Logo
Logo
×
   

দৃষ্টিপাত

সাইবার বুলিং, তরুণদের ওপর প্রভাব

Icon

প্রদীপ্ত মোবারক

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৪ পিএম

সাইবার বুলিং, তরুণদের ওপর প্রভাব

একসময় অপমানেরও একটি ভূগোল ছিল। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ, পাড়া কিংবা পরিচিত সামাজিক পরিসরের মধ্যেই তার বিস্তার সীমাবদ্ধ থাকত।

অপমানিত মানুষটি অন্তত ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করে কিছুটা নিরাপদ হতে পারত। ডিজিটাল যুগ সেই নিরাপদ দরজাটিও প্রায় অদৃশ্য করে দিয়েছে। এখন একটি বিদ্রূপ, একটি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, বিকৃত ছবি কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব মুহূর্তেই হাজার মানুষের মুঠোফোনে পৌঁছে যেতে পারে।

মানুষ ঘরে ফিরলেও অপমান তার পিছু ছাড়ে না। স্মার্টফোনের পর্দা পেরিয়ে সেটি প্রবেশ করে ব্যক্তির একান্ত মনোজগতে। এই নির্মম বাস্তবতার নাম "সাইবার বুলিং"।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের নিষ্ঠুরতাকেও দিয়েছে নতুন অস্ত্র, নতুন গতি এবং প্রায় সীমাহীন বিস্তার। বিশেষত তরুণদের জীবনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আত্মপরিচয় নির্মাণ, সামাজিক স্বীকৃতি, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, মতপ্রকাশ এবং আত্মপ্রদর্শনের এক বিশাল মঞ্চ। ফলে এই পরিসরে অপমানিত হওয়া অনেক তরুণের কাছে বাস্তব জীবনে অপমানিত হওয়ার চেয়েও কম যন্ত্রণাদায়ক নয়।

সাইবার বুলিংয়ের পরিধি বিস্তৃত। কাউকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করা, চেহারা বা শারীরিক গঠন নিয়ে বিদ্রূপ, ভুয়া পরিচয়ে অপপ্রচার, ব্যক্তিগত কথোপকথনের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়া, ছবি বা ভিডিও বিকৃত করা, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, সংঘবদ্ধভাবে কাউকে হেয় করা কিংবা ভয় ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, সবই এর বিভিন্ন অভিব্যক্তি। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ডিপফেক। অর্থাৎ যে কাজ একজন মানুষ কখনো করেননি, প্রযুক্তির সাহায্যে তাকেই সেই কাজের দৃশ্যের মধ্যে বসিয়ে দেওয়া সম্ভব। মিথ্যাকে বিশ্বাসযোগ্য দৃশ্যে রূপান্তরের এই সক্ষমতা সাইবার নিপীড়নকে আরও ভয়াবহ মাত্রায় নিয়ে গেছে।

সমস্যাটি কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক উদ্বেগ নয়; আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানও তার গভীরতা নির্দেশ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১-২২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে ৪৪টি দেশ ও অঞ্চলের কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ১৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরী সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে অর্থাৎ প্রায় প্রতি ছয়জনে একজন। ২০১৮ সালের তুলনায় এ হারও বেড়েছে। (তথ্য: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)

বাংলাদেশের চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫ সালে ইউনিসেফের ইউ-রিপোর্ট প্ল্যাটফর্মে প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণ-তরুণীর অংশগ্রহণে পরিচালিত জরিপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুলিং ও নেতিবাচক মন্তব্যকে সবচেয়ে চাপসৃষ্টিকারী অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রায় প্রতি সাতজনের একজন; মেয়েদের মধ্যে হারটি সামান্য বেশি। আরও ১৪ শতাংশ ক্ষতিকর বা মন খারাপ করার মতো কনটেন্টকে মানসিক চাপের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। লক্ষণীয়, ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা বুলিং ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের মতো ক্ষতিকর আচরণ ঠেকাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ম থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছে। (তথ্য : ইউনিসেফ)

সংখ্যার ভাষা অবশ্য মানুষের যন্ত্রণা পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না। একটি তরুণ যখন দিনের পর দিন তার চেহারা, শরীর, পরিবার, সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিদ্রূপের শিকার হয়, তখন আঘাতটি কেবল তার একটি ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেটি ধীরে ধীরে তার আত্মপরিচয়ের ভেতরে প্রবেশ করে। আমি কি সত্যিই এমন? এই প্রশ্ন একসময় আত্মসংশয়ে, আত্মসংশয় হীনম্মন্যতায় এবং হীনম্মন্যতা সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় রূপ নিতে পারে। পড়াশোনায় মনোযোগের অবক্ষয়, উদ্বেগ, নিঃসঙ্গতা, আত্মমর্যাদাবোধের সংকট, এসবের পেছনেও অনলাইন নিপীড়ন গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই প্রচলিত বুলিংয়ের সঙ্গে সাইবার বুলিংয়ের মৌলিক পার্থক্য। প্রথমটির দর্শক সীমিত; দ্বিতীয়টির দর্শক সম্ভাব্যভাবে অসীম। একটি শ্রেণিকক্ষে বলা কটু কথা ত্রিশজন শুনতে পারে, কিন্তু অনলাইনে প্রকাশিত একটি অপমানজনক ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কয়েক লাখ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো এর ডিজিটাল স্থায়িত্ব। পোস্ট মুছে ফেলা যায়, কিন্তু ইতিমধ্যে নেওয়া স্ক্রিনশট, ডাউনলোড করা ভিডিও কিংবা পুনঃপ্রকাশিত কনটেন্ট সব সময় মুছে ফেলা যায় না। অর্থাৎ ডিজিটাল পরিসরে একটি মুহূর্তের নিষ্ঠুরতা কখনো কখনো ভুক্তভোগীর জন্য দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক শাস্তিতে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এর আরেকটি বিপজ্জনক মাত্রা রয়েছে ভুক্তভোগীকেই অভিযুক্ত করার প্রবণতা। কারও ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে পড়লে আমরা প্রথমে জানতে চাই, ছবিটি তুলেছিল কেন ! কেউ ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে প্রশ্ন করি, ‘তার সঙ্গে কথা বলেছিল কেন ! অথচ প্রশ্ন হওয়া উচিত, অনুমতি ছাড়া ছবিটি ছড়াল কে, ভয় দেখাল কে, ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অপব্যবহার করল কে, অপরাধীর দায়কে আড়াল করে ভুক্তভোগীর চরিত্র বিশ্লেষণের এই সামাজিক প্রবণতা সাইবার অপরাধের জন্য এক ধরনের নীরব আশ্রয় তৈরি করে।

বিশেষত নারী ও কিশোরীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। ছবি বিকৃতি, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটর্শন কিংবা ডিপফেকের মাধ্যমে একজন নারীর সামাজিক মর্যাদা ধ্বংস করার চেষ্টা এখন প্রযুক্তিগতভাবে আগের চেয়ে অনেক সহজ। বাংলাদেশের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটর্শন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নির্মিত বা সম্পাদিত ক্ষতিকর উপাদান প্রচারের বিষয়কে অপরাধের আওতায় রাখা হয়েছে। কিন্তু আইন থাকা এবং ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়া এক বিষয় নয়। আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, সামাজিক লজ্জা এবং অভিযোগ করলে আরও অপমানিত হওয়ার ভয় অনেককে নীরব থাকতে বাধ্য করে।

তাহলে উত্তরণের পথ কোথায় :

প্রথমত, পরিবারকে ‘নজরদারির প্রতিষ্ঠান’ থেকে ‘আস্থার আশ্রয়’ হতে হবে। সন্তানের ফোন পরীক্ষা করাই ডিজিটাল নিরাপত্তা নয়; বরং এমন সম্পর্ক নির্মাণ জরুরি, যেখানে সন্তান বিপদে পড়লে শাস্তির ভয় নয়, সাহায্যের প্রত্যাশায় মা-বাবার কাছে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি ডিজিটাল নৈতিকতা ও নাগরিকত্ব শেখাতে হবে। প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—প্রযুক্তি ব্যবহার করে কী করা উচিত নয়।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অ্যালগরিদম যদি উত্তেজক, বিদ্বেষপূর্ণ কিংবা অপমানজনক কনটেন্টকে অধিক সম্পৃক্ততার কারণে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়, তবে সেটি নিছক প্রযুক্তিগত নিরপেক্ষতা নয়। কার্যকর কনটেন্ট মডারেশন, দ্রুত রিপোর্ট ও প্রতিকার ব্যবস্থা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিশেষ সুরক্ষা এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ইউনিসেফও নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ, কার্যকর মডারেশন এবং তরুণদের সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। (তথ্য : ইউনিসেফ)

তবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ প্রযুক্তি কিংবা আইন নয়, মানুষের বিবেক। পর্দার ওপাশে যাকে আমরা একটি মন্তব্য দিয়ে অপমান করছি, সে কোনো নিষ্প্রাণ ‘আইডি’ নয়। তার পরিবার আছে, আত্মসম্মান আছে, স্বপ্ন আছে, নিঃসঙ্গ রাত আছে। একটি ‘হা হা’ রিঅ্যাকশন আমাদের কাছে কয়েক সেকেন্ডের বিনোদন হতে পারে, অথচ সেটিই কারও জন্য গভীর অপমানের স্মারক হয়ে থাকতে পারে বহু বছর।

সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি কেবল দ্রুতগতির ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা অত্যাধুনিক স্মার্টফোনে পরিমাপ করা যায় না। প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সংবেদনশীলতা কতটা বিকশিত হয়েছে, সেটিও সভ্যতার মাপকাঠি। আমাদের তরুণেরা যদি ডিজিটাল পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত অপমান, ভয় ও মানসিক নিপীড়নের মধ্যে বেড়ে ওঠে, তবে প্রযুক্তিতে উন্নত হয়েও আমরা মানবিকতায় পিছিয়ে পড়ব।

সাইবার বুলিং তাই কেবল সাইবার জগতের সংকট নয়; এটি আমাদের সামাজিক চরিত্রেরও পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি আমাদের প্রত্যেককেই উত্তীর্ণ হতে হবে। কারণ নিরাপদ ইন্টারনেট নির্মাণের অর্থ শেষ পর্যন্ত একটি নিরাপদ, মর্যাদাশীল ও মানবিক প্রজন্ম নির্মাণ।

লেখক: প্রদীপ্ত মোবারক, কলামিস্ট ও জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম