ডেডবডি নিতে বলেছিলেন, ফিরে এলেন মন্ত্রী হয়ে
Advertisement
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
সালাহউদ্দিন আহমদ। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিলংয়ের সেই রাতটির কথা আজও মনে পড়ে। ফোনের ওপারে সালাহউদ্দিন আহমদ। অনেকক্ষণ ধরে কথা হচ্ছিল—দেশ, রাজনীতি, আন্দোলন, দলের অবস্থা, ম্যাডামের (মরহুম বেগম খালেদা জিয়া) খবর। হঠাৎ তার কণ্ঠ বদলে গেল। বললেন, ‘এখানেই বোধ হয় মরতে হবে। আমার ডেডবডিটা তুমি নিয়ে যেও। মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিও, পরিবারের দিকে খেয়াল করো।’ কথাটি শুনে আমি তাকে সান্তনা দিইনি; বরং বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলাম, ‘আপনি দেশে ফিরবেন। আবার রাজনীতি করবেন। এমপি হবেন, মন্ত্রী হবেন, দেশ চালাবেন।’ তিনি আমাকে মৃদু বকেছিলেন। হয়তো তখন আমার কথাকে সান্তনা ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। আজ মনে হয়, সেটি শুধু দুই নির্বাসিতের কথোপকথনই ছিল না—ছিল অন্ধকারের সঙ্গে ভবিষ্যতের এক ছোট্ট তর্ক। নয় বছর পর সেই তর্কের নিষ্পত্তি আমরা দেখেছি।
সালাহউদ্দিন আহমদকে আমি রাজনীতিতে আসার আগেই চিনতাম। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে চার বছরেরও বেশি সময় আমরা সহকর্মী ছিলাম। তিনি আমার দুই ব্যাচ সিনিয়র। কাজের মানুষ ছিলেন—অসাধারণ পরিশ্রমী, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন; অথচ ব্যক্তিগত ব্যবহারে ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন। তার মধ্যে তখনই তিনটি পরিচয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র ও ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, আইনজীবী এবং বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও কাজ করেছেন। রাষ্ট্রের ভেতরটা দেখেছেন, আইন বুঝেছেন, আবার রাজপথও চিনেছেন। ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরের একদিন তিনি বললেন, ‘আমি ইলেকশন করবো। আমার রেজিগনেশন একদিনের মধ্যে একসেপ্ট করিয়ে দিতে পারবে?’ আমি বলেছিলাম পারবো। তবে কনিষ্ঠ হয়েও তাকে একটি পরামর্শ দিয়েছিলাম—বিরোধী দলের বয়কটের মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দিয়ে রাজনীতি শুরু না করাই ভালো; বড় লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা দরকার। তিনি আমার কথা রাখলেন না। আজ মনে হয়, সেটিই ভালো হয়েছিল। আমি তখন ঝুঁকি দেখছিলাম, তিনি হয়তো সম্ভাবনা দেখছিলেন।
চাকরি ছেড়ে নির্বাচন করলেন, জিতলেন। এরপর কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি, জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান, ২০০১ সালে সংসদ সদস্য এবং চারদলীয় জোট সরকারের যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী। তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দৃশ্যমান কাজগুলোর একটি কক্সবাজারে। পেকুয়া উপজেলা প্রতিষ্ঠা, সড়ক যোগাযোগের বিস্তার, মেরিন ড্রাইভসহ উপকূলীয় যোগাযোগ উন্নয়নে তার ভূমিকা ছিল। রাজনীতির অনেক প্রতিশ্রুতি বাতাসে মিলিয়ে যায়; কিছু কাজ রাস্তাঘাটে থেকে যায়। কক্সবাজারে তার সময়ের কাজের একটি অংশ সেই দ্বিতীয় ধরনের। এরপর ওয়ান-ইলেভেন, মামলা, কারাবাস, রাজনৈতিক বিপর্যয়। ২০০৯ সালে তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ সংসদ-সদস্য হলেন। আর সালাহউদ্দিন আহমদ আরও গভীরে ঢুকে গেলেন জাতীয় রাজনীতিতে—বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, পরে মুখপাত্র।
২০১৫ সালের মার্চে হঠাৎ তিনি গৃহ থেকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে গুম হলেন। লিখেছিলাম, হত্যা করে পার পাবেন না, ছেড়ে দিন। পরে তাকে পাওয়া গেল শিলংয়ে। শুরু হলো নয় বছরের নির্বাসন। এই সময়ে সপ্তাহের অন্তত অর্ধেক রাত কথা হতো। কখনও ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। কে কোথায়, দলের কী অবস্থা, আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি কী, ম্যাডাম কেমন আছেন—এসবের সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও চলে আসত। আমেরিকা কী ভাবছে, স্যাংশন হবে কিনা, আন্দোলনের পথ কোন দিকে নেওয়া যায়— এমন অনেক কথার শেষ থাকত না। আশ্চর্য লাগত, একজন মানুষ দেশের বাইরে থেকেও কীভাবে এত গভীরভাবে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক স্পন্দনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। শিলং তার নির্বাসনী জীবনের থাকার জায়গা ছিল; কিন্তু বাংলাদেশ ছিল তার চিন্তার ঠিকানা।
সেই নয় বছরের মধ্যে এক রাতের কথাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। তিনি হতাশ হয়ে বলেছিলেন, ‘এখানেই বোধ হয় মরতে হবে। আমার ডেডবডিটা তুমি নিয়ে যেও।’ একজন মানুষের মুখে নিজের মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্বের কথা শোনা সহজ নয়। আমি তাকে বলেছিলাম, ‘আপনি মরবেন না। দেশে ফিরবেন।’ ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর তিনি দেশে ফেরার উদ্যোগ নিলেন। আমি তখনও বললাম, ‘এখন নয়। আপনি ফিরবেন সেদিন, যেদিন হাসিনা পালাবে। সেই দিন খুব বেশি দূরে নয়।’ তারপর জুলাই এলো। ছাত্রদের আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হলো। ৫ আগস্ট ২০২৪—৩৬ জুলাই—হাসিনা দেশ ছাড়লেন। কিছুদিন পর সালাহউদ্দিনও দেশে ফিরলেন। তখন মনে হলো, শিলংয়ের সেই রাতের কথোপকথনটি যেন ইতিহাস নিজের হাতে শেষ করে দিয়েছে।
দেশে ফিরে তার কাজ শুধু দলীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জুলাই সনদ, রাষ্ট্র সংস্কার, সংবিধান সংশোধন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান ব্যাখ্যা ও সমন্বয়ে তার আইন ও প্রশাসনের অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে। আন্দোলনের রাজনীতি থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনীতিতে যেতে হলে যে ভাষা বদলাতে হয়, তিনি সেই দুই ভাষাই জানেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে আবার সংসদ সদস্য হয়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন। এখানেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিহাস—যে রাষ্ট্রীয় অন্ধকারের ভেতর একদিন তিনি নিজেই হারিয়ে গিয়েছিলেন, আজ সেই রাষ্ট্রের অভ্যররীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব তারই হাতে। এ যেন মহান সৃষ্টিকর্তারই চাওয়া ছিল।
সালাহউদ্দিন আহমদের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো মন্ত্রণালয় বা পদ নয়। তিনি ছাত্রনেতা ছিলেন, আমলা হয়েছেন, আইনজীবী হয়েছেন, এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন, কারাগারে গেছেন, গুম হয়েছেন, নয় বছর নির্বাসনে থেকেছেন; কিন্তু এত কিছুর পরও তিনি নিজেকে হরিয়ে যেতে দেননি। এই ধৈর্য ও অদম্য সাহসই তাকে আলাদা করেছে। বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তার গুরুত্ব এখানেই। প্রশাসন তিনি ভেতর থেকে দেখেছেন, আইন তিনি পড়েছেন ও প্রয়োগ করেছেন, রাজপথে আন্দোলন করেছেন, সংসদে কথা বলেছেন, মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এসবের বাইরেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিপীড়ন নিজের শরীরে অনুভব করেছেন। এমন বহুমুখী অভিজ্ঞতার সমন্বয় বিরল। বিএনপি যদি আগামী দিনে শুধু একটি নির্বাচনি দল নয়, একটি আধুনিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার দল হতে চায়, তাহলে এই অভিজ্ঞতাকে আরও বড় দায়িত্বে কাজে লাগানো দরকার।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এখন তার সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাও। ক্ষমতার বাইরে থেকে রাষ্ট্রের সমালোচনা করা সহজ; ক্ষমতার ভেতরে থেকে রাষ্ট্রকে সংযত রাখা কঠিন। যে মানুষ একদিন বন্ধুকে নিজের ডেডবডি নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন, তার কাছে আজ প্রত্যাশা একটিই—কোনো নাগরিককে যেন আর এমন কথা বলতে না হয়। শিলংয়ের সেই রাতটিতে তিনি মৃত্যুর কথা বলেছিলেন। নয় বছর পর তিনি ফিরে এসেছেন। ডেডবডি নিতে হয়নি; মন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে হয়েছে। এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে—রাষ্ট্রের অন্ধকারটুকু এমনভাবে সরিয়ে দেওয়া, যাতে আর কোনো শিলংয়ের রাত জন্ম না নেয়।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব ও প্রটোকল অফিসার

