভর আচরণ করি। কেউ পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করেন, কেউ মুখে বাতাস দেন, কেউ জুতা দিয়ে আঘাত করেন, কেউ আবার আহত মানুষকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে নাড়াচাড়া করেন।

প্রাথমিক চিকিৎসা মানে ডাক্তার হয়ে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো, বিপদের মুহূর্তে কী করতে হবে এবং কী করা যাবে না, সেই মৌলিক জ্ঞান থাকা। রক্তপাত হলে কীভাবে চাপ দিতে হয়, কেউ শ্বাস নিতে না পারলে কীভাবে সহায়তা করতে হয়, পোড়ার পর কী ব্যবস্থা নিতে হয়, অজ্ঞান মানুষকে কীভাবে নিরাপদে রাখতে হয়, এসব জানা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষেও সম্ভব।

দুর্ঘটনার পর অনেক ভুল কাজ করা হয় অজ্ঞতা থেকে। উদ্দেশ্য থাকে সাহায্য করা, কিন্তু সঠিক জ্ঞান না থাকলে সেই চেষ্টা কখনো ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবার অনেকেই ভয়ের কারণে এগিয়ে আসেন না। ভুল হয়ে গেলে কী হবে, এই চিন্তা তাদের পিছিয়ে দেয়। অথচ সামান্য প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা একজন মানুষকে এমন পরিস্থিতিতে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।

একটি দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক মিনিটকে অনেক সময় 'সোনালি সময়' বলা হয়। এই সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। আবার ভুল পদক্ষেপের কারণে ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যেতে পারে। তাই প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এখন সময়ের দাবি।

আমরা প্রায়ই বলি, মানুষ মানুষের জন্য। কথাটি সত্যি। কিন্তু মানুষের জন্য দাঁড়াতে হলে শুধু সহানুভূতি থাকলেই হবে না, থাকতে হবে সঠিক জ্ঞানও। কারণ দুর্ঘটনার মুহূর্তে একজন সচেতন মানুষ কখনো কখনো একটি অ্যাম্বুলেন্সের চেয়েও মূল্যবান হয়ে উঠতে পারেন।

সেই ভিডিওর দুই শ্রমিকের পরিণতি কী হয়েছিল, তা জানা যায়নি। তারা বেঁচে ফিরেছিলেন কি না, সেটিও অজানা। কিন্তু ভিডিওটি একটি প্রশ্ন রেখে যায় আমাদের সবার কাছে। আমরা কি সত্যিই জানি, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কীভাবে সাহায্য করতে হয়?

সম্ভবত এখন সময় এসেছে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার।

আনিসুর বুলবুল, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .