জাতীয় সংহতি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট—প্রত্যাশা নয়, সময়ের দাবি
Advertisement
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম
প্রতীকী ছবি: এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কোনো দেশের নাগরিকরা যখন ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল কিংবা মতাদর্শগত পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে, তখনই একটি শক্তিশালী জাতীয় সংহতির ভিত্তি গড়ে ওঠে। আর একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতির পেছনে যে কয়েকটি মৌলিক শক্তি কাজ করে, তার মধ্যে এই জাতীয় সংহতি হলো অন্যতম। পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এই চর্চাই একটি জাতিকে সংকট মোকাবিলা এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।
বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাতীয় সংহতি বারবার দেশের অগ্রযাত্রার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং গণতন্ত্রের বিকাশ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব অপরিসীম। রাষ্ট্র গঠন থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার বিভিন্ন অধ্যায়ে এই সংহতির প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ছাতার নিচে বাঙালিদের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, যেমন- চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, ত্রিপুরা, বসবাস করে। ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও তারা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক এবং দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
একইভাবে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করেন এবং একে অপরের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। এই বহুত্ববাদী ঐতিহ্যই জাতীয় সংহতির অন্যতম ভিত্তি।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জাতীয় সংহতি ছিল স্বাধীনতার সংগ্রামের অন্যতম প্রধান শক্তি। ধর্ম, বর্ণ ও পেশার ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। এ ঐক্যের ফলে আন্দোলন আরও শক্তিশালী ও ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরবর্তীকালে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনেও জাতীয় সংহতি বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ভাষা, সংস্কৃতি ও ন্যায্য অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। এই ঐক্য আন্দোলনকে শক্তিশালী করে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ সুগম করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে জাতীয় সংহতি ছিল অন্যতম প্রধান শক্তি। এই ঐক্যের ফলে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ সুদৃঢ় হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।
জাতীয় সংহতির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়
৭ নভেম্বর ১৯৭৫, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস; বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন, যা জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার ধারণাকে গুরুত্ব দেয়। এই দিনটি অস্থিরতা ও সংকটের পর দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও জাতীয় সংহতির একটি বিশেষ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অসামান্য নেতৃত্বে এই দিনে সেনাবাহিনী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়, দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রচেষ্টা জোরদার হয়, জাতীয় ঐক্য ও দেশপ্রেমের চেতনা পুনর্বিকশিত হয়, যা পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় স্থিতিশীলতা আনতে ভূমিকা রাখে।
এছাড়া ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনও ছিল জাতীয় সংহতির একটি শক্তিশালী বার্তা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন, পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলে। এ ঐক্য আন্দোলনকে সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।
সবশেষে জাতীয় সংহতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানকে। এই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক মত, সামাজিক অবস্থান কিংবা পেশাগত পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও ছাত্রছাত্রী, বিভিন্ন পেশাজীবীসহ সাধারণ জনগণ ন্যায্য অধিকার, সমতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার দাবিতে এক কাতারে দাঁড়ায়। জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে মানুষের এই সম্মিলিত অবস্থান জাতীয় সংহতির একটি শক্তিশালী প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আন্দোলনটি প্রমাণ করেছে, সংকটময় সময়ে বাংলাদেশের জনগণ এখনো যৌথ স্বার্থ ও অভিন্ন লক্ষ্যকে সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সক্ষমতা রাখে।
জুলাইয়ের এ আন্দোলন আমাদের দেখিয়েছে যে, জাতীয় ঐক্য কেবল একটি আবেগগত বিষয় নয়; বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সংঘটিত এসব আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে জাতীয় সংহতিরই একটি সুস্পষ্ট বাস্তবতা তুলে ধরে; কিন্তু এ সংহতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠলেও সেটি দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন গবেষণা, নীতিনির্ধারণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।
সেই বিবেচনায় বাংলাদেশে একটি জাতীয় সংহতি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা আজ আর কেবল একটি প্রত্যাশা নয়, বরং সময়ের দাবি। জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি বিকাশে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়া সরকারের গৃহীত সাম্প্রতিক নীতিমালা, গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ এবং সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বাংলাদেশের জন্য একটি অনুসরণযোগ্য ও কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা: একটি অনুসরণযোগ্য মডেল
মালয়েশিয়া এমন একটি দেশ, যেখানে উচ্চশিক্ষা প্রায়শই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। এর একটি কারণ হলো, মালয়েশিয়া বহু বছর ধরেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে উচ্চশিক্ষাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। দেশটির সরকার আগামী দশকের জন্য উচ্চশিক্ষা বিষয়ক একটি নতুন রূপরেখা প্রকাশ করেছে। এটি একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী দলিল, যাতে ১০টি ‘স্তম্ভ’ বা মূল বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে; ২০৩৫ সাল পর্যন্ত এই শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিচালনার ক্ষেত্রে এগুলোই দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। দেশটির উচ্চশিক্ষা নীতিমালার জটিল প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে, এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি নীতি-উদ্যোগ হতে যাচ্ছে। মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে আন্ত:ধর্মীয় ও আন্ত:জাতিগত সম্পর্ক এবং সম্প্রীতি গড়ে তোলার প্রধান নির্দেশিকা হিসেবে একটি মালয়েশিয়া সম্প্রীতি সনদ (Harmony Charter) প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ভিত্তিতে একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ জাতিরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এই উদ্যোগ জাতীয় সংহতি আরও শক্তিশালী করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এছাড়া মালয়েশিয়ান সরকার সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল গেমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে আরও ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক সংহতি ও মিথস্ক্রিয়া বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এছাড়া জাতীয় চেতনা সুদৃঢ় করতে এবং মালয়েশিয়ার পরিচিতিকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে জাতিরাষ্ট্র গঠনের কার্যক্রমকে বেগবান করেছে।
মালয়েশিয়ান সরকার জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে, যার মধ্যে ‘ইনস্টিটিউট কাজিয়ান দান লাতিহান ইন্টিগ্রাসি ন্যাসিওনা’ (Institut Kajian dan Latihan Integrasi Nasional/ National Unity and Research Institute) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি মূলত বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধির জন্য গবেষণা ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করে।
এ প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং নীতিগত সহায়তা প্রদান করে। এর প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে- বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক ও সম্প্রীতি নিয়ে গবেষণা, জাতীয় সংহতি বৃদ্ধির জন্য নীতিমালা প্রণয়নে সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা, সামাজিক সংঘাতের কারণ বিশ্লেষণ, শিক্ষা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সহনশীলতার চর্চা এবং সরকারকে গবেষণাভিত্তিক তথ্য সরবরাহ করা।
দেশপ্রেম ও জাতীয় সত্তা সুদৃঢ়করণের লক্ষ্যে মালেশিয়ান সরকার এ প্রতিষ্ঠানকে একটি উৎকর্ষকেন্দ্র (centre of excellence) হিসেবে উন্নীত করতে যাচ্ছে ।
বাংলাদেশের জন্য সময়োপযোগী উদ্যোগ
বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে জাতীয় সংহতি একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও পেশার ভেদাভেদ ভুলে জনগণ যখন একত্রিত হয়েছে, তখনই আন্দোলনগুলো সফলতা অর্জন করেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল জাতীয় সংহতি।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও উন্নয়নের যাত্রাপথ বহুবার সংকট, সংঘাত ও রক্তক্ষয়ের মুখোমুখি হয়েছে। এখন দেশের সামনে রয়েছে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই উন্নয়নের নতুন চ্যালেঞ্জ।
সেই লক্ষ্য অর্জনে ঐক্যবিষয়ক সামগ্রিক পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’ উন্নত করা, সংশ্লিষ্ট শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সাধারণ জনগণ, ছাত্রছাত্রী, রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষাবিদ, এনজিও এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এই বাস্তবতায় মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে একটি জাতীয় সংহতি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: উপাচার্য, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়

