মামলা হলেই অপরাধী বিবেচনা মানবাধিকারের লঙ্ঘন
মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১০:১১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো আইনের শাসন (Rule of Law)। আইনের শাসনের মৌলিক নীতি হচ্ছে—কোনো ব্যক্তিকে আদালতে আইনসম্মত বিচার ছাড়া অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন অপরাধ দমন করা, তেমনি নিরপরাধ ব্যক্তিকে অন্যায় হয়রানি, অবৈধ আটক কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে রক্ষা করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা এবং আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করেছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনও প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য ন্যায্য বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে।
অতএব, কোনো ব্যক্তি যত বিতর্কিতই হোন না কেন কিংবা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক না কেন, আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগে তাঁকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
মামলা হওয়া আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়
বাংলাদেশে একটি ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে, কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে মানেই তিনি অপরাধী। অথচ বিষয়টি মোটেই সঠিক নয়।
যে কোনো মামলা হলো অভিযোগের সূচনা মাত্র। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, জেরা এবং আদালতের বিচারের পরই নির্ধারিত হবে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না।
অনেক সময় দেখা যায়, দীর্ঘ বিচার শেষে আদালত অভিযুক্তকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করেন। কিন্তু ততদিনে তাঁর কর্মজীবন ধ্বংস হয়ে গেছে, সামাজিক মর্যাদা নষ্ট হয়েছে, পরিবার ভেঙে পড়েছে এবং মানসিকভাবে তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ জুলুমের প্রতিকার করা আর সম্ভব হয়না।
বিচারপূর্ব কারাবাস ন্যায়বিচারের পরিপন্থী
বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বিপুল সংখ্যক বিচারাধীন বন্দি রয়েছেন। এদের অনেকেই এখনও আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হননি।
বাস্তবে অনেক সময় একজন ব্যক্তি পাঁচ, সাত কিংবা দশ বছর পর্যন্ত বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে কাটিয়ে দেন। পরে যদি তিনি খালাস পান, তাহলে এই দীর্ঘ কারাবাস ন্যায়বিচারের চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে না।
স্বাধীনতা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। আদালতের রায় ছাড়াই বছরের পর বছর কারাগারে থাকা অনেক ক্ষেত্রেই কার্যত এক ধরনের আগাম শাস্তিতে পরিণত হয়।
অবশ্যই এমন পরিস্থিতিও রয়েছে, যেখানে তদন্তের স্বার্থে, সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্য, আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় কিংবা অভিযুক্তের পলায়নের ঝুঁকি থাকলে আদালত বিচারপূর্ব আটক অনুমোদন করতে পারেন। তবে তা বিশেষ ক্ষেত্রে হওয়া উচিত; স্বাভাবিক ক্ষেত্রে নয়। ব্যতিক্রমকে সাধারণ নিয়মে পরিণত করা সমীচীন হবে না।
মিথ্যা মামলা: বিচারব্যবস্থার নীরব সংকট
এ অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় যে, বাংলাদেশে অনেক সময় ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, রাজনৈতিক বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, জমি-জমার বিরোধ কিংবা সামাজিক প্রতিহিংসার কারণে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়।
তবে অধিকাংশ মামলা প্রকৃত অভিযোগের ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়াও তেমনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিচারালয়ে এমন সব ঘটনা ঘটে থাকে যা কেবল খুবই দুঃখজনকই নয় বরং ন্যায় বিচারের সুস্পষ্ট পরিপন্থী।
যখন মামলা সত্য উদ্ঘাটনের পরিবর্তে হয়রানির অস্ত্রে পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা। একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন করতে হলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই।
মামলা গ্রহণের আগে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রশ্ন সামনে আসে। প্রত্যেক অভিযোগের ক্ষেত্রে আইন যে পরিসরে অনুমতি দেয়, সেই পরিসরে একটি কার্যকর প্রাথমিক যাচাই (Preliminary Scrutiny) ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। এর উদ্দেশ্য হবে:
* অভিযোগের ন্যূনতম ভিত্তি আছে কি না তা যাচাই করা;
* সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যে বা হয়রানিমূলক অভিযোগ শনাক্ত করা;
* নিরপরাধ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় গ্রেপ্তার ও হয়রানি থেকে রক্ষা করা;
* একই সঙ্গে প্রকৃত ভুক্তভোগীর অভিযোগ দ্রুত তদন্তের আওতায় আনা।
তবে এই প্রাথমিক যাচাই এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে প্রকৃত অপরাধের শিকার ব্যক্তি ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন।
মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ করতে হলে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধেও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
যদি আদালত বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয় যে—
* জেনেশুনে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে,
* জাল প্রমাণ তৈরি করা হয়েছে,
* ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য মামলা করা হয়েছে,
তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার—কেবল মামলা খারিজ হয়ে যাওয়া বা অভিযুক্ত খালাস পাওয়া মানেই অভিযোগকারী অসৎ উদ্দেশ্যে মামলা করেছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। ইচ্ছাকৃত মিথ্যা অভিযোগের বিষয়টিও পৃথকভাবে প্রমাণিত হতে হবে।
জামিনই হওয়া উচিত সাধারণ নীতি।
আধুনিক বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো—“Bail, not Jail”।
অর্থাৎ, যেখানে জননিরাপত্তা, তদন্ত কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বার্থ গুরুতরভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা নেই, সেখানে জামিনই হওয়া উচিত সাধারণ নীতি এবং কারাগারে পাঠানো হওয়া উচিত ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা।
এতে একদিকে যেমন মানবাধিকার রক্ষা হবে অন্যদিকে কারাগারের অতিরিক্ত ভিড়ও কমে যাবে।
দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা মানবাধিকারের দাবি।
বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করাও এক ধরনের অবিচার।
“Justice delayed is justice denied”—বিচারে অযৌক্তিক বিলম্ব ন্যায়বিচারকে অর্থহীন করে দেয়।
এ অবস্থা নিরসনে দ্রুত তদন্ত, নির্ধারিত সময়ে অভিযোগপত্র দাখিল, পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং
সাক্ষ্যগ্রহণের গতি বৃদ্ধি করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন আদালত না হয়ে ওঠে
বর্তমান সময়ে অভিযোগ ওঠার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা করে দেওয়া হয়। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা।
বিচার হবে আদালতে; ফেসবুক, ইউটিউব বা টকশোতে নয়। জনমত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
সংস্কারের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থায় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা ভীষণ প্রয়োজন বলে মনে করি।
* মামলা গ্রহণ ও তদন্তে পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি;
* হয়রানিমূলক মামলার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ;
* অপ্রয়োজনীয় গ্রেপ্তার কমানো;
* জামিননীতির যৌক্তিক প্রয়োগ;
* বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি;
* ইচ্ছাকৃত মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হলে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা;
* বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা আরও সুদৃঢ় করা।
এ কথা ভুলে গেলে চলবেনা যে,ন্যায়বিচারই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি। রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে নয়; বরং নিরপরাধ মানুষকে রক্ষা করার মধ্যেও নিহিত।
একজন প্রকৃত অপরাধী যেন শাস্তি থেকে রেহাই না পান, আবার একজন নিরপরাধ ব্যক্তি যেন মিথ্যা অভিযোগ, অযৌক্তিক গ্রেপ্তার কিংবা দীর্ঘ বিচারপূর্ব কারাবাসের শিকার না হন—এই ভারসাম্য রক্ষা করাই আইনের শাসনের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
মামলা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সূচনা মাত্র; অপরাধ প্রমাণের সমার্থক নয়। তাই বিচার শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা, কিংবা অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখা, ন্যায়বিচারের চেতনাকে দুর্বল করে। অন্যদিকে, মিথ্যা মামলা করে কাউকে হয়রানি করার প্রবণতাও সমানভাবে আইনের শাসনের পরিপন্থী।
বাংলাদেশে এমন একটি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি, যেখানে প্রকৃত অপরাধী আইনের কঠোর শাস্তি পাবে, নিরপরাধ ব্যক্তি রাষ্ট্রের সুরক্ষা পাবে, মিথ্যা মামলা নিরুৎসাহিত হবে এবং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
লেখক: সমাজ ও রাষ্ট্র চিন্তক, অর্থনীতিবিদ ও মানবাধিকার কর্মী
