পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য: একটি তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ
Advertisement
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:১৯ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে ন্যস্ত, সেই পুলিশ সদস্যদের মধ্যেই যখন আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; বরং একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ পুলিশে আত্মহত্যার ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১২৪ জন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়েই অন্তত ২০ জন সদস্য আত্মহত্যা করেছেন।
এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন, একটি পেশাগত সংগ্রাম এবং একটি নীরব মানসিক যুদ্ধ। আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর্মচাপ, পারিবারিক অস্থিরতা, আর্থিক সংকট, ঋণগ্রস্ততা, অনলাইন জুয়ায় আসক্তি, মানসিক অবসাদ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
পুলিশ পেশা পৃথিবীর সবচেয়ে চাপপূর্ণ পেশাগুলোর একটি। একজন পুলিশ সদস্যকে দিনে-রাতে, ছুটির দিনে, উৎসবের সময় এবং সংকটময় পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত কর্মঘণ্টার চেয়ে অনেক বেশি সময় কাজ করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই চাপ বহন করতে গিয়ে অনেক সদস্য মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। যখন এই ক্লান্তির সঙ্গে পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা সামাজিক হতাশা যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ দমন করা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। সমাজে যখন কোনো সংকট দেখা দেয়, তখন সাধারণ মানুষ প্রথমে পুলিশের কাছেই আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যারা অন্যের জীবন রক্ষা করেন, তাদের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশে গত এক বছরে একাধিক পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন । আবার অনেক সদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এসব ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
আত্মহত্যা একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ঘটনা। সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম আত্মহত্যাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি এটিকে সামাজিক সংহতি ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, ব্যক্তি যখন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অথবা অতিরিক্ত সামাজিক চাপের মুখোমুখি হয়, তখন আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। পুলিশের পেশাগত বাস্তবতায় এই দুই ধরনের পরিস্থিতিই অনেক সময় দেখা যায়।
একজন পুলিশ সদস্যকে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ছুটি, পারিবারিক সময় কিংবা ব্যক্তিগত অবসর নিশ্চিত হয় না। উৎসব, নির্বাচন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সময় তাদের কাজের চাপ আরও বেড়ে যায়। এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ ধীরে ধীরে মানসিক ক্লান্তি, হতাশা এবং অবসাদের জন্ম দেয়।
মনোবিজ্ঞানে ‘বার্নআউট সিনড্রোম’ নামে একটি ধারণা রয়েছে। দীর্ঘদিনের কর্মচাপ, মানসিক ক্লান্তি এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন। পুলিশ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। কারণ তারা নিয়মিত অপরাধ, সহিংসতা, দুর্ঘটনা, মৃত্যু এবং মানবিক বিপর্যয়ের মতো ঘটনাগুলোর মুখোমুখি হন। এসব অভিজ্ঞতা অনেক সময় পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতার জন্ম দেয় ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল আসক্তি। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন এবং পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, আত্মহত্যাকারী কিছু পুলিশ সদস্য অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। অনলাইন জুয়া সাধারণত দ্রুত অর্থ উপার্জনের একটি ভ্রান্ত আশা সৃষ্টি করে । প্রথমদিকে সামান্য লাভের অভিজ্ঞতা একজন ব্যক্তিকে আরও বেশি ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করে। পরে যখন ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে থাকে, তখন ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, পারিবারিক কলহ এবং সামাজিক লজ্জা এক ধরনের অসহায়ত্ব তৈরি করে।
মনোবিজ্ঞানী মার্টিন সেলিগম্যানের ‘লার্নড হেল্পলেসনেস’ তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্যক্তি যখন বারবার ব্যর্থতার সম্মুখীন হন এবং পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো পথ খুঁজে পান না, তখন তার মধ্যে অসহায়ত্বের অনুভূতি তৈরি হয়। এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে আত্মহত্যার চিন্তা দেখা দিতে পারে। অনলাইন জুয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই এই তত্ত্ব প্রযোজ্য বলে মনে করা হয়।
পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার পেছনে পারিবারিক সম্পর্কের অবনতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। পরিবার সাধারণত মানসিক সহায়তার প্রধান উৎস। কিন্তু যখন পরিবারের মধ্যেই দ্বন্দ্ব, কলহ কিংবা সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তখন ব্যক্তি আরও একাকী হয়ে পড়েন। বিশেষ করে ঋণ, আর্থিক সংকট কিংবা দাম্পত্য সমস্যার কারণে পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যায় ।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। একজন পুলিশ সদস্য যদি মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করেন, তাহলে অনেক সময় তাকে দুর্বল বা অযোগ্য হিসেবে দেখার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেকেই নিজের কষ্ট নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রাখেন। এর ফলে সমস্যার প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা বা পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ নষ্ট হয়।
পুলিশ সংগঠনের সাংগঠনিক সংস্কৃতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কঠোরতা, সহনশীলতা এবং মানসিক দৃঢ়তাকে পেশাগত গুণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে অনেক সদস্য মনে করেন যে মানসিক কষ্ট প্রকাশ করা দুর্বলতার পরিচয়। এই সংস্কৃতি অনেক সময় নীরব মানসিক সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
আত্মহত্যার সঙ্গে মাদকাসক্তির সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনেক ব্যক্তি মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। প্রাথমিকভাবে এটি সাময়িক স্বস্তি দিলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। মাদক ব্যক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল করে এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
যদি কোনো বাহিনীর সদস্যরা গোপনে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন, তাহলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্বেগের বিষয়।
আত্মহত্যা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ‘স্ট্রেইন থিওরি’ বা চাপ তত্ত্বও প্রাসঙ্গিক। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মার্টনের মতে, ব্যক্তি যখন সামাজিক প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হন এবং বৈধ উপায়ে লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ সীমিত মনে করেন, তখন চাপের সৃষ্টি হয়। ঋণ, পারিবারিক দায়িত্ব, পেশাগত প্রত্যাশা এবং সামাজিক মর্যাদা রক্ষার চাপ একসঙ্গে কাজ করলে মানসিক ভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুলিশ সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন, গোপন কাউন্সেলিং সেবা, সহকর্মী সহায়তা কর্মসূচি, ট্রমা-পরবর্তী মানসিক পরিচর্যা এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ প্রশিক্ষণ অনেক দেশে ইতিবাচক ফল দিয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশ পুলিশে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন । প্রতিটি ইউনিটে প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলর নিয়োগ, গোপন মানসিক স্বাস্থ্য হটলাইন চালু, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ সদস্যদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অনলাইন জুয়া ও মাদকাসক্তি প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা দরকার।
কর্মপরিবেশ উন্নয়নও অত্যন্ত জরুরি। অতিরিক্ত কর্মঘন্টা কমানো, পর্যাপ্ত ছুটি নিশ্চিত করা, পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি করা এবং মানবিক নেতৃত্ব বিকাশ করা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে, সহানুভূতিশীল নেতৃত্ব কর্মীদের মানসিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।
পুলিশ সদস্যদের পরিবারের জন্যও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যরা যদি মানসিক সংকটের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনতে পারেন, তাহলে সময়মতো সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। অনেক আত্মহত্যা যথাসময়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়।
সবশেষে বলা যায়, পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যা কোনো একক কারণের ফল নয়। এটি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক নানা কারণের সম্মিলিত প্রতিফলন। অনলাইন জুয়া, ঋণগ্রস্ততা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, কর্মচাপ, মানসিক অসুস্থতা এবং সামাজিক কলঙ্ক- সবগুলো উপাদান একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সমস্যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত।
যে পুলিশ সদস্যরা প্রতিদিন সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তাদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। আত্মহত্যাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটিকে একটি
জনস্বাস্থ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই ইউনিফর্মের আড়ালে থাকা নীরব আর্তনাদ কমবে এবং একটি আরও মানবিক, সুস্থ ও কার্যকর পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
ড. মো. রুহুল আমিন সরকার
অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা

